
সোহেল চৌধুরী রানা, সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি: 'মানুষ মানুষের জন্য জীবন জীবনের জন্য, একটু সহানুভূতি মানুষ কি পেতে পারেনা' বিখ্যাত কন্ঠ শিল্পী আব্দুল জবাবের জনপ্রিয় এ গানে সুরেই যেনো আকুতি জানাচ্ছিল মানসিক ভারসম্যহীন অসুস্থ গীতা রানী (৬০)। তাঁর এই আকুতি হয়তবা সৃষ্টিকর্তার মহিমাতেই শুনতে পায় নওগাঁর সাপাহার উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল্যাহ আল মামুন।
গীতা রানী লোক মুখে শুনা নাম, পরিচয়হীন এক অসুস্থ বৃদ্ধা মানসিক ভারসম্যহীন নারী ৩ দিন ধরে অসুস্থ অবস্থায় পড়ে ছিলো নওগাঁর সাপাহার উপজেলার পাগলার মোড় নামক এলাকায় একটি পরিত্যক্ত গোডাউন ঘরে। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করায় আরো বেশি করে অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চলাচলের শক্তিও ছিলনা তাঁর। হিতাহিত জ্ঞান না থাকায় এবং শরীরিক দুর্বলতার কারনে সেখানেই মানব বর্জ পরিত্যাগ করে পড়ে ছিলেন তিনি। ফলে নষ্ঠ হয়ে যায় পরনের কাপড়। দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে আশে পাশে। আত্মীয়-স্বজন বা পাশে দাঁড়াবার মত ছিলনা কেউ। গত শনিবার (১০ জুলাই) গভীররাতে এই নারীর করুণ অবস্থার কথা স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে থেকে জানতে পায় উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্যাহ আল মামুন।
ওই রাতেই ছুটে গিয়ে শামীম রেজা নামে এক ব্যক্তির পরিত্যাক্ত গোডাউন ঘর থেকে অসুস্থ, অপরিচ্ছন্ন এবং বিবস্ত্র অবস্থায় এই নারীকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত অসুস্থ নারীকে দেখভালের জন্য স্থানীয় এক মহিলাকে নিয়োজিত করেন ইউএনও। গভীররাতে দোকান বন্ধ থাকায় বস্ত্রহীন নারীকে নিজ সহধর্মিণীর কাপড় এবং বাড়ি থেকে খাবার এনে দেন মানবিক এ সরকারি কর্মকর্তা। স্থানীয়দের সহযোগিতায় তাঁকে উপজেলা সদরে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। স্থায়ীভাবে কোন ব্যাবস্থা না হওয়া পর্যন্ত সহায় সম্বলহীন এই নারীর অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসাসহ ভরণ-পোষণের দ্বায়িত্ব নেন উপজেলার নির্বাহী অফিসার আব্দুল্যাহ আল মামুন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন, সমাজসেবা অফিসার তৌফিকুর রহমান, সাপাহার প্রেসক্লাবের সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মানিক, সহ সভাপতি হাফিজুল হক, অধ্যাপক আজিজুর রহমান প্রমুখ।
এরই প্রেক্ষিতে সোমবার (১২ জুন) দুপুরে গীতা রানীর ব্যবহারের জন্য নতুন কাপড় নিয়ে হাসপাতালে গিয়ে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ খবর নেন উপজেলা উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্যাহ আন মামুন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পলা কর্মকর্তা ডা. মুহা. রুহুল আমিন।
গীতা রানীর বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানাযায়, প্রায় ৫ বছর আগে সাপাহার উপজেলা আসে এই নারী। মানসিক ভারসম্য হারিয়ে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন। ২ বছর আগে ২ মাস থেকেছেন শিরন্টি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম পুলিশ শ্রী যোগেশের বাড়িতে।
এরই সূত্রধরে কথা হয় গ্রাম পুলিশ যোগেশের সাথে। তিনি জানান, এই নারী প্রায় ৫ বছর থেকে এলাকার বিভিন্ন জায়গায় থাকেন। ২ বছর আগে ২ মাস আমার বাড়িতে ছিলেন। তখন তার ঠিকানা খুজে বের করে ছিলাম। তার নাম গীতা রানী। মান্দা উপজেলায় তার বাড়ি ছিল। সেখানে দেড় বিঘা জমি আছে। কিন্তু তার স্বজনেরা তাকে নিতে চাননা। কারণ হিসেবে তারা যোগেশকে জানান, হিন্দু থাকা অবস্থায় তার বিয়ে হয়ে ছিল। পরে স্বামী-সন্তান রেখে মুসলমান ধর্মান্তরিত হয়ে এক মুসলিম বিবাহিত যুবককে বিয়ে করেন। কিন্তু ওই যুবকের আগের স্ত্রী তাকে বাড়িতে উঠতে দেয়নি। এরপর কিছু দিন তারা আলাদা সংসার করে। এক সময় ওই স্বামী তালাক দিয়ে দেয় তাঁকে। এর পর থেকেই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দিক-বিদিক ঘুরে বেড়ান গীতা। ২ বছর আগে খুব কষ্টে তার স্বজনদের সন্ধান পাই। এতো দিনে তার ঠিকানা ভুলে গেছি।
সমাজসেবা অফিসার তৌফিকুর রহমান বলেন, রাজশাহীতে সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সেইফ হোম রয়েছে। ইউএনও সহদোয় চাইলে সেখানে গীতা রানীকে স্থায়ী ভাবে থাকার একটা সু-ব্যবস্থা করা সম্ভব্য হবে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আব্দুল্যাহ আল মামুন বলেন, একজন মানুষ হিসাবে একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো মানবিক দ্বায়িত্বের মধ্য পড়ে। আমি সেটাই প্রতিপালন করেছি। গাতী রানী পুরোপুরি সুস্থ্য হলে তাঁকে সেইফ হোমে পাঠানোর ব্যাবস্থা করা হবে।