বাগমারা প্রতিনিধিঃ
রাজশাহীতে আলোচিত শুভ হত্যার ১ বছর হলেও মৃত্যুর কারন নির্নয় করতে পারেনি পুলিশ ও তদন্ত কারী কর্মকর্তা।
রাজশাহী কলেজের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ২৫ বছর বয়সী শাহিন আলম শুভর হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার সহ ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শনিবার ৪ ডিসেম্বর বিকেলে বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর পৌরসভার নুরপুর গ্রামে নিহত শাহিন আলম শুভর পরিবারের লোকজন, সহপাঠি, এলাকাবাসী সহ সর্বস্তরের লোকজন মানববন্ধন করেন।
দ্রুত হত্যার কারণ অনুসন্ধান সহ এর সাথে জড়িতদের গ্রেফতার পূর্বক ফাঁসির দাবি জানান মানববন্ধনের মাধ্যমে। প্রায় ১ ঘন্টা ব্যাপি লোকজন মানববন্ধন করেন। এতে বক্তব্য রাখেন, নিহত শাহিন আলম শুভর পিতা মাহাবুবুর রহমান, ছোট বোন মমো, এলাকাবাসী আসাদুজ্জামান আসাদ, জাহিদ আকরাম,জিল্লুর রহমান, সহপাঠি রিফাত সহ অনেকে।
উল্লেখ শাহিন আলম শুভ পড়ালেখার পাশাপাশি রাজশাহী মহানগরীর নিউমার্কেট এলাকায় অবস্থিত হাইডআউট নামক একটি রেস্তোরায় শেফ হিসেবে চাকরি করতেন দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান শুভ। স্বপ্ন ছিলো পড়ালেখা শেষ করে ভালো একটা চাকরি করবেন। ছোট্ট বোনটাকেও পড়ালেখা করাবেন। দরিদ্র কৃষক পিতার দুঃখ লাঘব করতে ধীরে ধীরে সংসারের হাল ধরতে শুরু করেছিলো শুভ। কিন্তু ৪ ডিসেম্বর ২০২০ তারিখে হঠাৎ নিভে গেলো স্বপ্নবাজ এই যুবকের জীবন প্রদীপ। নিভে গেলো নাকি নিভিয়ে দেয়া হলো সেটা নিয়ে রয়ে গেলো প্রশ্ন।
২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর বিকেলে হঠাৎ একটি ফোনকল আসে শুভর বাবা মাহবুবুর রহমানের মোবাইলে। হাইড আউট রেস্তোরার মালিক সায়েম জানান শুভ অজ্ঞান হয়ে পড়েছে। এর কিছুক্ষণ পর আবারো সায়েম শুভর বাবাকে জানান তার ছেলে মারা গেছে। ৩য় বার এই সায়েম আবারও কল করে জানান শুভ আত্মহত্যা করেছে, লাশ রাজশাহী মেডিকেলে রয়েছে।
শুভর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সবার প্রথমে হাসপাতালে ছুটে যান তার চাচাতো ভাই জাহিদ আকরাম। তিনি হাসপাতালে গিয়ে দেখেন শুভর নিথর দেহ পড়ে আছে হাসপাতালের মর্গে। দায়িত্বরত চিকিৎসক জানান মৃত অবস্থায়ই শুভর লাশ হাসপাতালে নিয়ে আসে হাইডআউট রেস্তোরার কিছু কর্মচারী। শুভর চাচাতো ভাইকে হাইডআউট রেস্তোরার কর্মচারীরা বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন তখন। কেউ বলেন শুভ হারপিক খেয়ে আত্মহত্যা করেছে, আবার কেউ বলেন শুভ গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে আরেকজন বলেন শুভ হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে মারা গেছে। এদিকে শুভর মৃতদেহের গলায়ও ছিলো না কোন ফাঁসের দাগ। এমনকি শুভর নিহতের স্থান হাইডআউট রেস্তোরায়ও মেলেনি আত্মহত্যার কোন চাক্ষুষ আলামত। হাইডআউট রেস্তোরার মালিক সায়েম কেবল একটি কাপড়ের মাফলার দেখিয়ে বলেন এটা পেঁচিয়েই আত্মহত্যা করেছে শুভ।
শুভর মৃতদেহের গলায় কোন চিহ্ন না থাকলেও পিঠে ছিলো ধস্তাধস্তির অসংখ্য চিহ্ন। এ ঘটনায় রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া মডেল থানার পুলিশ একটি ইউডি মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে শুভর ল্যাপটপ থেকে উদ্ধার করা হয় একটি অজানা তথ্য। সেটি হলো মৃত্যুর প্রায় এক মাস আগে ৮ নভেম্বর ২০২০ তারিখ এহদিন নেসা নামে একটি মেয়েকে কোর্ট মাধ্যমে বিয়ে করে। কোর্ট ম্যারিজের আসল কপি উদ্ধার করে দেখা যায় প্রেমের সম্পর্ককে বিয়েতে রুপ দিয়েছিলো শুভ ও নেসা। এই নেসা রাজশাহী শহরের শাহমখদুম থানার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আলমগীরের কন্যা।
শুভর মৃত্যুর দিনের কিছু সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেলে আসল তথ্য বেরিয়ে আসে। হাইড আউট রেস্তোরার নিচতলার গেটে লাগানো একটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায় দুপুর ১ টা ২৯ মিনিটে হাইড আউট রেস্তোরায় একটি অজ্ঞাত ছেলেকে নিয়ে প্রবেশ করছে শুভর স্ত্রী এহদিন নেসা। মাত্র ৪ মিনিটের মাথায় বেরিয়ে আসে তারা। সেদিন ছিলো শুক্রবার তাই এহদিন নেসা বের হবার কিছুক্ষণ পর জুম্মার নামাজের জন্য বের হন শুভ। এরপর শুভ কখন আবার নামাজ থেকে ফিরে সেই রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করেছে তার সিসিটিভি ফুটেজ উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। সেই সিসিটিভি ফুটেজ লাপাত্তা। ধারণা করা হয় শুভর হত্যাকারীরা এসময় ঢুকে পড়ে রেস্তোরায় আরো সিসিটিভি ফুটেজও গায়েব করা হয়েছে পরিকল্পিতভাবে।
এরপর বিকেল ৩ টা ৫৭ মিনিটের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় শুভর নিথর দেহ ধরাধরি করে বের করছেন হাইড আউট রেস্তোরার কিছু কর্মচারী। এর ঠিক পেছনে পেছনে বেরিয়ে আসেন হাইডআউট রেস্তোরার মালিক সায়েম। প্রশ্ন ওঠে জুম্মার নামাজ পড়তে যাওয়া শুভ কেনো আত্মহত্যা করতে যাবে? ঘটনার দিন শুভর গোপন স্ত্রী নেসা কেনো এলো রেস্তোরায়। তার সাথে থাকা অজ্ঞাত ছেলেটিই বা কে ? নামাজে যাওয়া শুভর ফিরে আসার সিসিটিভি ফুটেজ কেনো গায়েব।
অনেক বিষয় জড়িত থাকলেও উত্তর মেলেনি কোনটিরও। এমনকি শুভর মৃত্যু ঠিক কিভাবে হয়েছে সেটিও নাকি বের করা যায়নি ময়না তদন্তে। এদিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজের দায়িত্বরত চিকিৎসক কর্তৃক বোয়ালিয়া থানায় প্রেরিত একটি পুলিশ কেসের কাগজ জাগিয়ে তোলে সন্দেহ। সেই কাগজে শুভর পিতার নামের জায়গায় শুরুতে আলমগীর লেখা হয়। পরে সেই আলমগীর নাম কেটে শুভর বাবার নাম মাহবুবুর রহমান বসানো হয়। মূলত এই আলমগীর হলো শুভর স্ত্রী নেসার বাবা অর্থাৎ শুভর শশুর। শুভর পরিবারের ধারণা শুভর হত্যাকান্ডে হাত থাকতে পারে তার। নয়তো মেডিকেল কর্তৃক তৈরিকৃত এ নথিতে তার নামই কেনো আসবে। ওদিকে ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কোন কারণ বের করতে না পারাটা, শুভর মৃত্যুকে করে তুলেছে আরো রহস্যময়। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে রাজশাহীর বোয়ালিয়া মডেল থানায় তিনজনকে আসামী করে হত্যামামলা দায়ের করেছেন নিহত শুভর পিতা মাহবুবুর রহমান। এজাহার সুত্রে জানা গেছে, মামলায় প্রথম আসামী হলেন শুভর স্ত্রী নেসা, ২য় আসামী শুভর কর্মস্থলের সহকর্মী কাউসার এবং ৩য় আসামী হলেন হাইডআউট রেস্তোরার মালিক সায়েম।
মামলার ২য় আসামী কাউসার সম্প্রতি পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলো।কাউসার জেল হাজত হতে জামিনে বাহিরে আছে।জানা যায়, আটককৃত কাউসারের সাথে নিহত শুভর স্ত্রী নেসার ভালো সম্পর্ক ছিলো। ঘটনার দিন শুভর মৃতদেহ ধরাধরি করে নামিয়ে আনাদের মধ্যে অন্যতম একজন হলেন এই কাউসার। বর্তমানে রহস্যজনক এই মামলা