
শাল-গজারির নিবিড় বনভূমি, জমিদারি শাসন আর রহস্যময় ভাওয়াল সন্ন্যাসীর স্মৃতিবিজড়িত অঞ্চল ‘ভাওয়াল গড়’ আজ বাংলার ইতিহাসের এক অনন্য সাক্ষী। গাজীপুর জেলা সদর থেকে শুরু করে শ্রীপুর, কালিয়াকৈর ও কাপাসিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে বিস্তৃত এই প্রাচীন উঁচু ভূমি কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে বারো ভূঁইয়াদের বীরত্বগাথা ও মুঘল আমলের প্রশাসনিক ঐতিহ্যের ছাপ।
ঐতিহাসিকদের মতে, ১৭ শ’ শতকের শেষভাগে ভাওয়াল জমিদারির গোড়াপত্তন হয়। তবে এই অঞ্চলের শাসনভার এক সময় ছিল ‘গাজী’ বংশের হাতে। স্থানীয় সিনিয়র সাংবাদিক রেজাউল বারী বাবুল জানান, সম্রাট আকবরের আমলে ভাওয়াল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরগনা হিসেবে পরিচিতি পায়। দৌলত গাজীর পতনের পর হিন্দু রাজাদের শাসন শুরু হয়, যার মধ্যে কালী নারায়ণ রায় ও বলরাম রায়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
১৮৭০-১৮৮০ সালের দিকে নির্মিত ৩৬৫ কক্ষবিশিষ্ট সুবিশাল ভাওয়াল রাজবাড়ী আজও পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। ইউরোপীয় ও মুঘল স্থাপত্যের মিশেলে তৈরি এই রাজবাড়ী বর্তমানে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পাশেই রয়েছে ঐতিহাসিক নাট মন্দির, রাজ দীঘি এবং রানী বিলাশমণি উচ্চ বিদ্যালয়।
ভাওয়াল গড়ের ইতিহাসে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো মেজো কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের মামলা। মৃত্যুর ১২ বছর পর এক সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে ফিরে এসে নিজের পরিচয় দাবি করায় শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া এই মামলাটি ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম দীর্ঘ ও চাঞ্চল্যকর বিচারিক ঘটনা হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।
এক সময়ের দুর্গম এই উঁচু ভূমি ছিল শাল ও গজারি গাছে ঘেরা এক দুর্ভেদ্য অঞ্চল। এই বনভূমিকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পালাগান, যাত্রা এবং ডাকাত-সন্ন্যাসীদের বীরত্বগাথার নানা লোককথা। বর্তমানে এই বনাঞ্চলের একাংশ ‘ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান’ হিসেবে সংরক্ষিত থাকলেও বনভূমির বিশাল অংশ আজ শিল্পায়ন ও দখলের কবলে।
সিনিয়র রাজনীতিবিদ এ. এম. আশরাফ হোসেনের মতে, সম্রাট আকবরের আমলে এই পরগনা থেকে বিপুল রাজস্ব আদায় হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আজ বেহাত হওয়ার পথে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভাওয়াল রাজবাড়ী, রাজ দীঘি এবং প্রাচীন শ্মশান মঠের মতো ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো সংস্কার ও জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণ করা গেলে এটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। সরকারি উদ্যোগে এই সম্পদগুলো রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।