
ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট এবং বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোট—দুই পক্ষই বুথফেরত জরিপে সমানসংখ্যক আসন পাওয়ার পূর্বাভাস পেয়েছে। অন্যদিকে, আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮টিতে। ফলে ১২০ আসনের পার্লামেন্টে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে কোনো পক্ষকেই এখনো এগিয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম ও চ্যানেল ১৩-এর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর জোট এবং আইজেনকোটের বিরোধী জোট উভয়ই ৫১টি করে আসন পেতে পারে। আরব দলগুলোর জন্য পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে ১৮টি আসন। তবে এসব সংখ্যা বুথফেরত জরিপের অনুমান, চূড়ান্ত নির্বাচনী ফল নয়। ভোট গণনা ও আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের আগে আসনসংখ্যায় পরিবর্তন আসতে পারে।
একক দল হিসেবে এগিয়ে লিকুদ: চ্যানেল ১৩-এর পূর্বাভাসে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টিকে ২৭টি আসন দেওয়া হয়েছে। এতে দলটি এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দল হিসেবে অবস্থান ধরে রাখতে পারে। অন্যদিকে, আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি ২৩টি এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নেতৃত্বাধীন ‘টুগেদার’ জোট ১৩টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জয়েন্ট লিস্টের জন্য ১১টি এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রা’আমের জন্য সাতটি আসনের অনুমান করা হয়েছে। এই দুই আরব রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত আসনসংখ্যা দাঁড়াতে পারে ১৮টিতে। তবে আসনসংখ্যার এই হিসাব দলগুলোর চূড়ান্ত অবস্থান নিশ্চিত করে না; আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পরই প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে।
জরিপে বদলেছে আসনের হিসাব: ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত প্রাথমিক বুথফেরত জরিপে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের সামান্য এগিয়ে থাকার আভাস পাওয়া গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে হালনাগাদ করা জরিপে দুই প্রধান জোটের আসনসংখ্যা সমান হয়ে যায়। বিভিন্ন সম্প্রচারমাধ্যমের জরিপে আসনসংখ্যার পার্থক্যও দেখা গেছে। ফলে কোন জোট শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের নির্বাচনী ব্যবস্থায় কোনো দল এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও একাধিক দলের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করা সম্ভব। এ কারণে শুধু সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলই যে সরকার গঠন করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং কোন নেতা পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্যের সমর্থন জোগাড় করতে পারবেন, সেটিই সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
আরব দলগুলোর আসন কেন গুরুত্বপূর্ণ: দুই প্রধান জোটের কেউই প্রয়োজনীয় ৬১টি আসনের পূর্বাভাস না পাওয়ায় আরব দলগুলোর অবস্থান নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। জরিপ অনুযায়ী, তাদের সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৮ হতে পারে। তবে এই আসনগুলো কোনো নির্দিষ্ট জোটকে সমর্থন করবে কি না, তা নিশ্চিত নয়। রাজনৈতিক সমর্থন, জোটের শর্ত এবং দলগুলোর নিজস্ব অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে পরবর্তী সরকার গঠনের আলোচনা কতটা এগোবে।
এদিকে, আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট সরকার গঠনের উদ্যোগ নিলে তাকে অন্যান্য দলের সমর্থন নিশ্চিত করতে হবে। নেতানিয়াহুর জোটের ক্ষেত্রেও একই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দুই পক্ষের আসনসংখ্যা কাছাকাছি থাকায় ছোট দলগুলোর সিদ্ধান্ত এবং পার্লামেন্টে তাদের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ভোটার উপস্থিতিতে রেকর্ড: ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের পর দেশটিতে এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটদানের হার বেড়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর গণনা শুরু হয়। ভোটার উপস্থিতির এই হার নির্বাচনে ব্যাপক অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দিলেও তা দিয়ে কোনো জোটের সরকার গঠন নিশ্চিত করা যায় না। নির্বাচনের পরবর্তী ধাপ নির্ভর করবে আনুষ্ঠানিক ফল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমর্থন আদায়ের আলোচনার ওপর।
আগামী ৪ নভেম্বর আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। তার আগে বুথফেরত জরিপের আসনসংখ্যাকে সম্ভাব্য চিত্র হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। চূড়ান্ত ফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
সব মিলিয়ে, ইসরায়েলের নির্বাচনে এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষের জন্য সরকার গঠনের পথ নিশ্চিত হয়নি। নেতানিয়াহুর জোট ও আইজেনকোটের বিরোধী জোট—উভয়কেই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য রাজনৈতিক সমর্থন জোগাড় করতে হবে। ফলে পরবর্তী সরকার কারা গঠন করবে, তা নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক ফল এবং নির্বাচনের পরের জোট-আলোচনাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি,