
বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার ঢাকা টেস্টে দারুণ বোলিং নৈপুণ্য দেখিয়ে ম্যাচে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে টাইগাররা। শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের তৃতীয় দিনে ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম ইনিংস ২৪৫ রানে গুটিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। নিজেদের প্রথম ইনিংসে ২৭২ রান করায় ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে ২৭ রানের লিড পেয়েছে স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের বোলারদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই সাফল্য এসেছে। বিশেষ করে নাঈম হাসানের দুর্দান্ত বোলিং এবং তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজের কার্যকর স্পিন আক্রমণ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং লাইনআপকে বড় সংগ্রহ গড়তে দেয়নি। ফলে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে চালকের আসনে থাকার সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ।
তৃতীয় দিনের খেলায় বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটারদের দ্রুত থামানো এবং প্রথম ইনিংসে পাওয়া রানসংখ্যার ব্যবধান ধরে রাখা। সেই লক্ষ্যেই মাঠে নামে বাংলাদেশের বোলাররা। দিনের খেলায় ক্যারিবীয় ব্যাটাররা ব্যক্তিগতভাবে কয়েকটি ভালো ইনিংস খেললেও দলীয় সংগ্রহকে বড় পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারেননি। ৮২.৫ ওভার ব্যাট করে ২৪৫ রানেই শেষ হয় তাদের ইনিংস। অন্যদিকে বাংলাদেশ নিজেদের প্রথম ইনিংসে ৯৭.৪ ওভারে ২৭২ রান সংগ্রহ করেছিল। দুই দলের প্রথম ইনিংসের ব্যবধান দাঁড়ায় ২৭ রান। টেস্ট ক্রিকেটে এই ব্যবধান খুব বড় না হলেও ম্যাচের পরবর্তী পরিস্থিতিতে এটি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা তৈরি করতে পারে।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ব্যাট হাতে সর্বোচ্চ ৫৬ রান করেন তেজনারায়ণ চন্দরপল। ১৮৪ বলের ধৈর্যশীল ইনিংসে তিনি ছয়টি চার ও একটি ছক্কা মারেন। দীর্ঘ সময় উইকেটে থেকে বাংলাদেশের বোলারদের পরীক্ষা নিলেও দলের সংগ্রহকে বড় করতে পারেননি তিনি। জন ক্যাম্পবেল করেন ৭৮ বলে ৫৪ রান। তার ইনিংসে ছিল ছয়টি চার ও দুটি ছক্কা। এ ছাড়া জাস্টিন গ্রিভস ১০৩ বলে ৪৬ রান করেন। অধিনায়ক রোস্টন চেজ ৬০ বলে ৪৩ রান করে অপরাজিত থাকেন। জাস্টিন গ্রিভস ও রোস্টন চেজের ব্যাটিংয়ে দল কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও অন্য ব্যাটারদের ব্যর্থতায় সেই চেষ্টা যথেষ্ট হয়নি।
বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিলেন নাঈম হাসান। তিনি ১০.৫ ওভার বল করে ৩৩ রান দিয়ে তুলে নেন চারটি উইকেট। ক্যারিবীয় ব্যাটিং অর্ডারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটারদের ফিরিয়ে ম্যাচে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় বড় ভূমিকা রাখেন এই অফ স্পিনার। তার পাশাপাশি মেহেদী হাসান মিরাজ ২৫ ওভারে ৬৫ রান দিয়ে দুটি উইকেট শিকার করেন। তাইজুল ইসলাম ২৬ ওভার বল করে ৭৬ রানের বিনিময়ে নেন দুটি উইকেট। দীর্ঘ স্পেলে বল করে প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের ওপর চাপ ধরে রাখেন তিনি। পেসারদের মধ্যে হাসান মাহমুদ ১১ ওভারে ৩৮ রান দিয়ে একটি এবং শরিফুল ইসলাম ১০ ওভারে ২৯ রান দিয়ে একটি উইকেট নেন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণে স্পিনারদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংসে শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো তাদের বড় সংগ্রহের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ব্র্যান্ডন কিং ২০ বলে ১৫ রান করে হাসান মাহমুদের বলে আউট হন। জন ক্যাম্পবেল ৭৮ বলে ৫৪ রান করার পর মেহেদী হাসান মিরাজের বলে সাজঘরে ফেরেন। কেভিন হজ ২০ বলে সাত রান করে তাইজুল ইসলামের শিকার হন। তেজনারায়ণ চন্দরপল ১৮৪ বল খেলে ৫৬ রান করার পর শরিফুল ইসলামের বলে আউট হন। আলিক অ্যাথানাজের অনুপস্থিতিতে মিডল অর্ডারের ওপর চাপ আরও বাড়ে। এরপর জাস্টিন গ্রিভস ৪৬ রান করে নাঈম হাসানের বলে আউট হন। জাস্টিন গ্রিভসের বিদায়ের পরও রোস্টন চেজ শেষ পর্যন্ত অপরাজিত থাকেন। তবে অন্য প্রান্তে একের পর এক উইকেট পড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৪৫ রানের বেশি এগোতে পারেনি।
এই ইনিংসের ফলে বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রথম ইনিংসে ২৭ রানের লিড নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামলে স্বাগতিকদের লক্ষ্য থাকবে ব্যবধান আরও বাড়ানো। টেস্ট ক্রিকেটে চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিং করা সব সময়ই কঠিন চ্যালেঞ্জ। তাই বাংলাদেশের ব্যাটাররা যদি দ্বিতীয় ইনিংসে ভালো শুরু এনে দিতে পারেন এবং বড় জুটি গড়তে সক্ষম হন, তাহলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে শক্ত লক্ষ্য দাঁড় করানো সম্ভব হবে। বিশেষ করে টপ অর্ডারের ব্যাটারদের দায়িত্বশীল ব্যাটিং এবং মিডল অর্ডারের কার্যকর অবদান ম্যাচের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে উইকেটের আচরণ বুঝে ব্যাটিং করাও হবে বাংলাদেশের জন্য বড় পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে তৃতীয় দিনের এই পর্যায়ে ২৭ রানের লিড নিয়ে বাংলাদেশ ম্যাচে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার সুযোগ পেয়েছে। নাঈম হাসানের চার উইকেট শিকার বোলিং আক্রমণের সাফল্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেও মিরাজ, তাইজুল, হাসান ও শরিফুলের অবদানও কম নয়। অন্যদিকে চন্দরপল ও ক্যাম্পবেলের অর্ধশতক এবং গ্রিভস ও চেজের লড়াকু ব্যাটিং সত্ত্বেও ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলীয়ভাবে বড় সংগ্রহ গড়তে ব্যর্থ হয়েছে। এখন ম্যাচের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইনিংস। সেখানে ব্যাটাররা কতটা ভালো করতে পারেন, তার ওপর নির্ভর করবে দুই দলের লড়াই কোন দিকে মোড় নেয়। ২৭ রানের লিডকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ কি বড় ব্যবধান তৈরি করতে পারবে, নাকি ওয়েস্ট ইন্ডিজ আবারও ম্যাচে ফিরে আসবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।