
ভারতের বিভিন্ন শহরে বসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের মাধ্যমে বিদেশের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে দেশটির রাজনৈতিক পরামর্শক ও অনলাইন প্রচারকদের বিরুদ্ধে। কেনিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশের পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন ঘিরেও ভারতভিত্তিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রচারের তথ্য পেয়েছেন গবেষকেরা।
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে দেশটির মিশিগান অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রার্থিতা বাছাইয়ের সময় ভারত থেকে পরিচালিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বেশ কিছু অ্যাকাউন্টে একটি প্রার্থীর পক্ষে ভিডিও ছড়ানো হয়। গত ৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত ওই বাছাইয়ে হেইলি স্টিভেন্সকে হারিয়ে জয়ী হন আবদুল আল-সাইয়েদ।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, মিশিগানের সাধারণ ভোটারদের সাক্ষাৎকারের আদলে তৈরি অন্তত তিন ডজন ভিডিও এক্স, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে ছড়ানো হয়েছিল। ভিডিওগুলোতে সাধারণ মানুষের মতো করে কথা বলা ব্যক্তিদের স্টিভেন্সের প্রতি সমর্থন জানাতে দেখা যায়। এসব ভিডিও লাখ লাখবার দেখা হয়েছে। তবে সেগুলো ছড়ানো অ্যাকাউন্টগুলোর বেশির ভাগই যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ভারতে পরিচালিত হচ্ছিল বলে গবেষকেরা শনাক্ত করেছেন।
রুশ অনলাইন প্রচার অভিযান অনুসন্ধানকারী গবেষক দল অ্যান্টিবটফোরনাভালনি অন্তত ২৮টি এক্স অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে, যেগুলো থেকে ভিডিওগুলো ছড়ানো হয়েছিল। এসব অ্যাকাউন্টের পোস্ট সাত মিলিয়নের বেশি বার দেখা হয়। ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া ফরেনসিক হাবের গবেষকেরাও একই ধরনের প্রচারের সঙ্গে ভারতীয় অ্যাকাউন্টের সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছেন। তবে প্রচারের অর্থের উৎস এবং কারা এর পেছনে ছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। স্টিভেন্সের সাবেক প্রচার-পরামর্শক এ প্রচারে তাঁর প্রচারশিবিরের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন।
আলজাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারকেরা বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে একই ধরনের গোপন প্রচার চালিয়ে আসছেন। প্রতিবেদনের জন্য ভারতের প্রায় ১২ জন রাজনৈতিক পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে। তাঁদের কয়েকজনের ভাষ্য, আনুষ্ঠানিক প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ করা কঠিন—এমন বিতর্কিত কনটেন্ট পরিচয় গোপন রাখা পেজ ও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
২০২২ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম রুটোর পক্ষে কাজ করা ভারতের তরুণ কনটেন্ট নির্মাতা রাজন কুমার আলজাজিরাকে জানান, প্রতিদিন সাত ডলারের বিনিময়ে তিনি পোস্টার, ছবি ও ভিডিও তৈরি করতেন। কখনো দিনে ১০০টি পর্যন্ত কনটেন্ট তৈরির দায়িত্ব পেতেন। এসব কনটেন্ট পরিচয় গোপন রাখা বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের বক্তব্য কেটে ভিন্ন অর্থে উপস্থাপন এবং তাঁদের সুনাম ক্ষুণ্ন করার মতো কাজও করতে হতো বলে জানান তিনি।
ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক তুষার গিরি আলজাজিরাকে বলেন, বিদেশের নির্বাচনি প্রচারে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। তাঁর ভাষায়, নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে এসব প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা ও কম খরচে কাজ করার সক্ষমতা ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নীতিমালায় অ্যাকাউন্ট কেনাবেচা, ভুয়া পরিচয়ে কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের অর্থদাতা বা পরিচয় গোপন রাখার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পরামর্শকেরা ভিপিএন, পুরোনো পেজের পরিচয় পরিবর্তন এবং ভাড়ায় নেওয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে এসব বিধিনিষেধ পাশ কাটানোর চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
গোপন প্রচারের পাশাপাশি অর্থ লেনদেনেও অস্বচ্ছতার অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন পরামর্শক। তাঁদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে অর্থের উৎস আড়াল করতে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। তবে এসব লেনদেনের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো নির্বাচনি প্রচারের সম্পর্ক স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, নেপাল ও শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের নির্বাচনি প্রচারেও ভারতীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে পরিচালিত এ ধরনের প্রচার ভোটারদের সামনে তথ্যের প্রকৃত উৎস আড়াল করে দিতে পারে। ফলে নির্বাচনি প্রচারের স্বচ্ছতা ও ভোটারদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা,