
সন্তান জন্মের পর একটি পরিবারে আনন্দের পাশাপাশি নতুন দায়িত্ব ও ব্যস্ততা তৈরি হয়। তবে এই সময় অনেক মা শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি মানসিকভাবেও কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যান। কেউ অকারণে কাঁদেন, কেউ অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভোগেন, আবার কারও আগের পছন্দের কাজেও আগ্রহ কমে যায়। এসব লক্ষণকে অনেক সময় মাতৃত্বের স্বাভাবিক চাপ মনে করে উপেক্ষা করা হয়। অথচ এগুলো প্রসব-পরবর্তী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সন্তান জন্মের পর মায়েদের মানসিক সমস্যার মধ্যে প্রসবোত্তর বিষণ্নতা বা পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন (পিপিডি) এবং প্রসবোত্তর সাইকোসিস বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমটি তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে প্রসবোত্তর সাইকোসিস বিরল হলেও এটি গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যসংকট।
সন্তান জন্মের পর মায়ের শরীরে হরমোনের পরিবর্তন, ঘুমের ঘাটতি, শারীরিক ক্লান্তি এবং নতুন দায়িত্বের চাপ একসঙ্গে কাজ করতে পারে। এর সঙ্গে পরিবারের প্রত্যাশা, পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাব ও নিজের জন্য সময় না পাওয়ার বিষয়গুলোও মানসিক চাপ বাড়ায়। অনেক নারী এ সময় নিজের আগের পরিচয় ও স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছেন বলে অনুভব করেন।
পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় শিশুর পরিচর্যায় মনোযোগ দিলেও মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া হয় না। এনডিটিভির প্রতিবেদনে কয়েকজন মায়ের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে, কেউ অকারণে কাঁদতেন, কেউ ঘুমাতে পারতেন না, আবার কেউ শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ভুগতেন। কারও ক্ষেত্রে পেশাগত ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপে চিকিৎসকের সাহায্য নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়নি।
প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা সাধারণ মন খারাপ বা সাময়িক আবেগের চেয়ে বেশি গুরুতর। এতে দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্নতা, অতিরিক্ত উদ্বেগ, ক্লান্তি, আগের পছন্দের কাজে আগ্রহ হারানো এবং নবজাতকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে অসুবিধা হতে পারে। প্রতিবেদনে ইউনিসেফের তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, সাধারণত সন্তান জন্মের দুই থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে এ সমস্যা দেখা দিতে পারে। তবে শিশুর জন্মের এক বছর পর্যন্তও এর লক্ষণ প্রকাশ পেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথের (এনআইএইচ) তথ্য অনুযায়ী, প্রসবোত্তর বিষণ্নতায় আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ১০ শতাংশ। তবে অনেকের ক্ষেত্রে সমস্যাটি শনাক্ত হয় না।
প্রসব-পরবর্তী বিষণ্নতা ‘বেবি ব্লুজ’ থেকে আলাদা। সন্তান জন্মের পর প্রথম কয়েক দিন অনেক মায়ের মেজাজের ওঠানামা, কান্না বা অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। সাধারণত এসব অনুভূতি অল্প সময়ের মধ্যে কমে আসে। কিন্তু বিষণ্নতা দীর্ঘস্থায়ী হলে এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
প্রসব-পরবর্তী সাইকোসিস একটি বিরল কিন্তু গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যসংকট। এনআইএইচের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি এক হাজার প্রসবের মধ্যে প্রায় এক থেকে দুটিতে এ সমস্যা দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এ অবস্থায় একজন নারী বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারেন। তিনি এমন কিছু শুনতে বা দেখতে পারেন, যা বাস্তবে নেই। তীব্র বিভ্রান্তি, অস্বাভাবিক সন্দেহ, অসংলগ্ন আচরণ এবং মেজাজের বড় ধরনের পরিবর্তনও দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুরুতে লক্ষণগুলো সব সময় স্পষ্ট হয় না। কয়েক রাত ঘুম না হওয়া, অতিরিক্ত উদ্বেগ, দ্রুত কথা বলা, অস্বাভাবিক চঞ্চলতা কিংবা আচরণে আকস্মিক পরিবর্তনকে অনেক সময় নতুন মাতৃত্বের ক্লান্তি বলে ধরে নেওয়া হয়।
মার্গা মাইন্ডকেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জ্যোতি নীরজার মতে, শুধু হরমোনের পরিবর্তন দিয়ে প্রসবোত্তর সাইকোসিসের ব্যাখ্যা করা যায় না। আগে থেকে মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস, বাইপোলার ডিজঅর্ডার, পরিবারের মানসিক রোগের ইতিহাস, ঘুমের ঘাটতি ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তবে আগে কোনো মানসিক রোগ নির্ণয় না হলেও এ সমস্যা দেখা দিতে পারে।
প্রসবের পর মায়ের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। বিশেষ করে কয়েক দিন ধরে ঘুমাতে না পারা, অস্বাভাবিক সন্দেহ, বাস্তবে নেই এমন কিছু দেখা বা শোনা, অসংলগ্ন কথা বলা, তীব্র অস্থিরতা কিংবা নিজের বা শিশুর ক্ষতি করার চিন্তা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
অ্যাস্টার হোয়াইটফিল্ড হাসপাতালের পরামর্শক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রিটি দুগ্গার গুপ্তার মতে, বিপজ্জনক আচরণ দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করা উচিত নয়। সাইকোসিসের লক্ষণ তার আগেই প্রকাশ পেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত মনোরোগ বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন। গুরুতর ক্ষেত্রে হাসপাতালে ভর্তি, ওষুধ কিংবা বিশেষ চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
প্রসবের পর মায়ের যত্ন শুধু শারীরিক সুস্থতা বা শিশুর পরিচর্যায় সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম, ব্যক্তিগত সময় এবং পরিবারের সহযোগিতা তাঁর মানসিক সুস্থতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখলে তাঁকে দোষারোপ না করে মনোযোগ দিয়ে কথা শোনা এবং প্রয়োজন হলে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করা উচিত।
প্রসব-পরবর্তী মানসিক অসুস্থতা চিকিৎসাযোগ্য। তবে সাইকোসিসের লক্ষণ দেখা দিলে বিষয়টিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে নিতে হবে। নিজের বা শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে তাৎক্ষণিক উদ্বেগ থাকলে মাকে একা না রেখে দ্রুত চিকিৎসা সহায়তা নিতে হবে।
মাতৃত্ব মানেই সব সময় আনন্দে থাকা নয়। সন্তানকে ভালোবাসার পাশাপাশি একজন মা বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা মানসিক সংকটেও ভুগতে পারেন। তাই শিশুর যত্নের পাশাপাশি মায়ের ঘুম, বিশ্রাম ও মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়াও পরিবারের দায়িত্ব।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি