
সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য জরুরি নির্দেশনা প্রকাশ করেছে সরকার। ইকামা, চাকরি, বেতন, সামাজিক আচরণ, অনলাইন ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক লেনদেনসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রবাসীদের করণীয় ও বর্জনীয় জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
সোমবার (২ নভেম্বর) মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব ফেসবুক পেজে সৌদি প্রবাসীদের জন্য বিস্তারিত নির্দেশনা সংবলিত একটি জরুরি বার্তা প্রকাশ করা হয়। এতে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে সৌদি আরবে অবস্থান, কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন এবং দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিদেশযাত্রার আগে ভিসা, নিয়োগকর্তা ও নিয়োগচুক্তি ভালোভাবে যাচাই করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিএমইটি ছাড়পত্র, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দালালের মৌখিক আশ্বাসে টাকা না দেওয়া, কাজের উদ্দেশ্যে ভিজিট ভিসায় সৌদি আরব না যাওয়া এবং পাসপোর্ট নিজের হেফাজতে রাখার বিষয়েও সতর্ক করেছে সরকার।
ইকামা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ক্ষেত্রে প্রবাসীদের ইকামা সঙ্গে রাখা এবং Absher অ্যাপের মাধ্যমে এর মেয়াদ যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। QIWA প্ল্যাটফর্মে নিয়োগচুক্তি ও ওয়ার্ক পারমিট যাচাই করতে বলা হয়েছে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে নবায়ন বা পুনরায় ইস্যুর ব্যবস্থা করার কথাও উল্লেখ রয়েছে। না বুঝে কোনো কাগজে, বিশেষ করে সাদা কাগজে, সই বা টিপসই না দিতে এবং ওটিপি ও পাসওয়ার্ড অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করতে বলা হয়েছে।
চাকরি, বেতন ও শ্রমিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। নিয়োগচুক্তির কপি ও কাজের প্রমাণ সংরক্ষণ, ব্যাংকিং চ্যানেলে বেতন গ্রহণ এবং ব্যাংক স্টেটমেন্ট রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কর্মস্থলে কোনো সমস্যা হলে সৌদি আরবের শ্রম দপ্তরের ১৯৯১১ নম্বরে অথবা বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। নিয়োগকর্তার অনুমতি ও বৈধ প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করা কিংবা কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়ার মতো পদক্ষেপ না নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
চাকরি পরিবর্তন ও দেশে ফেরার ক্ষেত্রে QIWA প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বৈধভাবে চাকরি স্থানান্তর করতে বলা হয়েছে। দেশে ফেরার আগে জরিমানা ও ট্রাভেল ব্যান আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে ফাইনাল এক্সিট ভিসার নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রম না করা, ভিসা ইস্যু নিশ্চিত না করে বিমানবন্দরে না যাওয়া এবং অন্যের সোনা বা মোবাইল টাকার বিনিময়ে বহন না করার নির্দেশনা রয়েছে। ৪০ হাজার রিয়াল বা তার বেশি নগদ অর্থ কিংবা সোনা বহনের ক্ষেত্রে কাস্টমসে ঘোষণা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
সৌদি আরবের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। শালীন পোশাক পরা, ভদ্র আচরণ করা, জনসমক্ষে ঝগড়া বা মারামারি না করা এবং জাতি, দেশ কিংবা গায়ের রং নিয়ে কটূক্তি থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। শিশু ও নারীদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা রয়েছে। অনুমতি ছাড়া কারও বাড়িতে প্রবেশ, শিশুদের স্পর্শ করা বা খাবার দেওয়া, নারীদের অনুসরণ কিংবা হয়রানি করা এবং অপরিচিত নারীর কাছে ফোন নম্বর চাওয়া বা বার্তা পাঠাতে নিষেধ করা হয়েছে।
ধর্ম ও সংস্কৃতির বিষয়ে নামাজের সময় কাজ বন্ধ রাখা, রমজানে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে খাওয়া ও ধূমপান থেকে বিরত থাকা এবং মসজিদে মোবাইল ফোন নীরব রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সৌদি আরবের ধর্ম, রাজপরিবার বা সরকার নিয়ে অনলাইনে মন্তব্য কিংবা পোস্ট না করার এবং অনুমতি ছাড়া মিছিল, সমাবেশ বা ধর্মঘটে অংশ না নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
অনলাইন নিরাপত্তার বিষয়ে কোনো খবর শেয়ার করার আগে যাচাই করা, শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও দুই ধাপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যবহার এবং শুধু অনুমোদিত অ্যাপ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনুমতি ছাড়া নারী, শিশু বা পরিবারের সদস্যদের ছবি না তোলা এবং গুজব, অশ্লীল ভিডিও বা আপত্তিকর কনটেন্ট ছড়িয়ে না দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, প্রতিরোধ, আঘাতস্থল ও নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থানের ছবি বা ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ কিংবা শেয়ার না করার বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে।
সড়ক ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির বিমা নিশ্চিত করা, সিটবেল্ট ব্যবহার, গতিসীমা মেনে চলা এবং গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনা ঘটলে ঘটনাস্থল ছেড়ে না যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় পুলিশ ও নাজম রিপোর্ট সংগ্রহের কথাও বলা হয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে প্রাণের ঝুঁকি না থাকলে অযথা টেনে তোলা, ঘটনাস্থলে ভিড় করা কিংবা ছবি-ভিডিও ধারণ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।
অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে শুধু ব্যাংক ও অনুমোদিত এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠাতে বলা হয়েছে। হুন্ডি থেকে বিরত থাকা, নিয়মিত সঞ্চয় করা, ঋণ ও বিল সময়মতো পরিশোধ করা এবং নিজের সিম, ব্যাংক কার্ড বা অ্যাকাউন্ট অন্যকে ব্যবহার করতে না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ওষুধ ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশনায় সৌদি আরবে ওষুধ নেওয়ার আগে দেশটির খাদ্য ও ওষুধ কর্তৃপক্ষের (এসএফডিএ) অনুমতি নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও মূল প্যাকেট সঙ্গে রাখতে হবে। অন্যের দেওয়া ব্যাগ, প্যাকেট বা ওষুধ বহন না করার পাশাপাশি মাদক ও জুয়া থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কর্মস্থলে গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, ছায়ায় বিশ্রাম এবং হেলমেট, সেফটি বেল্টসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ রয়েছে। নির্দেশনায় ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সরাসরি রোদে কাজ না করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিপদে পড়লে সৌদি আরবের জরুরি সেবা, শ্রম দপ্তর ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তা নিতে বলা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে ৯১১, ৯৯৯, অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৯৯৭, অগ্নিনির্বাপণের জন্য ৯৯৮ এবং ট্রাফিক পুলিশের জন্য ৯৯৩ নম্বরে যোগাযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগের জন্য ১৯৯১১, দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের জন্য ৮০০১০০০১২৫ এবং কনস্যুলার সেবার জন্য ৮০০১০০০১২৬ নম্বর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারের নম্বর ১৬১৩৫ উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় প্রবাসীদের বৈধভাবে অবস্থান, সৌদি আরবের আইন মেনে চলা, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ এবং কোনো সমস্যায় পড়লে দালালের পরিবর্তে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।