
পবিত্র কোরআন মহান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ হিদায়াত। একজন মুসলমানের দৈনন্দিন জীবনে কোরআন তিলাওয়াত, আয়াত মুখস্থ করা, অর্থ বোঝা এবং কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার গুরুত্ব অপরিসীম। অনেক মুসলমান প্রতিদিন ফজরের নামাজের পর, অবসর সময়ে কিংবা ঘুমানোর আগে কোরআন তিলাওয়াত করেন। তবে দৈনন্দিন জীবনে এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয়, যখন শরীরে ওযু থাকে না। তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—ওযু ছাড়া কি কোরআন পড়া যাবে?
বিশেষ করে যারা নিয়মিত কোরআন তিলাওয়াত করেন, তাদের মধ্যে এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন রয়েছে। ওযু না থাকলে কি মুখস্থ কোরআন পড়া যায়? পবিত্র কোরআনের মুদ্রিত কপি বা মুসহাফ হাতে নেওয়া যাবে কি? মোবাইল ফোনে কোরআন অ্যাপ খুলে ওযু ছাড়া পড়া কি জায়েজ? ওযু ছাড়া সূরা ইয়াসিন, সূরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি কিংবা অন্যান্য সূরা পড়া যাবে কি? শুধু কোরআন শুনতে হলেও কি ওযু করতে হবে?
ইসলামি শরিয়তে এসব প্রশ্নের আলাদা ব্যাখ্যা রয়েছে। কারণ, ওযু না থাকা, গোসল ফরজ হওয়া এবং নারীদের হায়েজ বা নিফাস অবস্থায় থাকার বিধান এক নয়। অনেকেই এই বিষয়গুলোকে একইভাবে বিবেচনা করেন, ফলে কখনো অপ্রয়োজনীয় সংকোচ তৈরি হয়, আবার কখনো শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান সম্পর্কে ভুল ধারণা জন্ম নেয়।
এই আর্টিকেলে কোরআন ও হাদিসের দলিল, ইসলামি ফিকহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। ফলে ওযু ছাড়া কোরআন পড়ার নিয়ম, মোবাইলে কোরআন তিলাওয়াতের বিধান এবং কোন অবস্থায় কোরআন স্পর্শ করা যাবে—এসব বিষয়ে একটি পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
ওযু ছাড়া কি কোরআন পড়া যাবে?
সংক্ষেপে উত্তর হলো, ওযু না থাকলেও মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ। অর্থাৎ কারও ওযু না থাকলে তিনি মুখস্থ সূরা, আয়াত কিংবা কোরআনের অন্যান্য অংশ পড়তে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ওযু থাকা শর্ত নয়। তবে ওযু অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা অধিক উত্তম ও আদবের অন্তর্ভুক্ত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বুঝতে হবে। মুখস্থ কোরআন পড়া এবং মুদ্রিত কোরআন বা মুসহাফ হাতে নিয়ে পড়া এক বিষয় নয়। মুখস্থ তিলাওয়াতের জন্য ওযু আবশ্যক না হলেও অধিকাংশ ফকিহের মতে, মুসহাফ সরাসরি স্পর্শ করার জন্য ওযু থাকা আবশ্যক।
হানাফি মাজহাবেও এ বিধান অনুসরণ করা হয়। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি যদি ওযু ছাড়া থাকেন, তাহলে তিনি মুখস্থ সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস কিংবা অন্য যেকোনো আয়াত পড়তে পারবেন। কিন্তু ওযু ছাড়া সরাসরি মুসহাফ স্পর্শ করতে পারবেন না।
দারুল উলুম দেওবন্দের একটি হানাফি ফতোয়াতেও বলা হয়েছে, ওযু ছাড়া কোরআন পড়া বা শোনা নিষিদ্ধ নয়; তবে পবিত্র কোরআন স্পর্শ করার জন্য ওযু প্রয়োজন। হানাফি ফতোয়াটি এখানে পড়ুন।
সুতরাং শুধু ওযু নেই বলে কোরআন তিলাওয়াত বন্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। তবে কোরআনের সম্মান রক্ষা এবং উত্তম আদবের জন্য সম্ভব হলে ওযু করে তিলাওয়াত করা উচিত।
ওযু ছাড়া মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত করার বিধান
অনেকেই কোরআনের বিভিন্ন সূরা মুখস্থ জানেন। কেউ প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন মুখস্থ পড়েন, আবার কেউ যাতায়াতের সময় কিংবা কাজের ফাঁকে মুখস্থ আয়াত তিলাওয়াত করেন।
এ ক্ষেত্রে ওযু না থাকলে তিলাওয়াত করা যাবে কি না, তা নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন নেই। কারণ, সাধারণ ছোট নাপাকি বা ওযু ভঙ্গ হওয়ার কারণে মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত নিষিদ্ধ হয়ে যায় না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারও ওযু ছিল, কিন্তু পরবর্তী সময়ে ঘুম, পেশাব, পায়খানা বা অন্য কোনো কারণে ওযু ভেঙে গেছে। এমন অবস্থায় তিনি যদি মুখস্থ সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস অথবা সূরা রহমান পড়তে চান, তাহলে তা পড়তে পারবেন।
একইভাবে কেউ যদি কোরআনের কোনো অংশ মুখস্থ করেন এবং প্রতিদিন তা পুনরাবৃত্তি করেন, তাহলে সাধারণ ওযু না থাকার কারণে তাঁর মুখস্থ তিলাওয়াত বন্ধ রাখতে হবে না।
তবে এখানে মনে রাখতে হবে, শুধু ওযু না থাকা এবং গোসল ফরজ হওয়ার অবস্থা এক নয়। গোসল ফরজ হলে কোরআন তিলাওয়াতের বিধান ভিন্ন। বিশেষ করে হানাফি মাজহাব অনুসারে জানাবাতের অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। এ বিষয়ে পরবর্তী অংশে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
ওযু ছাড়া কোরআন শরিফ স্পর্শ করা যাবে কি?
ওযু ছাড়া কোরআন পড়া এবং ওযু ছাড়া কোরআন শরিফ স্পর্শ করার বিধান আলাদা। একজন মুসলমান মুখস্থ কোরআন পড়তে পারলেও সরাসরি মুদ্রিত মুসহাফ স্পর্শ করার ক্ষেত্রে পবিত্রতা বজায় রাখা জরুরি।
অধিকাংশ ইসলামি ফকিহের মতে, ওযু ছাড়া মুদ্রিত কোরআন শরিফ স্পর্শ করা জায়েজ নয়। হানাফি মাজহাবেও এ বিধান অনুসরণ করা হয়।
এ বিষয়ে একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) আমর ইবনে হাযম (রা.)-এর মাধ্যমে ইয়েমেনবাসীর কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন:
لَا يَمَسُّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرٌ
অর্থ: পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ কোরআন স্পর্শ করবে না।
এই বর্ণনাটি ইমাম মালিকের মুয়াত্তা এবং অন্যান্য হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। ফকিহগণ মুসহাফ স্পর্শ করার বিধান নির্ধারণে এই বর্ণনাকে গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
এখানে পবিত্রতা বলতে শুধু শরীর পরিষ্কার থাকাকে বোঝানো হয়নি; বরং শরিয়তসম্মত পবিত্রতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তাই কারও ওযু না থাকলে তিনি কোরআন শরিফের মুদ্রিত আরবি লেখার ওপর সরাসরি হাত দিতে পারবেন না। তবে মুখস্থ তিলাওয়াত করতে পারবেন।
কোরআন শরিফ না ছুঁয়ে সামনে রেখে পড়া যাবে কি?
অনেকের প্রশ্ন, ওযু না থাকলে কোরআন শরিফ সামনে রেখে পড়া যাবে কি না, যদি হাতে স্পর্শ না করা হয়?
এক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো, কোরআন শরিফ স্পর্শ করা হচ্ছে কি না। কেউ যদি মুসহাফটি পরিষ্কার কোনো স্থানে রেখে দেন এবং নিজে সেটি স্পর্শ না করে দেখে দেখে পড়েন, তাহলে এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে অনুমোদন রয়েছে।
মিসরের দার আল-ইফতার একটি ফতোয়ায় বলা হয়েছে, ওযু ছাড়া কোরআন তিলাওয়াত করা এবং মুসহাফ থেকে পড়ে নেওয়া যেতে পারে, যদি সেটি সরাসরি স্পর্শ করা না হয়।
অর্থাৎ কোরআন শরিফ টেবিল বা রেহালে রাখা থাকলে ওযু ছাড়া সেটি দেখে পড়া এবং সরাসরি মুসহাফ স্পর্শ না করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
তবে পৃষ্ঠা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সরাসরি হাত দিয়ে পৃষ্ঠা উল্টানোর পরিবর্তে পরিষ্কার কোনো কাপড়, কলম বা উপযুক্ত কোনো বস্তু ব্যবহার করা যেতে পারে। হানাফি ফিকহে এ ধরনের ব্যবস্থার আলোচনা রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, মুসহাফ স্পর্শ না করে পড়ার অনুমতি থাকলেও কোরআনের সম্মান ও পবিত্রতার প্রতি যথাযথ যত্নবান থাকা উচিত।
ওযু ছাড়া মোবাইলে কোরআন পড়া যাবে কি?
বর্তমান সময়ে অনেক মুসলমান মুদ্রিত কোরআন শরিফের পাশাপাশি স্মার্টফোনে কোরআন অ্যাপ ব্যবহার করেন। মোবাইল ফোনে সম্পূর্ণ কোরআন, বাংলা অনুবাদ, তাফসির এবং তিলাওয়াতের অডিও পাওয়া যায়। ফলে যেকোনো জায়গায় বসে কোরআন পড়া সহজ হয়েছে।
কিন্তু অনেকের প্রশ্ন, মোবাইলে কোরআন পড়ার জন্যও কি ওযু করতে হবে?
সাধারণভাবে প্রচলিত সমসাময়িক ফতোয়া অনুযায়ী, মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার জন্য ওযু থাকা শর্ত নয়। অর্থাৎ ওযু না থাকলেও কোরআন অ্যাপ খুলে আয়াত পড়া যায়। মোবাইলের স্ক্রিন স্পর্শ করাও মুদ্রিত মুসহাফ স্পর্শ করার মতো নয়।
এর কারণ হলো, মুদ্রিত কোরআন শরিফের অক্ষর কাগজে স্থায়ীভাবে মুদ্রিত থাকে। অন্যদিকে মোবাইলের স্ক্রিনে কোরআনের আয়াত ডিজিটালভাবে প্রদর্শিত হয়। অ্যাপ বন্ধ করলে বা অন্য পেজে গেলে সেই দৃশ্যমান লেখা আর স্ক্রিনে থাকে না।
এ কারণে অনেক আলেম মোবাইল ফোনকে মুদ্রিত মুসহাফের একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত করেন না।
ইসলামকিউএ ওয়েবসাইটের একটি বিস্তারিত ফতোয়ায় মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার বিষয়ে বলা হয়েছে, ফোনে সংরক্ষিত কোরআনের লেখা মুদ্রিত মুসহাফের মতো নয়। তাই ওযু ছাড়া ফোন স্পর্শ করা এবং সেখান থেকে কোরআন পড়ার অনুমতি রয়েছে। একই বিষয়ে মিসরের দার আল-ইফতাও স্মার্ট ডিভাইস থেকে কোরআন পড়ার জন্য ওযু আবশ্যক নয় বলে জানিয়েছে। দার আল-ইফতার ফতোয়া।
তবে মোবাইলে কোরআন পড়ার ক্ষেত্রে কয়েকটি আদব অনুসরণ করা ভালো। যেমন, কোরআন অ্যাপ খোলার আগে সম্ভব হলে ওযু করে নেওয়া, পরিষ্কার স্থানে বসে তিলাওয়াত করা এবং স্ক্রিনে কোরআনের আয়াত প্রদর্শিত থাকা অবস্থায় অপ্রয়োজনীয় কাজ থেকে বিরত থাকা।
এ ছাড়া মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার অনুমতি রয়েছে বলে ইচ্ছাকৃতভাবে পবিত্রতার গুরুত্ব উপেক্ষা করা উচিত নয়। ওযু করা সম্ভব হলে ওযু করে তিলাওয়াত করাই উত্তম।
ওযু ছাড়া মোবাইলে কোরআনের বাংলা অনুবাদ পড়া যাবে কি?
অনেকেই কোরআনের বাংলা অর্থ ও ব্যাখ্যা পড়তে পছন্দ করেন। বিশেষ করে যারা আরবি ভাষা ভালো বোঝেন না, তারা বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে আল্লাহর বাণীর অর্থ জানার চেষ্টা করেন।
প্রশ্ন হলো, ওযু ছাড়া কোরআনের বাংলা অনুবাদ পড়া যাবে কি?
সাধারণভাবে কোরআনের বাংলা অনুবাদ, তাফসির কিংবা ব্যাখ্যামূলক বই পড়ার জন্য ওযু আবশ্যক নয়। কারণ, অনুবাদে কোরআনের আরবি মূল পাঠের পরিবর্তে আয়াতের অর্থ ও ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়।
তবে কোনো বইয়ে আরবি কোরআনের আয়াতও অন্তর্ভুক্ত থাকলে সেই আরবি অংশ স্পর্শ করার বিধান বিবেচনা করতে হবে। বিশেষ করে বইটি যদি মূলত কোরআনের অনুবাদ ও তাফসিরের সমন্বয়ে তৈরি হয়, তাহলে সেটির পবিত্রতা ও স্পর্শের বিষয়ে ফিকহি বিস্তারিত বিধান রয়েছে।
মোবাইল ফোনে বাংলা অনুবাদ পড়ার ক্ষেত্রেও ওযু আবশ্যক নয়। তবে অনুবাদ পড়ার সময় আয়াতের অর্থ যথাযথভাবে বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
শুধু আরবি উচ্চারণ পড়াই কোরআনের উদ্দেশ্য নয়; বরং আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা বোঝা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করাও একজন মুসলমানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ওযু ছাড়া সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস ও অন্যান্য সূরা পড়া যাবে কি?
অনেক মুসলমান প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু সূরা তিলাওয়াত করেন। যেমন সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা ইয়াসিন এবং সূরা মুলক। কেউ কেউ সকাল-সন্ধ্যার আমল হিসেবেও বিভিন্ন সূরা ও আয়াত পড়েন।
এখন প্রশ্ন হলো, ওযু ছাড়া এসব সূরা পড়া যাবে কি?
যদি কোনো ব্যক্তি শুধু ওযুহীন অবস্থায় থাকেন এবং তাঁর গোসল ফরজ না হয়, তাহলে তিনি মুখস্থ এসব সূরা পড়তে পারবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সূরার জন্য আলাদা ওযুর শর্ত নেই।
উদাহরণ হিসেবে:
সূরা ফাতিহা মুখস্থ পড়া যাবে।
সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া যাবে।
সূরা ইয়াসিন মুখস্থ পড়া যাবে।
সূরা রহমান ও সূরা মুলক পড়া যাবে।
আয়াতুল কুরসি মুখস্থ পড়া যাবে।
অন্যান্য কোরআনের আয়াতও মুখস্থ তিলাওয়াত করা যাবে।
তবে এসব সূরা মুদ্রিত মুসহাফ থেকে পড়তে চাইলে সরাসরি মুসহাফ স্পর্শ করার জন্য ওযু থাকতে হবে।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, এই বিধান সাধারণ ওযু না থাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। জানাবাত, হায়েজ ও নিফাসের বিধান আলাদা।
ওযু ছাড়া আয়াতুল কুরসি পড়া যাবে কি?
আয়াতুল কুরসি পবিত্র কোরআনের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি আয়াত। এটি সূরা আল-বাকারার ২৫৫ নম্বর আয়াত। অনেক মুসলমান ফরজ নামাজের পর এবং ঘুমানোর আগে আয়াতুল কুরসি পাঠ করেন।
অনেকের প্রশ্ন, ওযু না থাকলে আয়াতুল কুরসি পড়া যাবে কি না?
সাধারণ ওযু না থাকলে মুখস্থ আয়াতুল কুরসি পড়া জায়েজ। একইভাবে মোবাইল ফোনের কোরআন অ্যাপ থেকে পড়ার ক্ষেত্রেও সাধারণত ওযু আবশ্যক নয়।
তবে মুদ্রিত কোরআন শরিফ থেকে আয়াতটি পড়তে চাইলে সরাসরি মুসহাফ স্পর্শ করার জন্য ওযু করতে হবে।
আয়াতুল কুরসি পড়ার ক্ষেত্রে শুধু উচ্চারণের দিকে নয়, এর অর্থ বোঝার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এই আয়াতে আল্লাহ তাআলার একত্ব, চিরঞ্জীব ও সর্বসত্তার ধারক হিসেবে তাঁর মহিমা এবং আকাশ-জমিনের ওপর তাঁর পূর্ণ কর্তৃত্বের কথা বর্ণিত হয়েছে।
ওযু ছাড়া কোরআন শুনতে কি কোনো সমস্যা আছে?
কোরআন তিলাওয়াতের পাশাপাশি কোরআন শোনাও মুসলমানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। অনেকে ইউটিউব, মোবাইল অ্যাপ, রেডিও কিংবা সরাসরি কারও মুখে কোরআন তিলাওয়াত শোনেন।
এক্ষেত্রে ওযু থাকা কি বাধ্যতামূলক?
না, কোরআন শোনার জন্য ওযু করা বাধ্যতামূলক নয়। কোনো ব্যক্তি ওযু ছাড়া থাকলেও কোরআন তিলাওয়াত শুনতে পারবেন।
যেমন, কেউ গাড়িতে বসে কোরআনের অডিও শুনছেন, অফিসে কাজ করার সময় কোরআন তিলাওয়াত শুনছেন কিংবা বাড়িতে পরিবারের কারও তিলাওয়াত শুনছেন—এসব ক্ষেত্রে শুধু ওযু না থাকার কারণে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই।
তবে কোরআন তিলাওয়াত শোনার সময় যথাসম্ভব মনোযোগ দেওয়া এবং সম্মান বজায় রাখা উচিত। কোরআন তিলাওয়াতকে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা হাসি-ঠাট্টার সঙ্গে মিশিয়ে ফেলা থেকে বিরত থাকা ভালো।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের সূরা আল-আ'রাফের ২০৪ নম্বর আয়াতে বলেছেন, যখন কোরআন পাঠ করা হয়, তখন তা মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং নীরব থাকো, যাতে তোমাদের প্রতি রহমত করা হয়।
এ আয়াত থেকে কোরআন তিলাওয়াত শোনার সময় মনোযোগ ও আদব বজায় রাখার গুরুত্ব বোঝা যায়।
ওযু ছাড়া কোরআন পড়া এবং গোসল ফরজ অবস্থায় কোরআন পড়ার পার্থক্য
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। অনেকেই মনে করেন, ওযু না থাকলে এবং গোসল ফরজ থাকলে কোরআন পড়ার বিধান একই। কিন্তু ইসলামি শরিয়তে এ দুটি অবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ওযু না থাকা: কারও শুধু ওযু ভেঙে গেলে তিনি মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত করতে পারবেন। তবে মুদ্রিত মুসহাফ সরাসরি স্পর্শ করতে পারবেন না।
গোসল ফরজ হওয়া: কারও ওপর জানাবাতের কারণে গোসল ফরজ হলে হানাফি মাজহাবসহ অধিকাংশ ফকিহের মতে, গোসল না করা পর্যন্ত কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। এ বিধান শুধু মুসহাফ স্পর্শের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এ বিষয়ে আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) পবিত্রতা অর্জন করে কোরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করতেন। এ বর্ণনার ভিত্তিতে এবং অন্যান্য দলিলের আলোকে অধিকাংশ ফকিহ জানাবাতের অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকার বিধান দিয়েছেন।
ইসলামি ফিকহের চার মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, জানাবাত অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। তাই এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব ফরজ গোসল সম্পন্ন করে পবিত্রতা অর্জন করা উচিত।
তবে জানাবাত অবস্থায় সাধারণ জিকির, দরুদ, তাসবিহ ও দোয়া করা যায়। কোনো আয়াতের শব্দ দোয়া বা জিকির হিসেবে উচ্চারণ করার ক্ষেত্রে নিয়ত ও সংশ্লিষ্ট ফিকহি বিধান বিবেচনা করতে হয়।
মেয়েদের মাসিক বা হায়েজ অবস্থায় কোরআন পড়া যাবে কি?
নারীদের মাসিক বা হায়েজের সময় কোরআন তিলাওয়াতের বিধান নিয়ে ইসলামি ফকিহদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাই বিষয়টি সাধারণ ওযু না থাকার বিধানের সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়।
হানাফি মাজহাবের প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ বিধান অনুযায়ী, হায়েজ ও নিফাস অবস্থায় নারীরা কোরআন তিলাওয়াত করবেন না এবং মুদ্রিত মুসহাফ স্পর্শ করবেন না। তবে এ সময় তাঁরা দোয়া, দরুদ, তাসবিহ, তাহলিল এবং অন্যান্য জিকির করতে পারবেন।
অন্যদিকে কিছু আলেমের মতে, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী হায়েজের সময় কোরআন শিক্ষা, মুখস্থ করা বা ভুলে যাওয়ার আশঙ্কার মতো প্রয়োজন বিবেচনায় নারীদের তিলাওয়াতের অনুমতি রয়েছে। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
তাই এ ক্ষেত্রে নিজস্ব অনুসৃত মাজহাব ও নির্ভরযোগ্য মুফতির পরামর্শ অনুযায়ী আমল করা উচিত।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হায়েজ অবস্থায় ওযু না থাকার সাধারণ বিধান প্রয়োগ করে কোরআন তিলাওয়াতের অনুমতি বা নিষেধাজ্ঞা নির্ধারণ করা যাবে না। কারণ, হায়েজ একটি স্বতন্ত্র শরয়ি অবস্থা এবং এর বিধান আলাদা।
ওযু ছাড়া কোরআন পড়া কি গুনাহ?
সাধারণ ওযু না থাকা অবস্থায় মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ হওয়ায় এটিকে গুনাহ বলা সঠিক নয়। একইভাবে প্রচলিত ফতোয়া অনুযায়ী, মোবাইল ফোনে কোরআন পড়ার জন্যও ওযু বাধ্যতামূলক নয়।
তবে ওযু ছাড়া মুদ্রিত মুসহাফ সরাসরি স্পর্শ করা অধিকাংশ ফকিহের মতে নিষিদ্ধ। তাই এ বিধান জেনে-বুঝে অমান্য করা থেকে বিরত থাকা উচিত।
কোরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে পবিত্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও সম্মান বজায় রাখা একজন মুসলমানের দায়িত্ব। আল্লাহর কালাম পাঠ করার সময় যতটা সম্ভব সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা, মনোযোগ ধরে রাখা এবং অর্থ বোঝার চেষ্টা করা উচিত।
ওযু না থাকলে তিলাওয়াতের সুযোগ রয়েছে বলে অযথা দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। আবার ওযু করা সম্ভব হলেও শুধু সুবিধার জন্য সবসময় ওযু ছাড়া তিলাওয়াত করার অভ্যাস গড়ে তোলাও উত্তম আদবের পরিপন্থী হতে পারে।
কোরআন পড়ার আগে ওযু করার ফজিলত ও গুরুত্ব
যদিও সাধারণ ওযু না থাকলে মুখস্থ কোরআন পড়া জায়েজ, তবুও কোরআন তিলাওয়াতের আগে ওযু করে নেওয়া উত্তম। কারণ, কোরআন আল্লাহর বাণী এবং এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা প্রত্যেক মুসলমানের কর্তব্য।
ওযু করার মাধ্যমে একজন মুসলমান নামাজের জন্য প্রয়োজনীয় পবিত্রতা অর্জন করেন। একই সঙ্গে এটি ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও ইবাদতের প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোরআন তিলাওয়াতের আগে ওযু করলে পাঠক নিজেকে ইবাদতের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে পারেন। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে কোরআন পড়া, মসজিদে বসে তিলাওয়াত করা কিংবা মুদ্রিত মুসহাফ হাতে নেওয়ার ক্ষেত্রে ওযু থাকা প্রয়োজনীয়।
তবে মনে রাখতে হবে, ওযু করলেই একজন মানুষের সব ধরনের অপবিত্রতা দূর হয়ে যায় না। কারও যদি গোসল ফরজ থাকে, তাহলে শুধু ওযু করে সেই অবস্থা থেকে পবিত্র হওয়া যাবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী ফরজ গোসল সম্পন্ন করতে হবে।
সুতরাং ওযু ও গোসলের বিধান আলাদা করে বোঝা এবং প্রতিটি অবস্থায় শরিয়তের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি।
ওযু ছাড়া কোরআন পড়া সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. ওযু ছাড়া কি কোরআন শরিফ পড়া যাবে?
হ্যাঁ, সাধারণ ওযু না থাকলেও মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে। তবে মুদ্রিত কোরআন শরিফ সরাসরি স্পর্শ করে পড়ার জন্য ওযু থাকতে হবে।
২. ওযু ছাড়া কি মোবাইলে কোরআন পড়া যাবে?
হ্যাঁ, মোবাইল ফোনের কোরআন অ্যাপ থেকে ওযু ছাড়া কোরআন পড়া যায়। প্রচলিত সমসাময়িক ফতোয়া অনুযায়ী, ডিজিটাল কোরআনের লেখা মুদ্রিত মুসহাফের একই বিধানের অন্তর্ভুক্ত নয়।
৩. ওযু ছাড়া কি সূরা ইয়াসিন পড়া যাবে?
হ্যাঁ, সাধারণ ওযু না থাকলে মুখস্থ সূরা ইয়াসিন পড়া যাবে। তবে মুদ্রিত মুসহাফ স্পর্শ করে পড়তে চাইলে ওযু করতে হবে।
৪. ওযু ছাড়া কি আয়াতুল কুরসি পড়া যাবে?
হ্যাঁ, ওযু না থাকলেও মুখস্থ আয়াতুল কুরসি পড়া যাবে। মোবাইল থেকেও পড়তে পারবেন। তবে গোসল ফরজ থাকলে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী কোরআন তিলাওয়াত থেকে বিরত থাকতে হবে।
৫. ওযু ছাড়া কি কোরআনের বাংলা অনুবাদ পড়া যাবে?
হ্যাঁ, কোরআনের বাংলা অনুবাদ ও সাধারণ ব্যাখ্যা পড়ার জন্য ওযু বাধ্যতামূলক নয়। তবে বইয়ে আরবি আয়াত থাকলে সেই অংশ স্পর্শের বিধান আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে।
৬. ওযু ছাড়া কি কোরআন শরিফ স্পর্শ করা যাবে?
অধিকাংশ ইসলামি ফকিহের মতে, ওযু ছাড়া মুদ্রিত কোরআন শরিফ সরাসরি স্পর্শ করা জায়েজ নয়। হানাফি মাজহাবেও এ বিধান অনুসরণ করা হয়।
৭. ওযু ছাড়া কি কোরআন শোনা যাবে?
হ্যাঁ, কোরআন শোনার জন্য ওযু থাকা বাধ্যতামূলক নয়। মোবাইল, ইউটিউব, রেডিও কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে ওযু ছাড়া কোরআন তিলাওয়াত শোনা যাবে।
৮. গোসল ফরজ থাকলে কি কোরআন পড়া যাবে?
হানাফি মাজহাব এবং অধিকাংশ ফকিহের মতে, জানাবাত অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা যাবে না। এ অবস্থায় ফরজ গোসল করে পবিত্রতা অর্জনের পর তিলাওয়াত করতে হবে।
৯. ওযু ছাড়া কি নামাজের বাইরে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া যাবে?
হ্যাঁ, সাধারণ ওযু না থাকলে মুখস্থ সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়া যাবে। তবে মুদ্রিত কোরআন সরাসরি স্পর্শ করার ক্ষেত্রে ওযুর বিধান মানতে হবে।
১০. কোরআন পড়ার জন্য প্রতিবার কি নতুন করে ওযু করতে হবে?
না। একবার ওযু করার পর তা ভেঙে না গেলে নতুন করে ওযু করার প্রয়োজন নেই। তবে ওযু ভেঙে গেলে মুখস্থ তিলাওয়াত করা যাবে, কিন্তু মুদ্রিত মুসহাফ স্পর্শ করার আগে আবার ওযু করতে হবে।
উপসংহার
ওযু ছাড়া কোরআন পড়া যাবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করে ব্যক্তি কোন অবস্থায় আছেন এবং কীভাবে কোরআন পড়ছেন তার ওপর। সাধারণ ওযু না থাকলেও মুখস্থ কোরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ এবং মোবাইল ফোনের কোরআন অ্যাপ থেকেও পড়া যায়। তবে মুদ্রিত কোরআন শরিফ সরাসরি স্পর্শ করার জন্য ওযু থাকা প্রয়োজন। অন্যদিকে গোসল ফরজ, হায়েজ ও নিফাসের বিধান সাধারণ ওযু না থাকার বিধান থেকে আলাদা। তাই এসব অবস্থার মধ্যে পার্থক্য বুঝে আমল করা জরুরি। সম্ভব হলে কোরআন তিলাওয়াতের আগে ওযু করে নেওয়া উত্তম এবং সবসময় কোরআনের প্রতি যথাযথ সম্মান বজায় রাখা উচিত। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে পবিত্র কোরআন নিয়মিত পড়া, বোঝা এবং সে অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।