
পর্তুগালের জার্সিতে দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানার পর নতুন করে আলোচনায় ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। জাতীয় দল থেকে অবসরের পর তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানাতে বিশেষ আয়োজন করতে চায় পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশন। তবে সেই আয়োজনে অংশ নিতে কিংবা শেষবারের মতো মাঠে নামতে আগ্রহী নন পর্তুগিজ মহাতারকা। এমনকি বিদায়ী ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তাবেও তাঁর ইতিবাচক সাড়া নেই বলে জানা গেছে। ফলে পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই খেলোয়াড়ের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা। তাঁর এমন সিদ্ধান্তে ভক্তদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।
আন্তর্জাতিক ফুটবলে রোনালদোর বিদায়ের পেছনে রয়েছে জাতীয় দলের কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি। গত সেপ্টেম্বর জাতীয় দলের ক্যাম্পে কোচের সঙ্গে মতবিরোধের পর দলীয় অনুশীলন ক্যাম্প ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন এই তারকা। এর আগে নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পরবর্তী ম্যাচে তাঁকে শুরুর একাদশে না রাখার পরিকল্পনার কথাও জানা যায়। এসব ঘটনায় নিজের ভূমিকা ও সম্মান নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন রোনালদো। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হলেও দুজনের মধ্যে আগের মতো সম্পর্ক ফিরে আসেনি। শেষ পর্যন্ত সেই দূরত্ব আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে তাঁর বিদায়ের সিদ্ধান্তকে আরও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
এদিকে রোনালদোর বিদায়ের সিদ্ধান্তের বিষয়টি পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পেদ্রো প্রোয়েনসাকে জানানো হয়েছিল বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জাতীয় দলের কোচ জর্জ জেসুসকে সরাসরি বিষয়টি জানাননি তিনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সমাপ্তির ঘোষণা দেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জেসুসের সঙ্গে রোনালদোর একটি ফোনালাপের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যেখানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে থাকার কথা ছিল প্রোয়েনসার। বৃহস্পতিবার সেই আলোচনা হওয়ার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে কোচ ও খেলোয়াড়ের মধ্যকার দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, রোনালদোকে ঘিরে বিশেষ বিদায় আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের। দীর্ঘদিন জাতীয় দলের হয়ে অবদান রাখা এই ফুটবল কিংবদন্তিকে সমর্থকদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানাতে চায় সংস্থাটি। ফেডারেশনের পক্ষ থেকে তাঁর অবদান, নেতৃত্ব এবং পর্তুগালের ফুটবলকে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করার ক্ষেত্রে ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে সেই আয়োজন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। বিশেষ করে রোনালদো যদি মাঠে ফিরতে রাজি না হন, তাহলে শুধু আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার মাধ্যমেই তাঁকে বিদায় জানানোর পরিকল্পনা করতে হতে পারে। কারণ তাঁর অংশগ্রহণ ছাড়া বিদায়ী ম্যাচ আয়োজন করা কঠিন।
পর্তুগালের হয়ে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০৩ সালের আগস্টে। এরপর দীর্ঘ ২৩ বছর দেশটির প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনি। এই সময়ে জাতীয় দলের হয়ে ২৩৪টি ম্যাচ খেলেছেন এবং করেছেন ১৪৬টি গোল। পুরুষদের আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সর্বাধিক ম্যাচ খেলা ফুটবলার হিসেবে নিজের নাম প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। শুধু ব্যক্তিগত রেকর্ড নয়, দলীয় সাফল্যেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাঁর নেতৃত্বে পর্তুগাল ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে। পাশাপাশি ২০১৯ ও ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগের শিরোপাও জয় করে দলটি। এসব অর্জন তাঁকে পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে দিয়েছে।
এদিকে, আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবল থেকে এখনই সরে যাচ্ছেন না রোনালদো। সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরের হয়ে খেলা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারে এক হাজার গোলের মাইলফলক স্পর্শ করার লক্ষ্যও রয়েছে এই তারকার। বর্তমানে তাঁর গোলসংখ্যা ৯৮৫ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে জাতীয় দলের অধ্যায় শেষ হলেও ক্লাব পর্যায়ে নিজের অর্জনের তালিকা আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ থাকছে তাঁর সামনে। সমর্থকদের জন্য এটিও স্বস্তির বিষয় যে, পর্তুগালের জার্সিতে আর দেখা না গেলেও ফুটবল মাঠে রোনালদোর উপস্থিতি এখনই শেষ হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে রোনালদোর আন্তর্জাতিক বিদায়কে ঘিরে পর্তুগিজ ফুটবলে তৈরি হয়েছে এক আবেগঘন পরিস্থিতি। একদিকে ফেডারেশন চাইছে দেশের অন্যতম সেরা ফুটবলারকে যথাযথ সম্মান জানাতে, অন্যদিকে রোনালদো নিজেই আরেকটি ম্যাচ খেলার বিষয়ে অনাগ্রহী বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। জর্জ জেসুসের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়টিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে আনুষ্ঠানিক বিদায় আয়োজন পুরোপুরি বাতিল হয়েছে, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো সামনে আসেনি। ফলে শেষ পর্যন্ত রোনালদো কোনো সংবর্ধনায় অংশ নেবেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দীর্ঘ ২৩ বছরের পথচলার পর তাঁর বিদায়টা কেমন হবে, তা জানতে অপেক্ষায় রয়েছেন পর্তুগালের লাখো সমর্থক।