
পবিত্র মক্কা ও মদিনায় গিয়ে ওমরাহ পালনের ইচ্ছা বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানের। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক ধর্মপ্রাণ মুসলমান ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব ভ্রমণ করেন। তবে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করার আগে অনেকের মনেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আসে—বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ হজ করতে কত টাকা লাগে? ওমরাহ ভিসা করতে কত খরচ হয়, বিমান টিকিট, হোটেল, খাবার ও যাতায়াতের জন্য কত টাকা প্রয়োজন এবং ১৪ দিনের ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য কত?
মূলত ওমরাহ পালনের মোট খরচ নির্ভর করে ভ্রমণের সময়, বিমানের টিকিট, মক্কা ও মদিনার হোটেলের মান, হারাম শরিফ থেকে হোটেলের দূরত্ব, খাবারের ব্যবস্থা এবং প্যাকেজের মেয়াদের ওপর। সাধারণ সময়ে তুলনামূলক কম খরচে ওমরাহ পালন করা সম্ভব হলেও পবিত্র রমজান মাসে, বিশেষ করে শেষ দশ দিনে, হোটেল ও বিমান ভাড়ার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় খরচ অনেক বেশি হতে পারে।
আরো পড়ুন- হজযাত্রীদের জন্য সুখবর, সৌদি আরব থেকে ফেরত এলো ১০ কোটি টাকা
বাংলাদেশ থেকে যারা ২০২৬ সালের বাকি সময় কিংবা ২০২৭ সালে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য আগে থেকেই সম্ভাব্য বাজেট, ভিসার নিয়ম এবং প্যাকেজের সুবিধাগুলো জানা জরুরি। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে ওমরাহ করতে গেলে শিশুদের বিমানভাড়া, হোটেল ও অন্যান্য খরচের হিসাব আলাদা করে বুঝে নিতে হয়।
এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ হজ করতে কত টাকা লাগে, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের সম্ভাব্য ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য, ১৪ দিনের প্যাকেজ, ওমরাহ ভিসার খরচ, রমজানের প্যাকেজ এবং শিশুদের ওমরাহ ভ্রমণের খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ হজ করতে কত টাকা লাগে?
বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনের জন্য জনপ্রতি আনুমানিক ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা থেকে প্যাকেজ পাওয়া যাচ্ছে। তবে হোটেল, বিমান, খাবার, ভিসা, যাতায়াত এবং ভ্রমণের সময় অনুযায়ী মোট খরচ আরও বেশি হতে পারে। ২০২৬ সালের নভেম্বর মাসে প্রকাশিত একটি প্যাকেজ তালিকা অনুযায়ী, ১৪ দিনের ইকোনমি ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা, ১২ দিনের ফ্যামিলি প্যাকেজের মূল্য ১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা এবং ২০২৭ সালের রমজানের ২১ দিনের একটি প্যাকেজের মূল্য ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। এগুলো নির্দিষ্ট সেবাদাতার প্রকাশিত মূল্য, সরকারি নির্ধারিত প্যাকেজ মূল্য নয়।
ওমরাহ পালনের সম্ভাব্য খরচের একটি ধারণা নিচে দেওয়া হলো।
ওমরাহ প্যাকেজের ধরন
জনপ্রতি আনুমানিক মূল্য
সাধারণ ইকোনমি প্যাকেজ
১,৪৯,০০০ টাকা থেকে
১২ দিনের ফ্যামিলি প্যাকেজ
১,৮৯,০০০ টাকা থেকে
১৪ দিনের ওমরাহ প্যাকেজ
১,৪৯,০০০ টাকা থেকে
২১ দিনের রমজান প্যাকেজ
২,১৯,০০০ টাকা থেকে
উন্নতমানের হোটেল ও প্রিমিয়াম প্যাকেজ
সুবিধাভেদে আরও বেশি
এখানে উল্লেখিত মূল্যগুলো বাজারে প্রকাশিত নির্দিষ্ট প্যাকেজের উদাহরণ। বুকিংয়ের সময় বিমানভাড়া, হোটেলের প্রাপ্যতা, রুম শেয়ারিং, খাবার ও অন্যান্য সুবিধা অনুযায়ী দাম পরিবর্তিত হতে পারে।
সাধারণত একটি পূর্ণাঙ্গ ওমরাহ প্যাকেজে যাওয়া-আসার বিমান টিকিট, ওমরাহ ভিসা, মক্কা ও মদিনায় হোটেলে থাকা এবং বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাতায়াতের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিছু প্যাকেজে খাবার, জিয়ারত এবং প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। তবে সব প্যাকেজে এসব সুবিধা থাকে না। তাই শুধু প্যাকেজের দাম দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তা জেনে নেওয়া জরুরি।
ওমরাহ ভিসা ফি কত ২০২৬?
২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনের জন্য ভিসার খরচ নির্ভর করে ভিসার ধরন, বাধ্যতামূলক বিমা, এজেন্সির সার্ভিস চার্জ এবং সংশ্লিষ্ট বুকিংয়ের ওপর।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রচলিত ওমরাহ ভিসার সৌদি সরকারি ফি ৩০০ সৌদি রিয়াল এবং বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমার খরচ আনুমানিক ১০০ থেকে ১৮০ রিয়াল। অর্থাৎ সরকারি ভিসা ফি ও বিমা মিলিয়ে প্রায় ৪০০ থেকে ৪৮০ রিয়াল হতে পারে। এর সঙ্গে বাংলাদেশি এজেন্সির সার্ভিস চার্জ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়।
প্রকাশিত বিনিময় হার অনুযায়ী প্রতি সৌদি রিয়াল আনুমানিক ৩২ থেকে ৩৩ টাকার হিসাবে ধরলে সরকারি ফি ও বিমার খরচ প্রায় ১৩ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকার কাছাকাছি হতে পারে। এজেন্সির সার্ভিস চার্জ যোগ হলে ভিসা প্রসেসিংয়ের মোট খরচ আরও বাড়ে।
একটি বাংলাদেশি ট্রাভেল সার্ভিসের অক্টোবর ২০২৬-এর প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, এজেন্সির মাধ্যমে ভিসা, বিমা ও সার্ভিস চার্জসহ জনপ্রতি আনুমানিক ১৭ হাজার থেকে ৩৮ হাজার টাকা লাগতে পারে। তবে এটি সব এজেন্সির জন্য নির্ধারিত সরকারি মূল্য নয়।
ভিসার খরচ সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। প্রথমত, শুধু ভিসা ফি দিলেই ওমরাহ ভ্রমণ সম্পন্ন হয় না। দ্বিতীয়ত, প্যাকেজের মধ্যে ভিসা ও বিমা অন্তর্ভুক্ত থাকলে আলাদাভাবে একই খরচ আবার দিতে হবে কি না, তা যাচাই করতে হবে। তৃতীয়ত, সৌদি আরবের ভিসা ও বুকিংয়ের নিয়ম পরিবর্তিত হতে পারে। তাই টাকা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট এজেন্সির কাছ থেকে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নেওয়া উচিত।
সৌদি আরবের অনুমোদিত ওমরাহ সেবা, ভ্রমণ ও বুকিং-সংক্রান্ত তথ্য জানতে সৌদি আরবের অফিসিয়াল Nusuk Umrah প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশ থেকে ১৪ দিনের ওমরাহ প্যাকেজ
বাংলাদেশের অনেক মুসল্লি ১৪ দিনের ওমরাহ প্যাকেজ বেছে নেন। কারণ এই সময়ের মধ্যে মক্কায় ওমরাহ পালন, মসজিদুল হারামে নামাজ আদায়, মদিনায় মসজিদে নববী জিয়ারত এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থান পরিদর্শনের সুযোগ পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের প্রকাশিত একটি প্যাকেজ তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে ১৪ দিনের ইকোনমি ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য জনপ্রতি ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা থেকে শুরু। তবে অন্য কিছু সেবাদাতার তালিকায় এর চেয়ে কম শুরুর দামও দেখা যায়। এসব কম দামের প্রস্তাবে কী কী সুবিধা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তা যাচাই না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।
১৪ দিনের একটি প্যাকেজে সাধারণত নিচের সুবিধাগুলো থাকতে পারে:
ঢাকা থেকে জেদ্দা বা মদিনা যাওয়া-আসার বিমান টিকিট।
ওমরাহ ভিসা ও প্রয়োজনীয় প্রসেসিং।
মক্কায় নির্দিষ্ট দিনের হোটেল থাকা।
মদিনায় নির্দিষ্ট দিনের হোটেল থাকা।
বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাতায়াত।
মক্কা থেকে মদিনায় যাতায়াত।
প্রয়োজন অনুযায়ী জিয়ারত ও গাইডের ব্যবস্থা।
তবে হোটেল মসজিদুল হারাম থেকে কত দূরে, একই রুমে কতজন থাকবেন, খাবার দেওয়া হবে কি না এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা কেমন—এসবের ওপর প্যাকেজের মান নির্ভর করে।
১৪ দিনের ওমরাহ প্যাকেজে কোন বিষয়গুলো যাচাই করবেন?
প্যাকেজ বুকিংয়ের আগে মক্কার হোটেলের নাম ও অবস্থান জেনে নিন। মসজিদুল হারাম থেকে হেঁটে যাওয়া সম্ভব কি না, নাকি বাসে যাতায়াত করতে হবে, তা পরিষ্কারভাবে বুঝে নিন।
মদিনার হোটেল মসজিদে নববী থেকে কত দূরে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অনেক প্যাকেজে মক্কা ও মদিনার হোটেলের মান এক রকম থাকে না।
এ ছাড়া বিমান সরাসরি সৌদি আরবে যাবে নাকি ট্রানজিট থাকবে, লাগেজের সুবিধা কতটুকু, খাবার অন্তর্ভুক্ত কি না এবং অতিরিক্ত ব্যাগেজের জন্য টাকা দিতে হবে কি না, তা জেনে নিন।
ওমরাহ প্যাকেজ ২০২৬ বাংলাদেশ মূল্য
২০২৬ সালে বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনের প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে বিমান টিকিটের দাম, হোটেলের ভাড়া, সৌদি আরবের ভিসা ও বিমা খরচ এবং মৌসুমি চাহিদার কারণে প্যাকেজের মূল্য পরিবর্তিত হয়।
সাধারণ সময়ে ইকোনমি প্যাকেজ তুলনামূলক সাশ্রয়ী হতে পারে। অন্যদিকে পাঁচ তারকা হোটেল, হারাম শরিফের কাছাকাছি আবাসন, উন্নত বিমানসেবা এবং ব্যক্তিগত পরিবহনের সুবিধা থাকলে প্যাকেজের মূল্য বেড়ে যায়।
২০২৬ সালের প্যাকেজ কেনার আগে জানতে হবে, ঘোষিত মূল্যটি সম্পূর্ণ প্যাকেজের জন্য নাকি শুধু নির্দিষ্ট কিছু সুবিধার জন্য। কোনো কোনো বিজ্ঞাপনে কম মূল্য দেখানো হলেও বিমান টিকিট, ভিসা, খাবার কিংবা পরিবহনের খরচ আলাদাভাবে যোগ হতে পারে।
তাই এজেন্সির কাছ থেকে লিখিত খরচের বিবরণ নেওয়া ভালো। এতে পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত টাকা দাবি করা হলে তার কারণ বুঝতে সুবিধা হবে।
ওমরাহ প্যাকেজ ২০২৭ বাংলাদেশ মূল্য
২০২৭ সালে যারা বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য প্যাকেজের মূল্য নির্ভর করবে ভ্রমণের সময় এবং সেবার মানের ওপর। বিশেষ করে ২০২৭ সালের রমজান মাসে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা থাকলে আগেভাগে বাজেট তৈরি করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত একটি প্যাকেজ তালিকায় ২০২৭ সালের জন্য ১২ দিনের ফ্যামিলি ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য জনপ্রতি ১ লাখ ৮৯ হাজার টাকা এবং ২১ দিনের রমজান প্যাকেজের মূল্য জনপ্রতি ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো প্রকাশিত বাণিজ্যিক প্যাকেজের প্রাথমিক মূল্য; বুকিংয়ের সময় পরিবর্তন হতে পারে।
২০২৭ সালের প্যাকেজ কেনার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে খেয়াল রাখবেন, রমজানের প্রথম ভাগ, মাঝের ভাগ এবং শেষ দশ দিনের খরচ এক নাও হতে পারে। শেষ দশ দিনে মক্কায় হোটেলের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় থাকার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
তাই ২০২৭ সালে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা থাকলে আগে থেকেই পাসপোর্ট প্রস্তুত রাখা, পরিবারের সদস্যদের সংখ্যা নির্ধারণ এবং বাজেট অনুযায়ী প্যাকেজ নির্বাচন করা ভালো।
হজ করতে কত টাকা লাগে ২০২৬?
ওমরাহ ও হজ দুটি আলাদা ইবাদত। ওমরাহ বছরের অধিকাংশ সময় পালন করা যায়, কিন্তু হজ নির্দিষ্ট সময়ে জিলহজ মাসে অনুষ্ঠিত হয়। এ কারণে দুই ধরনের ধর্মীয় সফরের খরচ ও ব্যবস্থাপনাও আলাদা।
বাংলাদেশের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বনিম্ন হজ প্যাকেজের মূল্য ছিল জনপ্রতি ৪ লাখ ৬৭ হাজার ১৩৭ টাকা। এই প্যাকেজের মধ্যে খাবারের খরচ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অন্যদিকে, বিশেষ প্যাকেজের মূল্য ছিল ৬ লাখ ৯০ হাজার ৫৯৭ টাকা।
২০২৭ সালের হজের জন্য সরকারি সর্বনিম্ন সাশ্রয়ী প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ৫ হাজার ৬৪৮ টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় সর্বনিম্ন প্যাকেজের মূল্য ৫ লাখ ১৩ হাজার ৬৪৮ টাকা নির্ধারণের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ ২০২৬ সালের হজের প্যাকেজের সঙ্গে ওমরাহর প্যাকেজের তুলনা করা ঠিক হবে না। হজের খরচে মিনা ও আরাফাতের তাঁবু, হজকালীন পরিবহন, আবাসন, কোরবানি এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনার ব্যয় যুক্ত থাকে।
বাচ্চাদের ওমরাহ প্যাকেজ
পরিবারের ছোট শিশুদের নিয়ে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করলে আগে থেকেই শিশুদের ভ্রমণ খরচ সম্পর্কে ধারণা নেওয়া প্রয়োজন। কারণ বাচ্চাদের ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য সাধারণত তাদের বয়স, বিমানের আসন, হোটেলের রুম এবং প্যাকেজের অন্যান্য সুবিধার ওপর নির্ভর করে।
বিশেষ করে দুই বছরের কম বয়সী শিশু এবং দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের বিমানের ভাড়া ও আসনসংক্রান্ত নিয়ম এক নয়। অধিকাংশ এয়ারলাইনে দুই বছরের কম বয়সী শিশু অভিভাবকের কোলে ভ্রমণ করলে আলাদা নিয়মে টিকিট পায়। তবে নির্দিষ্ট বয়সসীমা ও ভাড়া সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনের নীতির ওপর নির্ভর করে।
অন্যদিকে, দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুর জন্য সাধারণত আলাদা আসন প্রয়োজন হয়। ফলে বিমান টিকিটের খরচও বাড়তে পারে।
বাচ্চাদের ওমরাহ প্যাকেজের খরচ কীভাবে নির্ধারিত হয়?
শিশুদের প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণের সময় কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করা হয়।
প্রথমত, শিশুর বয়স অনুযায়ী বিমানের টিকিটের মূল্য নির্ধারিত হয়। দ্বিতীয়ত, হোটেলে শিশুর জন্য আলাদা বিছানা প্রয়োজন কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয়ত, খাবার ও পরিবহন সুবিধার জন্য অতিরিক্ত খরচ যুক্ত হতে পারে।
পরিবারের চারজন সদস্য একসঙ্গে ওমরাহ পালন করতে গেলে একই রুমে থাকার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা যাচাই করা উচিত। অনেক সময় পরিবারের জন্য আলাদা রুম নিলে জনপ্রতি খরচ বেড়ে যায়। আবার একই রুমে একাধিক সদস্য থাকলে খরচ তুলনামূলক কম হতে পারে।
শিশুদের নিয়ে ওমরাহ পালনে যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন
শিশুদের নিয়ে সৌদি আরবে যাওয়ার আগে তাদের পাসপোর্ট, ভিসা, প্রয়োজনীয় পরিচয়পত্র এবং স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। দীর্ঘ বিমানযাত্রা, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং ভিড়ের বিষয়টি বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পোশাক, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী সঙ্গে রাখা ভালো।
এ ছাড়া হোটেল থেকে মসজিদুল হারামের দূরত্ব কম হলে শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের নিয়ে যাতায়াত সহজ হয়। তাই শুধু কম দামের প্যাকেজ না দেখে পরিবারের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
২০২৬ সালের রমজানে ওমরাহ প্যাকেজ কী কী?
রমজান মাসে ওমরাহ পালনের জন্য মুসল্লিদের আগ্রহ তুলনামূলক বেশি থাকে। বিশেষ করে রমজানের শেষ দশ দিনে মক্কা ও মদিনায় অবস্থান করার পরিকল্পনা করেন অনেকেই। এ সময় হোটেলের চাহিদা ও বিমান টিকিটের মূল্য বেড়ে যাওয়ায় ওমরাহ প্যাকেজের খরচও সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি হতে পারে।
তবে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—২০২৬ সালের রমজান ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তাই ২০২৬ সালের রমজানের প্যাকেজগুলো এখন আর ভবিষ্যৎ ভ্রমণের জন্য বুকিংযোগ্য নয়। বর্তমানে যারা রমজানে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করছেন, তাদের ২০২৭ সালের প্যাকেজ বিবেচনা করা উচিত।
২০২৭ সালের রমজান আনুমানিক ৮ বা ৯ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে পারে। চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারিত হবে।
২০২৭ সালের রমজান ওমরাহ প্যাকেজের সম্ভাব্য ধরন
রমজানে সাধারণত বিভিন্ন মেয়াদের ওমরাহ প্যাকেজ পাওয়া যায়। যেমন ১০ থেকে ১৪ দিনের প্যাকেজ, ১৫ দিনের প্যাকেজ এবং ২১ থেকে ৩০ দিনের প্যাকেজ। কিছু প্যাকেজে রমজানের প্রথম ভাগে অবস্থানের ব্যবস্থা থাকে, আবার কিছু প্যাকেজে মাঝের বা শেষ দশকের সময় নির্ধারণ করা হয়।
একটি প্রকাশিত ২০২৭ সালের প্যাকেজ তালিকায় ২১ দিনের রমজান ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য জনপ্রতি ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। তবে শেষ দশকে অবস্থান, হারামের কাছাকাছি হোটেল কিংবা উন্নতমানের আবাসন বেছে নিলে খরচ আরও বাড়তে পারে।
রমজানের প্যাকেজ কেনার আগে জানতে হবে, সেহরি ও ইফতারের খাবার অন্তর্ভুক্ত কি না। মক্কা ও মদিনায় কত দিন থাকতে হবে, হোটেল থেকে মসজিদে যাতায়াতের ব্যবস্থা রয়েছে কি না এবং শেষ দশকে হোটেল পরিবর্তন করতে হবে কি না, তা নিশ্চিত করুন।
ওমরাহ প্যাকেজের খরচ কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?
বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনের মোট খরচ শুধু ভিসা বা বিমান টিকিটের ওপর নির্ভর করে না। একাধিক খাতের ব্যয় একত্র করে প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণ করা হয়।
বিমান টিকিটের খরচ
ওমরাহ প্যাকেজের একটি বড় অংশ ব্যয় হয় বিমান টিকিটের জন্য। ঢাকা থেকে জেদ্দা অথবা মদিনা হয়ে সৌদি আরবে যাতায়াত করতে হয়। সরাসরি ফ্লাইট, ট্রানজিট ফ্লাইট, এয়ারলাইন এবং ভ্রমণের সময় অনুযায়ী টিকিটের মূল্য পরিবর্তিত হয়।
মক্কা ও মদিনার হোটেল ভাড়া
হোটেলের অবস্থান ও মান ওমরাহ প্যাকেজের মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। মসজিদুল হারামের কাছাকাছি হোটেলের ভাড়া সাধারণত বেশি। একইভাবে মসজিদে নববীর কাছাকাছি হোটেলেও তুলনামূলক বেশি খরচ হতে পারে।
খাবারের খরচ
কিছু প্যাকেজে প্রতিদিন তিন বেলা খাবার দেওয়া হয়। আবার কিছু প্যাকেজে শুধু হোটেলে থাকার ব্যবস্থা থাকে, খাবারের খরচ নিজের বহন করতে হয়। রমজানের প্যাকেজে সেহরি ও ইফতারের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত আছে কি না, তা বিশেষভাবে যাচাই করতে হবে।
সৌদি আরবে যাতায়াত
জেদ্দা বিমানবন্দর থেকে মক্কা, মক্কা থেকে মদিনা এবং মদিনা থেকে বিমানবন্দরে যাওয়ার পরিবহন খরচও প্যাকেজের মধ্যে থাকতে পারে। তবে সব এজেন্সির প্যাকেজে একই ধরনের পরিবহন সুবিধা থাকে না।
জিয়ারত ও গাইডের খরচ
অনেক ওমরাহ প্যাকেজে মক্কা ও মদিনার গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থানগুলো জিয়ারতের ব্যবস্থা থাকে। কোথাও এই সুবিধা বিনামূল্যে দেওয়া হয়, আবার কোথাও আলাদা চার্জ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনে কীভাবে খরচ কমাবেন?
ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করার সময় কিছু বিষয়ে সচেতন থাকলে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সম্ভব।
প্রথমত, রমজানের শেষ দশক কিংবা অতিরিক্ত ব্যস্ত সময়ে ভ্রমণ না করে তুলনামূলক কম চাহিদার সময়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে পারেন। দ্বিতীয়ত, মসজিদুল হারাম থেকে সামান্য দূরে হোটেল নির্বাচন করলে থাকার খরচ কম হতে পারে। তবে যাতায়াতের সুবিধা ও পরিবহন খরচ হিসাব করতে হবে।
তৃতীয়ত, কয়েকটি লাইসেন্সধারী এজেন্সির প্যাকেজ তুলনা করুন। শুধু বিজ্ঞাপনে দেওয়া সর্বনিম্ন মূল্য দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। প্যাকেজের মধ্যে বিমান টিকিট, ভিসা, বিমা, হোটেল, খাবার এবং পরিবহন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কি না, তা মিলিয়ে দেখুন।
চতুর্থত, পরিবার বা পরিচিত কয়েকজন একসঙ্গে ভ্রমণ করলে রুম শেয়ারিংয়ের সুযোগ পাওয়া যেতে পারে। এতে জনপ্রতি আবাসন খরচ কমতে পারে।
সবশেষে, বুকিংয়ের আগে টাকা জমা দেওয়ার রসিদ, প্যাকেজের শর্তাবলি, হোটেলের নাম এবং ফেরত বা বাতিলের নিয়ম লিখিতভাবে সংগ্রহ করুন। অনুমোদন ও লাইসেন্স যাচাই না করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বড় অঙ্কের টাকা পাঠানো উচিত নয়।
ওমরাহ পালনের জন্য এজেন্সি নির্বাচন করার সময় সতর্কতা
বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ পালনের জন্য এজেন্সি নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভুল এজেন্সি নির্বাচন করলে ভিসা, হোটেল, বিমান টিকিট কিংবা সৌদি আরবে যাতায়াত নিয়ে সমস্যায় পড়তে পারেন।
এজেন্সি নির্বাচন করার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করুন। প্রতিষ্ঠানের বৈধ লাইসেন্স ও অনুমোদন রয়েছে কি না যাচাই করুন। প্যাকেজের মূল্য ও সুবিধাগুলো লিখিতভাবে সংগ্রহ করুন। হোটেলের নাম, অবস্থান, বিমান সংস্থার নাম এবং যাতায়াতের ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন।
বিশেষ করে কোনো এজেন্সি যদি বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম মূল্যে ওমরাহ প্যাকেজ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, তাহলে সতর্ক থাকুন। ভিসা ও বিমান টিকিট নিশ্চিত হওয়ার আগে পুরো টাকা পরিশোধের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করুন।
ওমরাহ হজ করতে কত টাকা লাগে: সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
ওমরাহ ভিসার খরচ কত?
২০২৬ সালের প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, ওমরাহ ভিসার সরকারি ফি ৩০০ সৌদি রিয়াল এবং বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্যবিমার খরচ আনুমানিক ১০০ থেকে ১৮০ রিয়াল। এজেন্সির সার্ভিস চার্জসহ বাংলাদেশ থেকে ভিসা প্রসেসিংয়ের খরচ প্রায় ১৭ হাজার থেকে ৩৮ হাজার টাকা হতে পারে। তবে ভিসার ধরন, বিমা ও এজেন্সিভেদে প্রকৃত খরচ পরিবর্তিত হয়।
২০২৬ সালের রমজানে ওমরাহ প্যাকেজ কী কী?
২০২৬ সালের রমজান ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। ওই সময়ে সাধারণত ১০, ১৪, ১৫, ২১ ও ৩০ দিনের বিভিন্ন মেয়াদের ওমরাহ প্যাকেজ পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমানে রমজানে ওমরাহ পালনের পরিকল্পনা করলে ২০২৭ সালের প্যাকেজ দেখতে হবে। ২০২৭ সালের একটি প্রকাশিত ২১ দিনের রমজান প্যাকেজের মূল্য জনপ্রতি ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা।
উপসংহার
বাংলাদেশ থেকে ওমরাহ হজ করতে কত টাকা লাগে, তা মূলত প্যাকেজের মেয়াদ, হোটেলের মান, বিমান টিকিট ও ভ্রমণের সময়ের ওপর নির্ভর করে। ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি ১৪ দিনের ইকোনমি প্যাকেজের মূল্য জনপ্রতি ১ লাখ ৪৯ হাজার টাকা থেকে শুরু হয়েছে। অন্যদিকে, ২০২৭ সালের রমজান প্যাকেজের মূল্য ২ লাখ ১৯ হাজার টাকা থেকে দেখা যাচ্ছে। ওমরাহ পালনের আগে ভিসা, হোটেল, বিমান টিকিট ও অন্যান্য সুবিধার খরচ যাচাই করা জরুরি। সঠিক এজেন্সি নির্বাচন ও আগাম পরিকল্পনার মাধ্যমে তুলনামূলক সাশ্রয়ী বাজেটে পবিত্র ওমরাহ পালন করা সম্ভব।