
প্রযুক্তির দুনিয়ায় পুরোনো দিনের জনপ্রিয় গ্যাজেট নতুন রূপে ফিরে আসার প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। ক্যাসেট প্লেয়ার, ভিনাইল রেকর্ড কিংবা তারযুক্ত হেডফোনের প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহও তৈরি হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার প্রায় ৪৭ বছর আগের একটি জনপ্রিয় হেডফোন নতুন করে বাজারে এনেছে জাপানের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সনি। প্রতিষ্ঠানটি ফিরিয়ে এনেছে তাদের ঐতিহাসিক ওয়াকম্যান হেডফোনের নকশা, তবে এবার তাতে যুক্ত করা হয়েছে আধুনিক USB-C সংযোগ।
নতুন হেডফোনটির নাম Sony MDR-3R। এটি মূলত ১৯৭৯ সালে প্রথম Sony Walkman TPS-L2 ক্যাসেট প্লেয়ারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া MDR-3 সিরিজের নকশা অনুসরণ করে তৈরি। পুরোনো মডেলের পরিচিত চেহারা, হালকা গঠন এবং কমলা রঙের ইয়ার কুশন ধরে রেখেই নতুন সংস্করণটি তৈরি করেছে সনি। তবে নামের ক্ষেত্রে সামান্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগের মডেলটির নাম ছিল MDR-3L2, আর নতুনটির নাম MDR-3R।
১৯৭৯ সালের ওয়াকম্যান হেডফোনের স্মৃতি ফিরিয়ে আনল সনি
১৯৭৯ সালে Sony Walkman TPS-L2 বাজারে আসার সময় ব্যক্তিগতভাবে গান শোনার অভিজ্ঞতায় বড় পরিবর্তন এসেছিল। এর সঙ্গে দেওয়া MDR-3L2 হেডফোনটিও দ্রুত পরিচিতি পায়। সে সময়ের প্রচলিত বড় ও ভারী হেডফোনের তুলনায় এটি ছিল অনেক বেশি হালকা, সরল এবং বহনযোগ্য।
হেডফোনটির সবচেয়ে পরিচিত বৈশিষ্ট্য ছিল ধূসর রঙের প্লাস্টিকের হেডব্যান্ড, যা ধাতব স্লাইডারের সাহায্যে প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট-বড় করা যেত। দুই পাশে ছিল গোলাকার কমলা রঙের ইয়ার কুশন। এই নকশা শুধু ব্যবহারিক সুবিধাই দেয়নি, বরং প্রথম প্রজন্মের ওয়াকম্যানের সঙ্গে একটি আলাদা পরিচিতিও তৈরি করেছিল।
নতুন MDR-3R-এ সেই পুরোনো নকশাই ফিরিয়ে এনেছে সনি। ফলে যারা আশির দশক বা নব্বইয়ের দশকের প্রযুক্তিপণ্যের প্রতি আগ্রহী, তাদের কাছে হেডফোনটি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পুরোনো ওয়াকম্যানের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক সম্পর্ক পণ্যটিকে সাধারণ হেডফোনের চেয়ে আলাদা করেছে।
পুরোনো নকশা, সঙ্গে আধুনিক USB-C সংযোগ
নতুন হেডফোনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো USB-C সংযোগ। বর্তমানে অনেক স্মার্টফোনে প্রচলিত ৩.৫ মিলিমিটার হেডফোন জ্যাক থাকে না। ফলে পুরোনো ধরনের তারযুক্ত হেডফোন ব্যবহার করতে গেলে অনেক ক্ষেত্রে আলাদা অ্যাডাপ্টারের প্রয়োজন হয়।
সনি MDR-3R-এ সরাসরি USB-C সংযোগ যুক্ত করে সেই সমস্যার একটি সহজ সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করেছে। ফলে সামঞ্জস্যপূর্ণ USB-C অডিও সমর্থিত স্মার্টফোন, ট্যাবলেট ও অন্যান্য ডিভাইসে এটি ব্যবহার করা যাবে। তবে সব USB-C পোর্টে একইভাবে অডিও সমর্থন পাওয়া যায় না। তাই কেনার আগে নিজের ডিভাইসের সঙ্গে হেডফোনটির সামঞ্জস্য যাচাই করা জরুরি।
এখানে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সনি পুরোনো মডেলের তারযুক্ত ব্যবহারের ধারণা বজায় রেখেছে। নতুন হেডফোনটি ব্লুটুথনির্ভর নয়। অর্থাৎ চার্জ দেওয়া, ব্লুটুথ পেয়ারিং কিংবা ওয়্যারলেস সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো বিষয় নিয়ে ব্যবহারকারীকে ভাবতে হবে না।
কমলা ও নীল রঙের ইয়ার কুশন
পুরোনো MDR-3 হেডফোনের অন্যতম পরিচিত বৈশিষ্ট্য ছিল এর কমলা রঙের গোলাকার ইয়ার কুশন। নতুন MDR-3R-এর সঙ্গেও কমলা রঙের কুশন দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নীল রঙের ইয়ার কুশনও থাকছে।
এতে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী হেডফোনের বাহ্যিক চেহারা পরিবর্তনের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে যারা রেট্রো প্রযুক্তিপণ্য পছন্দ করেন, তাদের কাছে এই ছোট পরিবর্তনও আকর্ষণীয় হতে পারে।
বর্তমান সময়ের অনেক হেডফোনে বড় আকারের ইয়ার কাপ, মোটা প্যাডিং এবং প্রশস্ত হেডব্যান্ড ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে MDR-3R তুলনামূলক সরল ও হালকা অন-ইয়ার নকশার। ফলে এটি আধুনিক হেডফোনের প্রচলিত ডিজাইন থেকে আলাদা।
২৩ মিলিমিটারের ড্রাইভার, কেমন হবে সাউন্ড কোয়ালিটি?
নতুন MDR-3R-এ সনি ব্যবহার করেছে ২৩ মিলিমিটারের ড্রাইভার ইউনিট। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, মূল MDR-3 মডেলের কাছাকাছি সাউন্ড অভিজ্ঞতা ধরে রাখতেই এই ড্রাইভার ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে আধুনিক হাই-এন্ড হেডফোনের সঙ্গে তুলনা করলে এর অডিও সক্ষমতা নিয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। বিশেষ করে যারা শক্তিশালী বেজ, উন্নত অ্যাকুস্টিক প্রযুক্তি কিংবা বিস্তৃত সাউন্ড কাস্টমাইজেশন চান, তাদের প্রত্যাশা পূরণ নাও হতে পারে।
নতুন হেডফোনটির একটি পর্যালোচনায় এর মিড ও হাই ফ্রিকোয়েন্সির শব্দকে উজ্জ্বল ও পরিষ্কার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টেরিও সেপারেশন বা দুই পাশের শব্দ আলাদা করে অনুভব করার সক্ষমতাও ইতিবাচকভাবে উঠে এসেছে। তবে বেজের ক্ষেত্রে খুব শক্তিশালী পারফরম্যান্স প্রত্যাশা না করাই ভালো।
অর্থাৎ MDR-3R মূলত আধুনিক অডিওফাইলদের জন্য সর্বোচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন হেডফোন হিসেবে তৈরি হয়নি। বরং পুরোনো সাউন্ড অভিজ্ঞতা, সরল নকশা এবং দৈনন্দিন গান শোনার সুবিধাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মাইক্রোফোন ও ইনলাইন রিমোট যুক্ত হয়েছে
মূল MDR-3 মডেলের তুলনায় নতুন সংস্করণে ব্যবহারিক কিছু সুবিধাও যোগ করেছে সনি। MDR-3R-এ রয়েছে ইনলাইন রিমোট কন্ট্রোল এবং বিল্ট-ইন মাইক্রোফোন।
ইনলাইন রিমোটের মাধ্যমে সমর্থিত ডিভাইসে গান নিয়ন্ত্রণ বা কল পরিচালনার সুবিধা পাওয়া যেতে পারে। অন্যদিকে মাইক্রোফোন থাকায় হেডফোনটি দিয়ে কথা বলাও সম্ভব।
তবে এতে নয়েজ ক্যানসেলেশন প্রযুক্তি নেই। ফলে রাস্তার যানবাহনের শব্দ, জনবহুল জায়গার কোলাহল কিংবা অন্য কোনো ব্যস্ত পরিবেশে কথা বলার সময় মাইক্রোফোনের কার্যকারিতা সীমিত হতে পারে। যারা নিয়মিত অনলাইন মিটিং বা шумপূর্ণ পরিবেশে ফোনে কথা বলেন, তাদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা উচিত।
তারযুক্ত হেডফোনের জনপ্রিয়তা কি আবার বাড়ছে?
একসময় তারযুক্ত হেডফোন ছিল স্মার্টফোন ও মিউজিক প্লেয়ারের সাধারণ অনুষঙ্গ। পরে ব্লুটুথ প্রযুক্তির উন্নতি এবং ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের জনপ্রিয়তায় তারযুক্ত হেডফোনের ব্যবহার অনেকটাই কমে যায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবার তারযুক্ত অডিও ডিভাইসের প্রতি আগ্রহ বাড়তে দেখা যাচ্ছে।
এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তারযুক্ত হেডফোনে আলাদা ব্যাটারি চার্জ করার প্রয়োজন হয় না। সংযোগ স্থাপনও তুলনামূলক সহজ। পাশাপাশি অনেক ব্যবহারকারী ব্লুটুথ সংযোগের পরিবর্তে সরাসরি তারের মাধ্যমে অডিও শুনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
অন্যদিকে ক্যাসেট, ভিনাইল রেকর্ড এবং পুরোনো মিউজিক প্লেয়ারের প্রতিও নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সনির ওয়াকম্যান ব্র্যান্ডও এই নস্টালজিক প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যদিও বর্তমানে সনির ওয়াকম্যান সিরিজে ক্যাসেট প্লেয়ারের পরিবর্তে অ্যান্ড্রয়েডভিত্তিক ডিজিটাল মিউজিক প্লেয়ার পাওয়া যায়, তবু পুরোনো ওয়াকম্যানের ঐতিহ্য এখনো অনেকের কাছে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
MDR-3R সেই পুরোনো দিনের স্মৃতিকে আধুনিক ডিভাইস ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত করার একটি প্রচেষ্টা।
Sony MDR-3R-এর দাম কত, বাংলাদেশে পাওয়া যাবে?
সনির ঘোষণা অনুযায়ী, নতুন MDR-3R হেডফোনটির দাম ৬০ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় সরাসরি হিসাব করলে এর পরিমাণ প্রায় ৭ হাজার ৩০০ টাকার কাছাকাছি। তবে এটি কেবল ডলারের আনুমানিক রূপান্তর; বাংলাদেশের বাজারমূল্য নয়।
বাংলাদেশে পণ্যটির আনুষ্ঠানিক বাজারজাতকরণ, বিক্রির সময়সূচি কিংবা স্থানীয় দাম সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে দেশে এটি কবে পাওয়া যাবে এবং বিক্রয়মূল্য কত নির্ধারণ করা হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
বাংলাদেশি ক্রেতাদের জন্য কেনার আগে USB-C অডিও সামঞ্জস্য, ওয়ারেন্টি এবং ইয়ার কুশনের অতিরিক্ত সেট পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেসব বিষয় যাচাই করা প্রয়োজন।
কাদের জন্য Sony MDR-3R ভালো পছন্দ হতে পারে?
যারা পুরোনো ওয়াকম্যানের নকশা পছন্দ করেন, তাদের জন্য MDR-3R একটি আকর্ষণীয় সংগ্রহযোগ্য পণ্য হতে পারে। পাশাপাশি যারা তারযুক্ত হেডফোন ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন এবং USB-C সংযোগ চান, তারাও এটি বিবেচনায় রাখতে পারেন।
তবে যারা শক্তিশালী বেজ, অ্যাকটিভ নয়েজ ক্যানসেলেশন, ওয়্যারলেস সংযোগ কিংবা দীর্ঘ সময় ব্যবহারের জন্য বড় ও নরম ইয়ার প্যাড খুঁজছেন, তাদের জন্য বাজারের অন্য আধুনিক হেডফোন বেশি উপযোগী হতে পারে।
সব মিলিয়ে Sony MDR-3R কেবল পুরোনো একটি হেডফোনের পুনরাবির্ভাব নয়; এটি প্রযুক্তির ইতিহাস ও বর্তমান ব্যবহারের মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি করেছে। ১৯৭৯ সালের পরিচিত নকশার সঙ্গে USB-C, মাইক্রোফোন ও রিমোট যুক্ত করে সনি দেখিয়েছে, পুরোনো প্রযুক্তির আবেদন এখনো শেষ হয়ে যায়নি।
Sources