আজ বৃহস্পতিবার, ০৪ Jun ২০২০, ০৪:৩৯ অপরাহ্ন
Smiley face

শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মূলধারায় আনতে করণীয়

শ্রবণশক্তি হ্রাস একজন মানুষকে সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে। ঠিকমতো শুনতে না পারার ভয়ে একজন মানুষ নিজেকে সব ধরনের সামাজিক, পারিবারিক কর্মকান্ড থেকে গুটিয়ে নিতে পারে। আমাদের দেশে কর্মস্থল, বাজারঘাটসহ সকল স্থান শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যোগাযোগের পক্ষে মোটেই উপযুক্ত নয়। তৎসত্ত্বেও কতিপয় উপকরণ, অযাচিত শব্দের মাত্রা হ্রাস এবং যোগাযোগের উত্তম চর্চার ব্যবহার করে শ্রবণ প্রতিবন্ধী মানুষের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ চালিয়ে নেয়া যায়। আপনি কিভাবে একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে আরো সহজ করতে পারেন তার কয়েকটি পদক্ষেপ উল্লেখ করছি।
পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে শ্রবণ সমস্যা আপনাকে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে পারে
তের বছর বয়সে আমি যখন স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র, তখন আমার শ্রবণ সমস্যা ধরা পরে। উল্লেখ্য যে, আমাদের পরিবারে আমার মা এবং সাত ভাই বোনের মধ্যে আমি এবং আমার আরেক ভাই এই শ্রবণ প্রতিবন্ধীতায় আক্রান্ত হই। শ্রবণ সমস্যা ধরার পরে আমি প্রায়ই আমার বন্ধু, পরিবারের সদস্য এবং অন্যদের পুনরায় বলার অনুরোধ করতাম। যদিও আমাদের সমাজ এটিকে এখনো পর্যন্ত সহজ ভাবে নেয় নি। ক্লাশে শিক্ষকদেরকে পুনরায় বলতে বলাটা ছিল আরো কঠিন। ফলে স্কুলে ও কলেজে আমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। রেডিও টেলিভিশন ছিল আমার জন্য অনুপযোগী। ফলে আমি অনেক কিছুই মিস করতাম যা আমার বন্ধুরা জানতো। ফলশ্রুতিতে সামাজিক জীবনে আমি পিছিয়ে পরি। কলেজে অধ্যয়নকালীন সময়ে হিয়ারিং এইড ব্যবহার করে আমি আমার শ্রবণ সমস্যার কিছুটা সমাধান করি। আমার মতো অনেকেরই হিয়ারিং এইড আমাদের জীবনের একটি অংশ। যার দ্বারা আমরা স্বাভাবিকভাবে অন্যদের সহিত যোগাযোগ স্থাপন করতে পারি।
শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা আপনার ধারণার চাইতেও বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে বিশ্বের ৪৬ কোটি ব্যক্তি শ্রবণ প্রতিবন্ধী। যাদের বেশিরভাগই বসবাস করে এশিয়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ সংস্থা আশংকা করছে, আগামী ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তারা সতর্ক করেছেন যে, এই বিষয়টি শুধুমাত্র বয়স জনিত শ্রবণ সমস্যা নয়, বরং শব্দ দূষণের কারণে ১১০ কোটিরও বেশি কিশোর, কিশোরী, তরুণ এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের শ্রবণ শক্তি হ্রাস হওয়ার ঝুকিতে আছে।
শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি এবং এরদ ফলশ্রুতিতে অর্থনীতিতে তার বিরূপ প্রভাব থাকা সত্ত্বেও বিষয়টিকে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয় না। কিন্তু এ বিষয়ে আরো গুরুত্ব প্রদান করা উচিত। শ্রবণ শক্তি হ্রাস ডায়াবেটিস, কার্ডিওভাসকুলার জনিত রোগসহ আরো অনেক গুরুতর চিকিৎসার সহিত জড়িত। সঠিকভাবে শুনতে না পারার কারণে যোগাযোগ থেকে বাদ পরায় দৈনন্দিন জীবনের উপর তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে একাকীত্ব, বিচ্ছিন্নতা এবং হতাশার অনুভুতি হয়। শ্রবণ সমস্যার সমাধান না করা হলে ডিমেনশিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
হিয়ারিং এইড শ্রবণ সমস্যার সমাধান দেয় না তবে শুনতে সহযোগিতা করে
শ্রবণ সমস্যা অনুধাবন করা কঠিন যদি আপনি নিজ শ্রবণ প্রতিবন্ধী না হন। শুনতে সক্ষম ব্যক্তিরা যোগাযোগের প্রতিটি শব্দ শুনে থাকে এবং তা থেকে বক্তার কথার অর্থ অনুধাবন করেন। কিন্তু শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা কথোপকথনের মাঝে অনেক শব্দ শুনতে পান না। না শুনতে পাওয়া এই শব্দগুলোকে বাদ দিয়েই তারা বক্তার কথার অর্থ অনুধাবন করার চেষ্টা করেন। এতে অনেক সময় একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বক্তার কথা সঠিক অর্থ না বুঝে ভুল বুঝেন। ফলে বক্তা এই ব্যক্তির উপর অনেক সময় বিরক্ত হন। সামাজিক যোগাযোগ অনেক সময় এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু কর্মক্ষেত্র, শিক্ষালয়ে এটি খুবই কঠিন। ফলশ্রুতিতে তৈরী হয় বিচ্ছিন্নতা এবং তা পরিচালিত করে হতাশার দিকে।
হিয়ারিং এইড পরিধান করলেও একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধীকে শোনার জন্য মনোযোগ দিতে হয়। এটি চশমার মতো কাজ করে না। চশমা ঝাপসাকে পরিষ্কার দেখায়। কিন্তু হিয়ারিং এইড সেরকম নয়। এটি কেবল শব্দের ভলিউমকে বাড়িয়ে দেয়। শব্দকে শ্রোতার উপযোগী করে না। আশেপাশের শব্দ বিশেষ করে বাজারে, যানবাহনে বা নিরিবিলি নয় এমন অবস্থায় হিয়ারিং এইড পরিধান করা থাকলেও যোগাযোগে সমস্যা হয়।
আমরা শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কীভাবে সহায়তা করতে পারি?
শ্রবণ প্রতিবন্ধিতা অন্যান্য প্রতিবন্ধিতার মতো নয়। এটি অদৃশ্য। চোখে দেখা যায় না বলে মানুষ সহজেই একে উপেক্ষা করতে পারে। সে জন্য শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উচিত তাদের কি ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন তা নিজে থেকেই চেয়ে নেয়া।
শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সকল কর্মকান্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে বেশ কিছু ব্যবস্থা বিদ্যমান আছে যদিও তা ব্যয় সাপেক্ষ। কিছু প্রযুক্তি চালু করে শ্রবণ প্রতিবন্ধীদের যোগাযোগকে ত্বরান্বিত করা যায়। এজন্য আইন/নীতিমালার প্রয়োজন রয়েছে এবং তা ব্যয় সাপেক্ষ। কিন্তু কিছু ব্যবস্থা রয়েছে যা খুবই সহজ এবং অতিরিক্ত খরচ ব্যতিত তার ব্যবস্থা করা যায়। দেখে নেই আমরা কিভাবে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শুনায় সহযোগিতা করতে পারিঃ
১. শব্দ দূষণ কমানোঃ শব্দ দূষণ সকলের জন্য, বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর। শব্দ দূষণ আমাদের শরিরের কর্টিসল নামক হরমোন কমিয়ে দেয় এবং আমাদের শ্রবণ শক্তির ক্ষতি করে। কর্টিসল শ্রবণ শক্তি কমিয়ে বা না কমিয়ে মানুষের সাথে যোগাযোগ করার ইচ্ছাকে কমিয়ে দেয়। তাই কর্মক্ষেত্রে, রাস্তাঘাটে, বাজারে, ওয়াজ, জনসভা, শিল্প কারখানা, বন্দরে, রেষ্টুরেন্টে এমনকি সম্ভব হলে কনসার্ট বা গান বাজনার অনুষ্ঠানের শব্দেরও একটি মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া উচিত। শুধু তাই নয়, যারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শব্দ নিয়ন্ত্রকের কাজ করেন, তারা কোন নির্দেশ ছাড়াই সাধারণ মানুষের সুবিধা বিবেচনা করে শব্দের ভলিউম কমিয়ে দিতে পারেন।
২. সভায় মাক্রাফোন ব্যবহারঃ সভায় সবাই ভালো শুনতে পায় এমনটা ভাবা ঠিক নয়। সভায় লক্ষ্য করা যায় অংশগ্রহণকারীরা একে অপরের সাথে কথা বলে। এটি একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পক্ষে বক্তার কথা শুনতে বাধা প্রদান করে। যদি মাইক্রোফোন ব্যবহার করা হয়, তাহলে একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী খুব সহজেই পাশের ব্যক্তিদের কথোপকথন এড়িয়ে বক্তার কথা বুঝতে পারেন।
৩. উন্মুক্ত স্থানে শ্রবণ সহায়ক উপকরণ ব্যবহারঃ ইমারত নির্মাণ আইন অনুযায়ী নতুন ভবন, স্কুল, অফিস, বন্দর বা পাবলিক স্পেস নির্মাণ করার সময় অবশ্যই হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী র‌্যাম্প স্থাপন করার বিধান আছে। বিমান, রেল বা বাস ষ্টেশনে হিয়ারিং লুপ ব্যবহার করে ঘোষণা শুনাকে ত্বরান্বিত করা যায়। মাইকে যে সকল ঘোষণা প্রদান করা হয়, তা লিখিত আকারে মনিটরে ডিসপ্লে করার ব্যবস্থা থাকতে পারে ফলে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা তা পাঠ করে জরুরী ঘোষণা জেনে নিতে পারেন। অনেক ভবনে নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড থাকতে পারে যেখানে উল্লেখ থাকবে কোন রুম কোন দিকে। থিয়েটার, প্রশিক্ষণ কক্ষ, কোর্ট, জেলখানা সর্বত্র মনিটরে বা ডিসপ্লেতে ক্যাপশন করে সকল ঘোষণা শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী করা যেতে পারে।
৪. উত্তম আচরণঃ কোন ব্যক্তি যখন একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সাথে কথা বলবেন তখন আলোতে মুখোমুখি দাড়িয়ে কথা বলা উত্তম যাতে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাকে দেখতে পান। কারণ একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি শুধু শব্দ শুনেই অর্থ বুঝে না। সেই সাথে তিনি লিপ রিডিং এবং মুখের নড়াচড়া দেখেন। ফলে তার পক্ষে বক্তার কথা পরিষ্কারভাবে বুঝা যায়। তাই কথা বলার সময় মুখ ঢেকে না রাখা, অযাচিত মুখভঙ্গি না করা উত্তম। খেতে খেতে কথা বলবেন না। এতে করে একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী আপনার কথা বুঝতে পারবেন না। অনেকেই মনে করে চেচিয়ে উচ্চ স্বরে কথা বললে শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ভাল বুঝবেন। এটি একটি মারাত্বক ভুল ধারণা। আপনি সঠিক শব্দটি সঠিকভাবে ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলে তার পক্ষে বুঝতে সুবিধা হয়। একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী যদি আপনাকে পুনরায় বলতে অনুরোধ করে, দয়া করে তার অনুরোধ ফেলবেন না বা এড়িয়ে যাবেন না। কার্যকর যেগাযোগের জন্য উভয় পক্ষের সক্রিয় প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
৫. দরজায় ডোর লাইট ব্যবহারঃ আমরা সবাই দরজা খোলার জন্য ডোর বেল ব্যবহার করি। কিন্তু আপনি জেনে অবাক হবেন, শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজন ডোর লাইট। ডোর বেল নয়। এটি আপনার খরচ কমিয়ে দেবে। আপনাকে বেশি খরচ করে ডোর বেল কিনতে হবে না। এর পরিবর্তে একটি সাধারণ লাইট লাগিয়ে দিন। এটি দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ছাড়া সকলের ব্যবহার উপযোগী।

একজন শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সাথে যোগাযোগ কঠিন এবং ক্লান্তিকর হতে পারে বিশেষ করে শোরগোল ও কোলাহলপূর্ণ এলাকায়। কিন্তু সার্বজনিন স্থানগুলোতে অন্তর্ভুক্তিমূলক যোগাযোগের পক্ষে অনুকুল না হলেও শ্রবণ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অবস্থার পরিবর্তনে আপনার প্রচেষ্টা একটি শুভ সূচনা হতে পারে। এটি জনসচেতনতা তৈরী করবে এবং সমাধান ত্বরান্বিত করবে। আপনার শ্রবণ প্রতিবন্ধী বন্ধুর সমর্থনে এগিয়ে আসুন।

Print Friendly, PDF & Email
error: Content is protected !!