আজ বৃহস্পতিবার, ০৪ Jun ২০২০, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন
Smiley face

অবিশ্বাস

মো:রিয়াজুল ইসলামঃ
দেখো রোজ রোজ এক বিষয় নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে না। এ বিষয় নিয়ে তোমার সঙ্গে আর একটা কথাও বলবো না। তোমার যা ইচ্ছা তুমি তাই করো।

প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে আহসানের সামনে থেকে উঠে যায় তাহিয়া। কিছুদিন হতে একটি বিষয় জানতে চেয়ে আহসান তাকে ত্যাক্ত বিরক্ত করে চলেছে। তাহিয়াও তার উত্তর দিয়েছে। শান্ত থেকেছে, বুঝিয়েও বলেছে। কিন্ত আহসান কিছুতেই মানতে চাচ্ছে না, যেন উত্তর ঠিক করাই আছে আর সে সেটাই শুনতে চায়।

বিয়ের পর কখনই তাহিয়াকে এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। বিশ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল। আর আজ আটত্রিশ ছুই ছুই। আঠারো বছরের সংসার। স্বামী আর চৌদ্দ বছরের আহনাফকে নিয়ে একদম সরলভাবেই গড়িয়েছে জীবন।

বিয়ের প্রথম দুবছর দেশেই ছিল আহসান। শ্বশুর,শাশুরী আর প্রায় তারই সমবয়সী এক মাত্র দেবরকে নিয়ে কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই নিজেকে ক্ষাপ খাইয়ে নেয় তাহিয়া। দুবছর পর জীবিকার তাগিদে আর কিছুট ভাল থাকতে মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দেয় আহসান। প্রথম দিকে বছরে একবার এসে ১৫/২০ দিন থেকে যেত আহসান। চার বছর পর যখন ছেলে আহনাফ পৃথিবীতে আসে তখন ছেলেকে একটু বেশী সময় দিতে নিজেই ব্যবসার সিদ্ধান্ত নেয়,যাতে দেশে এসে বেশি সময় থাকতে পারে। নিজের জমানো টাকা আর কিছু জমি বিক্রি করে বিদেশেই একটা এদেশীয় খাবার হোটেল খুলে নেয়। ভালই চলছিল। সে সময় বছরে দুবার এসেছে। ছয়মাস হলো বিদেশের সকল ব্যবসা গুটিয়ে আর বেশ কিছু কাচা পয়সা হাতে নিয়ে পাকাপাকি দেশে ফিরে আসে।

ব্যবসার মাথা বরাবরই আহসানের ভালো। দেশে ফিরে বেশ কিছু ভালো ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলেন। একটা বড় ওষুধের দোকান, ছোট একটা ডেইরি ফারম আর ৩ বিঘা জমির উপর মাছ চাষ শুরু করেন। ছেলেটাও হয়েছে ভদ্র আর বেশ মেধাবী। ৫ম ও ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছে। এ বছর বিজ্ঞান বিভাগ হতে এস এস সি দেবে। এক কথায় স্বপ্নের মত জীবন। সুখের সাগরে ভেলা ভাসানোর মত অবস্থা।

আহসান মাঝে মধ্যেই ছেলে আহনাফকে নিয়ে হাটতে বের হন। পরিচিত অনেকের সাথেই দেখা হয়। হাই হ্যালো বলেন। কারও কারও সাথে হয়ত কিছুটা কথাও হয়।আহনাফ সকলেরই খুব প্রিয়। যাদের সাথেই কথা হয় বলতে গেলে প্রায় সকলেই আহনাফের রুপ হতে শুরু করে গুনের প্রশংসা করে। বাবা হিসাবে প্রথম দিকে আহসানের বুক গর্বে ভরে উঠতো। কিন্ত ইদানিং এটাই তাকে বিষিয়ে দিয়েছে। এই যেমন গতকাল তার পরিচিত সিরাজ সাহেবর সাথে দেখা হলো। আহনাফও সাথে ছিল
— স্লামালাকুম আহসান ভাই। কেমন আছেন?
— অলাইকুম আস সালাম। জি, ভাল। আপনি কেমন আছেন।
— চলে যাচ্ছে। তা ছেলেকে নিয়ে কই চললেন।
— কোথাও না। এমনি একটু হাটতে বের হয়েছি।
— ছেলে কিন্ত মাসাআল্লাহ আপনার খুব ভাল। যেমন পড়াশুনায় তেমন দেখতে। তবে ও কিন্ত একদম ওর চাচার মত দেখতে। কথাটা বলেই হাসিতে ফেটে পড়েন সিরাজ সাহেব।

প্রশংসার আড়ালে কুৎসিত ইংগিতটা বুঝতে একটুও অসুবিধা হয় না আহসানের।
এ কথাটা অনেকের কাছেই শুনছে সে। কিছুদিন আগে তো একজন তাকে সরাসরিই ইংগিত করেছে। মানুষের কথা শুনতে শুনতে ছেলের মুখে তাকালে তার নিজেরও কেমন যেন মনে হয় নিজের ছোট ভাইয়ের মুখটাই সেখানে দেখতে পায়।

তাহিয়াকে সে এ বিষয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছে। প্রথমটায় প্রচন্ড রেগে যায় তাহিয়া। পরে বুঝিয়ে বলে মানুষ যা বলছে তা মিথ্যা, ঘৃন্য ষড়যন্ত্র। কিন্ত আহসান মানুষের কান কথায় বিরক্ত হয়ে ডিএনএ টেস্টের জন্য বলে।

— ভুলেও এ ধরণের নোংরা চিন্তা মাথায় আনবে না। আহনাফ জানতে পারলে ওর মনের কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছ?

— আমি কোন কথা বুঝি না।আমি পরীক্ষা করাবোই।

— আস্তে কথা বলো। আহনাফ শুনবে।
আমি বেচে থাকতে এটা হতে দেব না। আমি বলছি সেটা কিছু না, মানুষ যা বলছে তাই সত্য?

— যদি মিথ্যা হয় তো পরীক্ষা করাতে ভয় কেন? চিৎকার করে আহসান।

— এ বিষয়ে নিয়ে কথা বলতে আমার রুচিতে বাধছে। এ নিয়ে আর কোন কথা না।

এভাবেই চলে আসছে গত কিছুদিন।

সেদিনটা ছিল ফেব্রুয়ারী মাসের শুক্রবার তারিখ ১৪/০২/২০২০. ঘড়িতে আনুমানিক সকাল ৯.১৫.

আহনাফের ঘর হতে তাহিয়ার চিৎকার শুনে দৌড়ে যায় আহসান। আহনাফের মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছে তাহিয়া। পাশে একটা ছোট বিষের শিশি।
বিছানার উপর রাখা সুসাইড নোটটা তুলে নেয় আহসান

বাবা, মা
আমি সব শুনেছি। ডিএনএ টেস্ট কী তাও বুঝি। যদি বাবার কথা সত্য হয় তো মা কে আর কখনও বিশ্বাস করতে পারব না। আর যদি মা’র কথা সত্য হয় তো বাবাকে ভরসা করতে পারব না। এভাবে বেচে থাকা আমার জন্য সম্ভব না, তাই চলে যাচ্ছি। কারণ আমি তোমাদের প্রচন্ড ভালবাসি।

তোমাদের আহনাফ

চিরকুটটা পড়ে ডুকরে কেদে ওঠে আহসান।

পুলিশি ঝামেলা শেষ করে বিকালে দাফন করে ফেরে আহসান।

১৫/০২/২০২০ ভোর ৭.০০ টা

—তোমাকে একটা কথা বলার ছিল তাহিয়ার কথায় মুখ তুলে তাকায় আহসান।

— আমি চলে যাচ্ছি। আর কখনও আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করবে না।সবাই জানে আমার ছেলেটা আত্মহত্যা করেছে। রিপোর্টও তাই বলবে। কিন্ত আমি জানি এটা মার্ডার। সেটা তুমি করেছ। শেষ কথাটা বলার সময় ঘেন্নায় বিকৃত হয়ে যায় তাহিয়ার মুখ। আর হা আমাকে না জানিয়ে গোপনে যে তুমি আহনাফের ডিএনএ করেছ,এই তার রিপোর্ট। তোমার ড্রয়ারে ছিল। এটা তো তোমার মনের আশা পুরন করলো না। ও তোমারই সন্তান তাই না!

মুখ ঘুরিয়ে হন হন করে চলে যায় তাহিয়া। আহসান চেয়ারে বসে থাকে। যেন কেউ তাকে চেপে ধরে আছে।

সরকার মো: রিয়াজুল ইসলাম
সহকারি উপজেলা শিক্ষা অফিসার
নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

Print Friendly, PDF & Email
error: Content is protected !!