আজ বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ০৪:০৪ পূর্বাহ্ন
Smiley face

ধূসর পানির পান্না

স্কুল থেকে ফিরে সাফওয়ানের গোসল করতে খুবই ভাল লাগে। আসলে দিনের মধ্যে যত কাজ তাকে করতে হয় তার মধ্যে গোসল করাটাই সবচেয়ে মজার বিষয়। আজ সে ৬ ইউনিট পানির একটা পাসকোড পেয়েছে মা র কাছ থেকে। অন্যান্য দিন তার জন্য ৩ ইউনিটের বেশি বরাদ্দ থাকে না। আজ স্কুলে ইন্টার হাউজ ফুটবল কম্পিটিশন ছিলো। সেখানে সাফওয়ানদের হাউজ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সাফওয়ান ছিলো তাদের টিমের গোল কীপার। আজ সে একাই তিন তিনটা কনফার্ম গোল ঠেকিয়ে দিয়েছে। টিম জেতার পর সবাই মিলে মাঠের কাদার মধ্যে সাফওয়ানকে চেপে ধরেছিলো । সাফওয়ানের প্রায় দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু সবার আনন্দের কথা চিন্তা করে কিছুই বলেনি তখন। এখন সারা শরীর ব্যাথা করছে তার। কাদামাটি মেখে বাসায় আসায় আজকে সাফওয়ানের আম্মু তার গোসলের জন্য ডবল ইউনিট পানি বরাদ্দ করেছে । আনন্দে সাফওয়ানের চোখে পানি চলে এসেছে। অনেক দিন পর আজ সে মন ভরে গায়ে পানি ঢালবে।

বাথরুমের ওয়াটার স্প্রে গানটার দিকে তাকিয়ে সাফওয়ান ভাবতে থাকে, এই স্প্রে গানটার জায়গায় যদি একটা প্রাগৈতিহাসিক অনেক ছিদ্র ওয়ালা ঝর্ণা মত কিছু থাকতো তাহলে বৃষ্টিতে ভেজার মত আনন্দ হতো আজ। সাফওয়ানের আজ হঠাৎ বহু বছর পিছনের পৃথিবীতে চলে যেতে ইচ্ছে করলো, যে পৃথিবীতে একসময় মানুষ মন খারাপ হলেই বাথরুমে শাওয়ার নামের একটা যন্ত্র ছেড়ে ভিজতো আর কাঁদতো, ওয়াটার গান দিয়ে এক জন আরেক জনকে ভিজিয়ে দিয়ে মজার একধরণের খেলা করতো। সে সময় নাকি বাথটাব নামে একটা বস্তু ছিলো যাতে পানি ভরে গলা ডুবিয়ে শুয়ে থাকা যেতো। এখনো সাফওয়ানের বাবা গল্প করে, তাদের বাড়িতেও একসময় ছাদে ট্যাঙ্কি ভরা পানি থাকতো। সেই পানি ছেড়ে বিকেল বেলা সাফওয়ানের চাচু ফুফুরে বাগানে পানি দিতে দিতে একজন আরেক জনকে ভিজিয়ে দিতো।

সাফওয়ানের কাছে এসব কল্পনা মনে হয়। তার বাবাটা খুব ভাল গল্প বলতে পারে। এগুলোও বানিয়ে বলে নিশ্চই। তানাহলে পানির যে দাম তাতে এক ট্যাঙ্কি পানি কিনতে গেলে তো তাদের এই বাড়িটাই বেঁচে দিতে হতো। তাদের বাসায় একটাই গোসলখানা। এখন আর কারো বাসায় সরকারের অনুমতি ছাড়া একটার বেশি বাথরুম বানানো যায় না। একটা বাথ্রুম বানাতেই এখন বাড়িওয়ালাদের নাভিশ্বাস উঠে যায়। বাথরুমের বাইরে এখন এক্সেস কন্ট্রোল মেশিন থাকে যেখানে সবার ফিঙ্গার প্রিন্ট এন্ট্রি করা থাকে। বাথরুমে ঢোকার আগে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিলে মাসিক বরাদ্দ থেকে ইউনিট মেপে পানি খরচ করতে হয়। সাফওয়ানের বরাদ্দ মাসে ১০০ ইউনিট। তার মায়ের ১৫০ ইউনিট। মায়ের কাছে থেকে আজ তিন ইউনিট সে গিফট পেয়েছে। গিফটের ইউনিট দিয়ে আজ গোসলটা খুব জমিয়েই হলো সাফওয়ানের। আজ অনেকদিন পর সে গায়ের ঘাম সোক না করেই গোসল করলো। অন্য সময় ঘাম হলে সোক মেশিনে ঘাম রিসাইকেলের জন্য দিয়ে তারপর গোসল করতে হয়। এতে করে গোসলের পানি রিসাইকেলে গেলে তাতে ঘাম মেশানো থাকে না আবার সোক করা ঘাম রিসাইকেল করে কিছু পানি তৈরী হয়ে তাদের বরাদ্দকৃত ইউনিটের সাথে যোগ হয়।

বাথরুম থেকে বের হয়েই সাফওয়ান দেখলো তার বাবা অফিস থেকে এসে ড্রয়িং রুমে গা এলিয়ে বসে আছেন। সাফওয়ানকে দেখেই হেসে উঠলেন,

-কি ব্যাপার মাই চ্যাম্পিয়ন বয়? আজ গোসলে এত সময় লাগলো যে। পুরা মাসের ইউনিট একদিনে শেষ করে ফেলেছিস?

– না বাবা। মা তিন ইউনিট আমাকে গিফট করেছে।

সাফওয়ানের বাবা, সারজিল সাহেবের মনটা হঠাৎ করেই বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলো। সাফওয়ানের বয়সে তার জীবন ছিলো গোসলময়। তাকে বাথরুম থেকে বের করাটাই ছিলো সাফওয়ানের দাদীর দিনের প্রধানতম কাজ। আর এখন তার ছেলেকে ইউনিট মেপে পানি খরচ করতে হয়। মনঃ ভরে গোসল করতে চাইলে ইউনিট ধার নিতে হয়। অথচ এই অবস্থা হওয়ার কথা ছিলো না। তাদের ছিলো পানিতে ভরা দেশ। এ দেশের আকাশে পানি, মাটির উপরে পানি, নিচে পানি, বিশাল সাগর জুড়ে নীল জলরাশি, এমনকি প্রচুর আদ্রতাপূর্ণ বাতাসও পানির ভান্ডার। কিন্তু সব পানি আজ ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেছে। গত ত্রিশ চল্লিশ বছরে ভূগর্ভস্থ পানি প্রায় নিঃশেষ। যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা অপরিকল্পিত নলকূপ বসানোর কারণে আর্সেনিক, ক্যাডমিয়াম, লেড এর দূষণে পানের অযোগ্য। এখন তাদের পানির উৎস রিসাইকেল করা পানি যা একই সাথে দূর্মূল্য ও দূষ্প্রাপ্য।

একসময় এদেশে দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে অবলিলায় বিশ ত্রিশ লিটার পানি অপচয় করে ফেলা হতো, গোসল করা হতো বিশাল বিশাল চৌবাচ্চা সাইজের বালতিতে পানি ভরে। গোসলের সময় শাওয়ার ছেড়ে গান শোনার জন্য বাজারে পাওয়া যেতো ওয়াটারপ্রুফ ব্লু টুথ স্পিকার। শুধু টয়লেটের ফ্ল্যাশ করেই অনায়াসে একটা ছোট ফ্যামিলি দিনে দেড়শ থেকে দুইশ লিটার পানি সাবাড় করে ফেলতো। অথচ এই পানিগুলো অপচয় যাতে না হয় এজন্য বিংশ শতকের বিজ্ঞানীরা অনেক আগে থেকেই সতর্ক করেছিলেন মানুষকে। এই গোসল এবং বেসিন, ফ্ল্যাশের পানিকে তারা নাম দিয়েছিলেন গ্রে ওয়াটার। ধূসর পানি। বারবার করে বলেছিলেন, এই বিপুল পরিমান পানিকে একটু বুদ্ধি করে ব্যবহার করে বাচিয়ে দেয়া সম্ভব লক্ষ কোটি লিটার পানি। কিন্তু কে শোনে কার কথা। যতদিন মানুষের হাতে একটা মোটর ছিলো ততদিন ইচ্ছেমত পানি উঠিয়ে বাগানে পানি দেয়া, সেচ দেয়া, গরু গোসল করানো এমনকি রাস্তা ভেজানোর জন্যও ব্যবহার করেছে। এখন সেই কাজের মাসুল দিতে হচ্ছে সাফওয়ানদের। একসময় ইউরোপে টয়লেট শেষে পানি ব্যবহার না করে শুধু টিস্যু ব্যবহার করা হতো বলে সাফওয়ানের দাদা খুব হাসি ঠাট্টা করতেন ইউরোপিয়ানদের নিয়ে। আজ তিনি বেঁচে থাকলে লজ্জার মুখ লুকোতেন, তার বংশধরকেও টিস্যু নিয়ে দৌড়োদৌড়ি করতে দেখে।

চিন্তায় ছেদ পড়লো সাফওয়ানের কথায়,

– বাবা পরশু থেকে স্কুলে গরমের ছুটি পড়ছে। এবার ন্যাশনাল হলোগ্রাফিক ওয়াইল্ড লাইফ মিউজিয়ামে নিয়ে যেতে হবে বাবা।

– যাবো। আমাকেও তো অফিস থেকে ছুটি নিতে হবে। আমি যেতে না পারলে তোমাকে ছোট চাচুর সাথে পাঠিয়ে দেবো।

সারজিল সাহেব এই মিউজিয়ামটা দু চোখে দেখতে পারেন না। বাচ্চারা যে কি মজা পায় এখানে। একটা বড় সড় সিনেমা হলের মতো জায়গা। 10D ইমেজের মাধ্যমে নানা ধরণের পশুপাখির ক্যারেক্টার তৈরী করা আছে। এরা নানা রকম মজা করে বাচ্চাদের আনন্দ দেয়। এদেরকে এমনকি ছোঁয়ারও অনুভূতি পাওয়া যায় আবার এদের গায়ের গন্ধও পাওয়া যায়। ভয়ংকর মন খারাপ করা প্রযুক্তি। বাচ্চারা এই প্রাণিগুলোকে জীবিত অবস্থায় কখনো দেখেনি বলে তাদের কাছে এই কৃত্রিম ইমেজ গুলোই আসল বাঘ ভালুক কিন্তু সারজিল সাহেব ছোট বেলায় নিজের চোখে চিড়িয়াখানায় জীবিত বাঘ, গন্ডার দেখেছেন। শেষ জীবিত বাঘটাও আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ইনসিটু কনজারভেশন একসময় প্রানীদের অস্তিত্ব রক্ষায় শেষ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিলো। কিন্তু এই ট্রিটমেন্ট করা পানি, কৃত্রিম গাছ পালা, প্রসেসড ফুড শেষ পর্যন্ত তাদেরকে বাচিয়ে রাখতে পারেনি।

সাফওয়ান জামাকাপড় পরে মাথার চুল আঁচড়ে ফিটবাবু হয়ে নাস্তার টেবিলে আসলো।

– বাবা তুমি এখনো ফ্রেশ হওনি? চা খাবে না?

সারজিল সাহেব চমকে উঠলেন।

– হ্যাঁ বাবা। আমি আসছি। কই সাফওয়ানের মা, তোয়ালে টা দাও আর আমার জন্য একটু লেবুর শরবত দিও। যা গরম পরেছে আজ।

রান্নাঘর থেকে সাফওয়ানের মা হালকা গলায় বললেন,

– তোয়ালে দিচ্ছি কিন্তু লেবুর শরবত হবে না। খাবার পানি এখনো এসে পৌছায়নি। লেবু আছে আর ওয়াটার ক্যাপসুল আছে। দুটো একসাথে চিবিয়ে খেয়ে নাও। পেটের মধ্যে গিয়ে শরবত হয়ে যাবে।

সাফওয়ান হো হো করে হেসে দেয়।

Print Friendly, PDF & Email
error: Content is protected !!