আজ মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০, ০৭:২১ অপরাহ্ন
Smiley face

অদম্য মেয়ে:ঠেকালো নিজের বিয়ে

তখন রাত প্রায় ১০টা।সারিয়াকান্দিতে একদিনে ২২জন কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার দুঃসংবাদটা একটু আগেই পেয়েছি।আক্রান্তদের আইসোলেশনে রাখাসহ বিভিন্ন বিষয়ে ফোনে কথা বলছি সংশ্লিষ্টদের সাথে।এর মাঝেই একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন-“স্যার,কালীতলায় একটা অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে ওর বাবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে।”

ইউএনও’র বাসার খুব কাছেই কালীতলা।মেয়ের বাড়ির ঠিকানা নিয়ে তাৎক্ষণিক পৌঁছে গেলাম।উপজেলায় নিয়ে আসা হলো আয়োজনে উপস্থিতদের।

ছেলে তখনও কণের বাড়ির পথে।

০২.
ছেলের বাবা এবং মেয়ের বাবা পরস্পর আপন ভাই।দুই ভাই’ই হতদরিদ্র।একজন মাছ ধরে যমুনায় অপরজন ভ্যানচালক।মেয়ের বয়স পনের ছুঁইছুঁই,ছেলে একুশ-বিয়ের আইন নির্ধারিত যোগ্যতায় পৌঁছেনি কেউই।

০৩.
মেয়েটা বিয়ে করতে চায় না।ছেলে আগেও একটা বিয়ে করেছিল এবং বখাটে প্রকৃতির।আরো জানলাম,মেয়েটি অন্যের বাড়িতে কাজ করে এবং তিনবেলা গৃহকর্তার বাড়িতেই খায়।

“বয়স হয়নি তবে বিয়ের আয়োজন কেন করেছেন?”-প্রশ্ন করলে মেয়ের বাবা জানালেন,মেয়ে পড়ালেখা করেনা,বাচ্চাদের সাথে খেলে বেড়ায় এবং ঘরে সৎমা।

ছোট্ট মেয়ে,যে এখনো পাড়ার বাচ্চাদের সাথে খেলে বেড়ায়,অন্যের বাড়িতে কাজ করে
নিজের খাবার যোগায় সেই মেয়ের বিয়ের আয়োজন যে কোন পিতার দায়িত্ববোধ থেকে নয় বরং সন্তান জন্ম দেয়ার পিতৃত্বের দায় থেকে সেটি বুঝতে বাকী থাকেনা।

০৪.
ঘন্টা ধরে ধরে,একদিন একদিন করে বেঁচে থাকা এই মানুষগুলো এত দরিদ্র যে করোনার এই দুর্যোগে সামান্য জরিমানাও তাদের জন্য অপরিসীম কষ্টের।তাইতো বর পক্ষ এবং কণে পক্ষকে তাদের আর্থিক অবস্থা এবং বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নামমাত্র জরিমানার পাশাপাশি এই মর্মে অঙ্গীকারনামা নেয়া হলো-নির্ধারিত বয়স না হওয়া পর্যন্ত কোন পক্ষ বিয়ের আয়োজন করবে না।একইসাথে ত্রাণ হিসেবে চাল,ডাল,তেল,লবণ,পেঁয়াজ,সাবান,আলু দেয়া হলো দুই ভাইকে।যার বাজার মূল্য প্রদত্ত জরিমানার চেয়ে বেশি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ভান্ডার হতে প্রাপ্ত একটি সুন্দর থ্রি-পিস এবং থ্রি-পিসটি তৈরির জন্য নগদ টাকা দেয়া হল মেয়েটিকে আর সাথে দেয়া হল নিরাপদ আশ্রয়-যে কোন প্রয়োজনে যেন ইউএনও’কে ফোন করে জানায়।মেয়ের বাবাকে বলা হলো,ওকে স্কুলে পাঠাতে।

০৫.
আসুন বাল্যবিবাহমুক্ত সারিয়াকান্দি গড়তে আমরা ঐক্যবদ্ধ হই।নারীর জন্য এমন পরিবেশ নিশ্চিত করি যেখানে আপনার-আমার কণ্যা বলতে পারবে-“আমরাও নয়,আমরাই পারি।”

০৬.
“স্যার,আমার গাছের মৌচাক কেটে নিচ্ছে,একটু দেখেন” কিংবা “স্যার,রাস্তার মাঝে ধান শুকোতে দিয়েছে,একটু বন্ধ করেন”-এমন ফোনকলের পাশে “স্যার,একটা অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়েকে ওর বাবা ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে।”-এমন মানবিক এবং একটি জীবন ঘনিষ্ঠ ফোনকলের গুরুত্ব অনেক বেশি এবং এই কাজ আমাদের অপরিসীম তৃপ্তি দেয়।সত্য এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ন্যায়-নিষ্ঠ সুন্দর সমাজ গঠনে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে আপনার হাতে থাকা মুঠোফোনটি হয়ে উঠুক শাণিত হাতিয়ার।

০৭.
আজও লোক পাঠিয়ে খোঁজ নিয়েছি;ভালো আছে মেয়েটি।ধন্যবাদ মেয়েটির সাহায্যে ফোন করা মানবিক নারীটিকে।

Print Friendly, PDF & Email
error: Content is protected !!