ডুবুরী-খালিদ হাসান

প্রকাশিত: ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ৭, ২০২০

ছোট্ট একটা কোষা নৌকা ডুবে গেছে রতনপুরের পারানী ঘাটে। চারজন যাত্রী ছিলো। দুজন পুরুষ আর একজন মহিলা আর তার সাত আট বছরের মেয়ে। পুরুষ দুজন উঠতে পারলেও মহিলা আর তার মেয়ে নিখোঁজ। একেতো ভরা বর্ষা, তার উপর মোটামুটি নিম্নচাপ ধরনের জোর হাওয়া আর বৃষ্টি সকাল থেকে। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। এক মুহুর্তের জন্যও বৃষ্টি থামেনি। এর মধ্যে মহিলা আর তার মেয়ের খোঁজ প্রায় দুঃসাধ্য হয়ে পড়লো। ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল দিনের আলো মেলা পর্যন্ত নদীর আশে পাশের দু তিন কিলোমিটার তন্ন তন্ন করে খুজলো। সন্ধ্যে হয়ে এলে ডূবুরি দলের একজন আমার কাছে অনুমতি চাইলো সেদিনকার মত কাজ বিরতি দেয়ার। উপায় নেই। অনুমতি দেয়া হলো। ক্লান্ত বিদ্ধস্ত শরীরে অফিসে ফিরে আসলাম। দুর্ঘটনার রিপোর্ট পাঠাতে হবে। এসে দেখি কারেন্ট নেই। বিদ্যুতের এজিএম সাহেব জানালো, আলোকডাঙ্গায় পোল উপড়ে গেছে। ঘন্টা চারেক সময় লাগবে পোল ঠিক হতে। অতএব বাসায় চলে যাবার জন্য বের হতে হবে। বিদ্যুৎ এলে আবার অফিসে আসা লাগবে। রুম থেকে বের হয়ে দেখি একজন অল্প বয়স্ক লোক বেঞ্চের উপর বসে আছে। চোখ মুখ ফোলা। পিওন জানালো, নিখোজ মহিলার স্বামী। আমাকে দেখে হুড়মুড়িয়ে কাছে এসে হাউমাউ করে কেঁদে ফেললো।

– স্যার, আমার মেয়েটাকে আর একটু খোজেন স্যার। ও খুব ভালো সাঁতার পারে। আমার মনে হয় ও স্রোতে ভেসে দূরে চলে গেছে। আর একটু দূরে খুজলে পাওয়া যাবে।

আমি তাকে স্বান্তনা কি দেবো বুঝে পেলাম না। তবু তার কাঁধে হাত রেখে বললাম,

– আপনি একটু শান্ত হন। রাতের বেলা উদ্ধার অভিযান চালানোর কোন সুযোগ নেই। কারণ পানির নিচে রাতের বেলা কিছুই দেখা যায় না। আর যারা উদ্ধার অভিযান চালাবে তাদেরও জীবন সংশয় থাকে। আপনি কি চান আর কেউ তার পরিবারের কাউকে হারাক।

লোকটা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। সে বোধহয় আশা করেছিলো, আমি তার অনুরোধে আবার উদ্ধার কাজ শুরু করব। আমি তাকে আবার খুব নরম সুরে বললাম,

– আপনি বাড়ি যান। আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, আপনার কথাই যেন সত্যি হয়। আমি কাল আরো দু কিলোমিটার বেশি দূর পর্যন্ত খুঁজতে লোক লাগাবো। কিছু খেয়েছেন আপনি? চলেন আমার সাথে দুটো ভাত খাবেন।

– না স্যার । ভাত আমার গলা দিয়ে নামবে না। আপনি স্যার অন্তত একটা অনুরোধ যদি রাখেন আমি সারাজীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো।

– বলেন। রাখার মত হলে অবশ্যই রাখবো।

লোকটা একটু দম নিলো। তারপর যা বলল তা আমি আশা করি নি কোনভাবে।

– স্যার আমি নামতে চাই। আমি খোজারুর কাজ জানি। গ্রামে মহিলাদের সোনা রুপার গয়না পুকুরে হারিয়ে গেলে খুঁজে দেই । আমার স্যার এ বিষয়ে অনেক নাম ডাক আছে।

আমার অফিসের বড় বাবু তার কথার সাথে মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো। কিন্তু আমি তাকে এই রাতে কোনভাবেই পানিতে নামার অনুমতি দিতে পারি না । আর এই ঝড় বৃষ্টির রাতে তো কোনভাবেই না।

লোকটা আমার পা জড়িয়ে ধরতে গেলো। আমি চরমভাবে বিব্রত হলাম। একজন বাবার আর্তনাদ আমার বুকে শেল হয়ে বিঁধলো। আইন কানুন , নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে তাকে নিয়ে নদীর পাড়ে গেলাম। শর্ত হলো, তার মাজায় হার্নেস দিয়ে দড়ি বেধে নামতে হবে এবং দু ঘন্টার বেশি সে নদীতে থাকবে না। এই দু ঘন্টা আমি তার জন্য নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। রাত দশটার দিকে আসলাম পানিতে ডুব দিলো। লোকটার নাম আসলাম। প্রথমে একবার দুবার ডুব দিয়েই আবার ভেসে উঠতে লাগলো। আমি বিশ্বাস করে ফেললাম, এই লোক আধা ঘন্টার মধ্যেই উঠে আসবে। চার পাঁচবার এরকম করার পর সে এক ডুবে প্রায় পাঁচ মিনিট কাটিয়ে ফিরে এলো। আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। যদিও তার মাজায় বাধা দড়ি আমার লোকজন ধরে রেখেছে তবুও দুশ্চিন্তা তো হয়ই। পানির উপরের জগৎ আমার কাছে সুপরিচিত হলেও নিচের পৃথিবীর কিছুই আমার জানা নেই। আসলাম এক একবার ডুব দিচ্ছে আর পাঁচ মিনিট ছয় মিনিট করে থাকছে। আমার কেন যেন মনে হতে লাগলো লোকটা প্রতিবারই এক মিনিট করে বেশি থাকছে পানির নিচে। সে যে কোন কিছু খুজছে তার হাব ভাবে আমার তাও মনে হলো না। একবার তো মনে হয় প্রায় দশ মিনিট কাটিয়ে ফিরে এলো।

বসে থেকে কেমন যেন তন্দ্রা মতো এসে গিয়েছিলো। হঠাৎ হৈ চৈ শুনে তড়াক করে উঠে বসলাম। মনে হয় পেয়েছে তাহলে। আমার পিয়ন হাপাতে হাপাতে ছুটে এসে বলল,

– স্যার দড়ি কেটে গেছে। আসলাম পানির নিচে। উঠে নাই।

– উঠে নাই মানে কতক্ষণ উঠে নাই?

– স্যার অনেক্ষণ উঠে নাই। আট দশ মিনিট হবে স্যার।

আট দশ মিনিট না ওঠা টা আসলামের ক্ষেত্রে দুশ্চিন্তা না। কিন্তু সে দড়ি খুলে দিলো কেন? আমার বুকে হাপরের বাড়ি শুরু হয়ে গেছে। আরো পাঁচ সাত মিনিট কেটে গেলে আমার দুশ্চিন্তা ঝড়ে রূপ নিলো। সমস্ত দায় ভার আমার। লোকটা নিজে তো মরলোই , আমাকে নিয়ে মরলো। মাথা পুরো খালি হয়ে গেলো। কোন চিন্তা ভাবনাই আর কাজ করছে না। ঘাটের পাশে এই ওয়ার্ডের মেম্বারের বাড়ি। মেম্বার সাহেব আমার অবস্থা দেখে ভড়কে গেলো। সে আমাকে এক প্রকার জোর করেই তার বাড়িতে নিয়ে গেলো। লেবুর শরবত খাওয়ালো। আমি একটু শুতে চাইলাম। ক্লান্তি আর দুঃশ্চিন্তায় ঘুমিয়ে পড়লাম।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছি মনে নেই। হটাৎ মেম্বার সাহেবের চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙলো। আমি ঘুম ঘুমে চোখে তাকিয়ে দেখি, মেম্বার আমার মাথার কাছে এসে জোরে জোরে আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছে,

– স্যার পাওয়া গেছে। আসলামকে পাওয়া গেছে।

ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি পাঁচটা বাজতে দশ মিনিট বাকি। একটু একটু আলোও পূব আকাশে দেখা যাচ্ছে। আমি তড়াক করে উঠে বসে জিজ্ঞেস করলাম,

– কোথায় পাওয়া গেছে? বেঁচে আছে?

– বেঁচে আছে স্যার। নন্দীপুর ইউনিয়নের তিন নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার ফোন দিয়েছিলো স্যার। ওইখানে তাকে পাওয়া গেছে। এখন যাবেন স্যার?

– যাবো মানে? এক্ষুনি চলেন।

বেশি দূরে না। গ্রামের রাস্তা ধরে তিন কিলো মত এলাম কিন্তু মনে হলো অনন্তকাল ধরে আমার গাড়ি চলছে। নন্দীপুর এসে নদীর পাড়ে যেতে মটর সাইকেল ব্যবহার করা লাগলো। গাড়ি যায় না ওই পর্যন্ত। নদীর পাড়ে এসে দেখি এই ভোরেই কয়েকশো মানুষ জড়ো হয়েছে। কারো বাড়ির পুরনো শাড়ি দিয়ে দুটো লাশ পাশাপাশি ঢেকে রাখা আছে। মাথার কাছে বসে আছে আমার আসলাম। আমার ব্লাড প্রেশার নরমাল হতে শুরু করলো। যে মানুষটা তার মেয়েকে জীবিত পাওয়ার আশায়, অমাবস্যার রাতে নদীতে নেমে আমাকে লুকিয়ে হার্নেস খুলে এই তিন কিলোমিটার উজানে সাঁতরে এসে স্ত্রী আর মেয়ের লাশ খুঁজে পায় তাকে বুঝ দেয়ার মতো কোন শব্দ পৃথিবী্র কোন ভাষায়ই আজ পর্যন্ত তৈরী হয়নি।

আমাকে দেখে আসলাম বলল,

– স্যার আমি বলছিলাম না আমার মেয়েটা ভালো সাঁতার পারে। এই দেখেন ওর মা ওরে শাড়ি দিয়ে বেঁধে রাখছিলো। নিজেও ডুবলো আমার মেয়েটাকেও ডুবাইলো। আমার মেয়েটা ছাড়া থাকলে ও ঠিকই উঠে আসতে পারতো।

কথাগুলো বলেই আসলাম কাপড় উচু করে লাশ দুটো দেখালো। কথা সত্য। শাড়ির আঁচল মেয়েটার মাজায় বাধা। হয়তো মা ভেবেছিলো, ছোট্ট মেয়ে, স্রোতে ভেসে যাবে তাই নিজের সাথে বেঁধে নিয়েছিলো। কিন্তু স্রোতের সাথে হয়তো পেরে ওঠেনি। এই দৃশ্য আমার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব হলো না। আসলাম এর অনুরোধে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি নিয়ে বিনা ময়না তদন্তে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করলাম। ওসি সাহেব একটা ইউডি কেস ফাইল করলেন আমার কোর্টে। আসলামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, সে কোন মামলা করতে চায় কি না। আসলাম জানালো, এই পৃথিবীতে শুধু নিজের প্রতি ছাড়া তার আর কারো প্রতি কোন অভিযোগ নেই।

– স্যার আমার মেয়েটার কান ফুড়ায়ে দিছিলাম মরার তিন দিন আগে। আমার কাছে একটা সোনার রিং দুল চাইছিলো। আমি দিতাম স্যার। আমার কাছে টাকাও ছিলো এক জোড়া সোনার রিং দুল কিনে দেয়ার। আমি দুনিয়ার লোকের সোনার হয়না খুঁজে এনে দেই।আর নিজের মেয়েটার একটা জোড়া দুল পরানোর ভাগ্য আমার হয় নাই। এই দুনিয়ায় কারো প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই।

হাজারো কাজের ভীড়ে আসলাম মিয়া আর তার মেয়ের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। তিন বছর পর আজ হঠাৎ আসলাম মিয়ার সাথে দেখা। নাটোরের চলন বিলে একটা ট্রলার ডুবে গেছে ত্রিশ জন যাত্রী নিয়ে। উদ্ধার অভিযান চলছে। সন্ধ্যার দিকে সবাই যখন বিরতিতে যাবে তখন আমার একজন জুনিয়র কলিগ বললো, স্যার এখানকার লোকজন তো রাতেও বিলে লোক নামাতে চায়।

– সে কি? রাতে কিভাবে নামবে? কে নামবে?

– এখানে এরা এক জনকে নিয়ে আসছে। সে নাকি বিখ্যাত ডুবুরি। কিন্তু রাতেই নাকি সে পানিতে নামে। দিনে নামে না।

আমি চমকে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম,

– তার নাম কি আসলাম?

– জ্বী স্যার । আপনি চেনেন নাকি?

– চিনি। তাকে কি একটু ডাকা যায়?

– আমি ডাকছি স্যার।

আসলাম এলো। তিন বছরে অনেক বয়স বেড়ে গেছে মনে হলো। দাড়ি রেখেছে। ধবধবে সাদা দাড়ি। পানিতে নামার জন্য রেডি হয়ে এসেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম,

– আমাকে চিনতে পারছো আসলাম?

আসলাম আমাকে চিনতে পারলো না। কয়েকবার চেষ্টা করে মনে হলো ভুল করছি। যে মানুষটা সব কিছু ভুলে যেতে চায় তাকে মনে করাতে চাওয়াটা অন্যায়। মহা অন্যায়।

Smiley face