অবশেষে শেষ হচ্ছে দীর্ঘ আড়াই মাসের অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা আর স্বজন হারানোর বেদনায় কাটানো বিভীষিকাময় সময়। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর পাঁচ প্রবাসীসহ সাত বাংলাদেশির মরদেহ আগামীকাল শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশে ফিরছে। জীবিকার সন্ধানে বিদেশে গিয়ে আর কখনো জীবিত ফিরে আসতে না পারা মানুষগুলোর নিথর দেহ দেশে ফেরার খবরে পরিবারগুলোতে বইছে শোকের মাতম। অপেক্ষার অবসান ঘটলেও স্বজনদের হারানোর ক্ষত থেকে যাচ্ছে চিরদিনের জন্য।
বাংলাদেশ দূতাবাস, রিয়াদের ২৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের সরকারি চিঠিতে মরদেহ দেশে ফেরার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। চিঠি অনুযায়ী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৩৬ নম্বর ফ্লাইটে শনিবার ভোর ৫টা ৫ মিনিটে সাতজনের মরদেহ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর মরদেহগুলো দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দেশে ফিরতে যাওয়া সাতজনের মধ্যে পাঁচজন নওগাঁ জেলার এবং দুজন নাটোর জেলার বাসিন্দা।
নওগাঁর নিহত পাঁচ প্রবাসী হলেন—নওগাঁ পৌরসভার পার নওগাঁ এলাকার শাহিন, আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের মিনহাজ প্রামাণিক, মাধবপুর গ্রামের মাসিদুল সরদার সজিব এবং সাধনগর গ্রামের সাগর আলী।
অন্যদিকে নাটোর জেলার নলডাঙ্গা উপজেলার নিহত দুজন হলেন মোয়াজ্জেম শামীম ও সাব্বির হোসেন।
দূতাবাসের চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ৯ আগস্ট ২০২৬ তারিখে সৌদি আরবের রিয়াদে একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১৬ জন বাংলাদেশি কর্মীর মৃত্যু হয়। তাঁদের মধ্যে প্রথম দফায় ৯ জনের মরদেহ গত ২৭ আগস্ট দেশে পাঠানো হয়েছিল। বাকি সাতজনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করার পর তাঁদের মরদেহ দেশে পাঠানোর চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে নওগাঁ জেলার বাসিন্দা ছিলেন মোট ১২ জন। ফলে এ মর্মান্তিক ঘটনায় জেলার একাধিক পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। দীর্ঘদিন ধরে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা। আইনি জটিলতা ও পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার কারণে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হওয়ায় পরিবারগুলোর উৎকণ্ঠাও বাড়তে থাকে।
আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মনিরুজ্জামান জানিয়েছেন, আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের সমন্বয়ে মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, শুক্রবার বিকেলে নিহতদের পরিবারের সদস্যদের উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছে। মরদেহ পরিবহনের জন্য সরকারিভাবে প্রত্যেক পরিবারকে ৩৫ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। মরদেহগুলো উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কোনো কেন্দ্রীয় জানাজা ছাড়াই সরাসরি নিজ নিজ বাড়িতে নেওয়া হবে। পরে সেখানে জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হবে।
দীর্ঘ আড়াই মাস পর প্রিয়জনের মরদেহ ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য শনিবারের দিনটি হবে অত্যন্ত বেদনাবিধুর। যে মানুষগুলো পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে, স্বপ্ন পূরণ করতে হাজার মাইল দূরে পাড়ি জমিয়েছিলেন, তাঁদের ফিরতে হচ্ছে কফিনবন্দি হয়ে। স্বজনদের কাছে এ ফিরে আসা কোনো আনন্দের সংবাদ নয়, বরং এক অপূরণীয় শূন্যতার চূড়ান্ত বাস্তবতা।
জীবিকার সন্ধানে প্রবাসে গিয়ে এমন মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রবাসীদের প্রতিটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, আশা আর বেঁচে থাকার অবলম্বন।