• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৪৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
‎সুন্দরবনে অবমুক্ত বাঘিনীর রহস্যময় অন্তর্ধান: ৪০টি ক্যামেরায় মিলছে না অস্তিত্ব ‎ ‎ নাচোলে জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬ এর উদ্বোধন নাচোলে জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬ এর বাছাই পর্ব অনুষ্ঠিত নাচোল উপজেলা আ,লীগের সাধারন সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আটক ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ পেলেন ইউপি সদস্য নাচোলে মাদক, বাল্যবিয়ে ও ইভটিজিং বিষয়ক উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত মোবাইল অ্যাপসে মুরগির খামার নিয়ন্ত্রণ নাচোলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পকেট কমিটি গঠনের অভিযোগ প্রধান শিক্ষিকার বিরুদ্ধে নাচোলে নতুন কুড়ি স্পোর্টস-২০২৬ এর দেশ সেরা শামিমকে সংবর্ধনা নাচোলে ডাসকো’র উদ্যোগে ৩২তম আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালিত

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জ্যোতির চোখে ৭৫

Reporter Name / ৬০০ Time View
Update : রবিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২১

লেখক:মেসবাহুল শাকের জ্যোতি সাংগঠনিক সম্পাদক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা শাখা।

ফিরে দেখা ৭৫ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেষবারের মতো চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসেন ১৯৭৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। মার্চ মাসে ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আমাদের আব্বা ডাক্তার আ আ ম মেসবাহুল হক বাচ্চু ডাক্তার সদর আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী। নির্বাচনের প্রচার অভিযানের লক্ষ্য নিয়ে এসেছিলেন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে প্রথমবারের মতো চাপাইনবাবগঞ্জে আসছেন বঙ্গবন্ধু!চারিদিকে সাজসাজ রব,মানুষের মধ্যে প্রচন্ড আগ্রহ জাতির জনককে একনজর দেখার জন্য। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে মানুষ এসেছিল সেদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র ছাত্রীরা এসেছিল উনার বক্তব্য শোনার জন্য। পুরাতন জেলা স্টেডিয়ামের গ্যালারির পাশেই উঁচু মঞ্চ তৈরি হয়ছিল। শ্রোতারা ছিল কলেজ মাঠে,শহরের সুধীজনেরা ছিলেন স্টেডিয়ামের ভেতর। সবুজ সংঘের একটা চৌকস দল স্টেডিয়ামের ভেতর বঙ্গবন্ধুকে অভ্যর্থনা জানায়। আমার বড় ভাই মেসবাহুল মনির জয় এই দলের মধ্যে ছিলেন। আমার বড় বোন ফেরদৌসি ইসলাম জেসি স্কুলের অন্যান্য ছাত্রীদের সাথে মাঠের মধ্যে ছিল। আমি এসেছিলাম স্কুলের অন্যান্য ছাত্র শিক্ষকদের সাথে কলেজ মাঠে। নবাবগঞ্জ থানার এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে চিনতে পেরে একেবারে মঞ্চে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি ঠিক বঙ্গবন্ধুর পেছনটায় বসেছিলাম। একটা বিষয় লক্ষ্য করেছিলাম মঞ্চে যারা বসে ছিলেন তাদের মধ্যে উনি সবচেয় ফর্সা, লম্বা, এককথায় সুদর্শন সুপুরুষ। গায়ে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবির উপর কালো অতিপরিচিত মুজিব কোট। হেলিকপ্টারের দরজায় আব্বা উনাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে ছিলেন। মনে পড়ে সেদিন আব্বা সাদা পাঞ্জাবি পায়জামার উপরে অফ হোয়াইট খাদির কাপড়ের তৈরি মুজিব কোট পরেছিলেন, চোখে ছিলো কাজল কালো সানগ্লাস। সকলের সাথে পরিচয় পর্ব শেষে উনি মঞ্চে উঠেছিলেন ধীর পদক্ষেপে। পরে শুনেছিলাম উনার শরীরটা ভালো ছিলনা। গায় হালকা জ্বর ছিল, প্রায় সময় মাথা নিচু করে বসে ছিলেন। মনে হল তিনি পানি খেতে চাইলেন। কেউ একজন কাঁচের গ্লাসে পানি নিয়ে আসলেন, নিচে একটা পিরিচ আরেকটা পিরিচ দিয় ঢাকা ছিল পানির গ্লাসটা। বাসায় ফিরে আম্মাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এইভাবে পানি দেওয়ার মানেটা কি? আমরা যখন পানি চাই, আমাদেরকে এভাবে কেন পানি দেওয়া হয় না। আম্মা বলেছিলেন, কেউ যদি খুব সম্মানী ব্যক্তি হয় তবে তাকে এভাবে সম্মান দেখানো হয়। ব্যাপারটা সঠিক কিনা জানিনা তবে এমনটা উনি বলেছিলেন। আমাকে হয়তো বুঝ দেওয়ার জন্য। এই প্রথমবারের মতো উনাকে আমি দেখেছিলাম এবং দেখেছিলাম খুবই কাছ থেকে। পরবর্তীতে আরো কয়কবার উনাকে দেখেছি। পুরাতন জাতীয় সংসদ ভবনে, গণভবনে দেখেছি একবার। তখন এতটা বুঝতাম না রাজনীতি, বুঝতাম না বঙ্গবন্ধু কত বড় মাপের একজন বিশ্বনেতা, বুঝতাম না বঙ্গবন্ধু মানে বাঙালির মুক্তির স্বপ্ন, বাঙালির মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর গর্ব,বাংলাদেশ বাঙালি বঙ্গবন্ধু একই সূত্রে বাধা ও অবিচ্ছেদ্য।

যতদূর মনে পড়ে ১৫ ই আগস্ট ১৯৭৫ সাল আমরা তখন রাজশাহীতে নানা-নানির বাড়িতে। আব্বা ঢাকায় জেলা গভর্নর হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে একটা ট্রেনিং,প্রশিক্ষণ কোর্স ছিল,সেই উদ্দেশ্যেই ঢাকায় ছিলেন। আমার বড় ভাই জয় তখন ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুলের ছাত্র।ঘুম থেকে উঠে দেখি বাড়িতে অন্যদিনের চাইতে একটা ভিন্ন পরিবেশ। নানা রেডিওতে মনোযোগ দিয়ে কি শুনছিলেন। মনে হয় বলছিলেন, আর্মিরা ক্ষমতা দখল করেছে।বিভিন্ন রকম ইসলামিক গান বাজছিল রেডিওতে। মনে হয় আমাদের আম্মা পাশে বসে কাঁদছিলেন। থমথমে একটা পরিবেশ বাড়ির মধ্যে,কেউ খুব একটা কথা বলছিলেন না। উনারা আশঙ্কা করছিলেন বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে আব্বা কেমন আছে, নিরাপদে আছে তো? তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা খুব একটা ভালো না,ঘরে ঘরে টেলিফোন ছিল না। জানা যাচ্ছিল না সত্যি কি ঘটনা ঘটেছে ঢাকায়!

৩২ নম্বরে সারি সারি লাশ অমর্যাদায় পড়ে আছে। যে বাড়িটি ছিল আমাদের স্বাধীনতার সূতিকাগার আর সেই বাড়ি রক্তাক্ত কলঙ্কময় ইতিহাসের নির্মম স্বাক্ষী। এদেশের কিছু কুলাঙ্গার মানুষরূপী হায়না যারা তাদের হীন রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য ঘটিয়েছিল পৃথিবীর জঘন্যতম এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আস্তে আস্তে আম্মার পাশে গিয়ে বসলাম,মৃদুস্বরে অঝোরে কাঁদছেন। উনি বললেন এ দেশটাকে ওরা শেষ করে দিল। যে মানুষটি এদেশের জন্য এত ত্যাগ,শ্রম,মেধা দিল তার এই প্রতিদান। বয়স কম হলেও একটা বিষয় অনুভব করছিলাম আমাদের ভবিষ্যৎ কিছুটা অনিশ্চিত। যদিও আমরা নানা-নানির বাসায় এই মুহূর্তে নিরাপদ তারপরেও উনি উদ্বিগ্ন। বিভিন্ন মাধ্যমে আম্মা খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন আব্বার।পরে আস্তে আস্তে সব খবরই পাওয়া গেল। আত্মগোপনে থেকে আব্বার কাছ থেকে জেনেছিলাম মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের আগের দিন ১৪ ই আগস্ট আব্বার সাথে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন তার নতুন রাজনৈতিক, সামাজিক কর্মকান্ড এদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা দুরাবস্থা দূর করবে। আর সেজন্য সকলকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। বিশেষ করে তার রাজনৈতিক কর্মী সংগঠকদের। উনার স্বপ্ন এদেশের গরীব মেহনতী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।তারা দুবেলা পেট পুরে খাবে, শান্তিতে ঘুমোবে,এদেশে অর্থনীতি হবে শক্তিশালী। বিশ্বদরবারে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে,কত স্বপ্ন ছিল তার মনে!আর এই স্বপ্ন লালন করতে যেয়ে যৌবনের সবচাইতে মূল্যবান সময়গুলো পার করেছেন কারাগারের অন্ধকারে।পরিবার-পরিজনকে উনি সময় দেননি, পরিবারের আরাম-আয়েশের কথা একটিবারও ভাবেননি। সন্তানের জন্ম হয়েছে যখন তিনি জেলখানায়, প্রথম সন্তানের বিয়ে হয়েছে যখন তিনি জেলখানায়, সন্তানরা বড় হয়েছে অপরিচিত পরিবেশে।সবকিছুই তিনি মেনে নিয়েছিলেন বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য,বাংলার মানুষের স্বাধীনতার জন্য,এই ছিল উনার স্বপ্ন। ঘাতকের বুলেট এই স্বপ্ন বিদীর্ণ করে দিল ৫৫ হাজার বর্গমাইলের এই সবুজ মানচিত্র,রক্তাক্ত হয়ে গেল বাংলার মাটি। কি বিচিত্র এই দেশ !

সে সময় সারাদেশে এক বিভীষিকাময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল,বঙ্গবন্ধুভক্ত স্বাধীনতাকামী রাজনৈতিক কর্মীদের উপর ছিল নির্যাতনের খড়গ,বাকস্বাধীনতা ছিলনা, দেশকে আবার পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ করা হলো। পাকিস্তানি কায়দায় দেশ ঘুরতে থাকল ঘড়ির কাঁটা পেছনদিকে। আমাদের আব্বা প্রায় দুই বছরেরও বেশি সময় ঢাকায় আত্মগোপন করে থাকতে বাধ্য হলেন পরিবার-পরিজন ছাড়া। তখন আমার বড় ভাই জয় ঢাকায় লেখাপড়া করতো,বড় বোন জেসি রংপুরে আমার খালার বাসায় থাকতেন, আমার ছোট বোন জিনিয়া তখন দুরারোগ্য রিউমেটিক ফিভার অসুখে দীর্ঘ সময় চিকিৎসাধীন,লেখাপড়া প্রচন্ডভাবে বিঘিœত হলো ছোট ভাই জঙ্গির।সে বয়সেই আমি একা একা চাঁপাইনবাবগঞ্জে ছিলাম আমার দাদার তত্ত্ববধানে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে উনার অনেক সহকর্মী সহযোদ্ধাকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছিল,যারা আওয়ামী লীগ কর্মী ছিল তাদেরকে বিভিন্ন ভাবে হেনস্থা করা হয়েছিল। সে কালরাত্রে শুধুমাত্র জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়নি, হত্যা করা হয়েছিল, তার পরিবারের সকল সদস্য যারা দেশে ছিলেন। সৌভাগ্যক্রমে তার দুই কন্যা দেশের বাইরে থেকে প্রাণে বেঁচে গেছেন। কিন্তু সারা জীবন বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই স্বজন হারানোর দুঃখসহ বেদনা।

এত কিছুর পরেও মৃত্যুঞ্জয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুজিব সেনারা সংগঠিত হয়েছে,বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করেছে। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত এই বাংলার প্রতিটি প্রান্তরে আবার গর্জে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর বীর সেনানীরা। রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে আওয়ামী লীগ। দেশরত্ন শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে। বিশ্ব আজ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে নতুন এক বাংলাদেশের দিকে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন আজ বাস্তবায়নের পথে।

পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট আমরা যে অমূল্য সম্পদ হারিয়েছিলাম, সেই সুযোগ আমরা আর দিতে চাইনা। বাংলাদেশ-বাঙালি-বঙ্গবন্ধু যেমন একই সূত্রে বাধা অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ, ঠিক তেমনি উন্নয়ন-গণতন্ত্র-স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব শেখ হাসিনা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরাজিত শক্তি খুনি ঘাতকচক্র বসে নেই, তাদের ষড়যন্ত্র নোংরা রাজনীতি এখনো চলছে। তারা বারবার চেষ্টা করেছে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে। যেন বাংলাদেশ আবারো মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। আমাদের ন্যূনতম অনৈক্য, অহমিকা,সাংগঠনিক দুর্বলতা আমাদেরকে আবার চরম মূল্য দিতে হবে। ওরা যে বসে নাই তার প্রমাণ তারা দিয়ছে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায়। এই নির্মল সত্যটা স্বাধীনতাকামী দেশ প্রেমিক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক কে অনুধাবন করে সামনের দিকে অগ্রসর হতে হবে,পা ফেলতে হবে সতর্কতার সাথে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণই হোক জাতির জনকের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাঞ্জলি। জাতীয় শোক দিবসের প্রাক্কালে আজকের দিনে এই হোক আমাদের শপথ। ধন্যবাদ।
জয় বাংলা
জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
amazing-link-zeus.ca