• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:৩৪ পূর্বাহ্ন

সাপাহারে হু হু করে বাড়ছে শিশুশ্রম

Reporter Name / ২৫০ Time View
Update : সোমবার, ৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২২

মনিরুল ইসলাম, সাপাহার(নওগাঁ) প্রতিনিধি: কতইবা বয়স! ৯ থেকে শুরু করে ১৪ বছরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। যেসময় হাতে বই-কলম থাকার কথা ঠিক সেসময় কেউ চায়ের ফ্লাক্স হাতে নিয়ে চা বিক্রেতা। ইটের বোঝা মাথায় নিয়ে নির্মাণ কাজে সহায়তা করছে কেউ। আবার কেউবা গলায় বাদামের ডালি ঝুলিয়ে ঘুরছে বাজারের এখান থেকে সেখানে। এভাবেই নওগাঁর সাপাহারে ক্রমাগত হু হু করে বেড়ে চলেছে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম। উপজেলা সদরের গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও বিভিন্ন এলাকায় দেখা মিলছে শিশুশ্রমিকদের। রেস্টুরেন্ট, চায়ের দোকান, মোটর সাইকেল গ্যারেজ, স্টিল ও কাঠের ফার্নিচারের দোকান, ভাঙ্গারীর দোকান, কসমেটিকস্ দোকান, বাদামের দোকান, ডিমের দোকান, চপের দোকান, ইমারত নির্মাণ সহ ভ্রাম্যমান চা বিক্রেতা হিসেবে কাজ করছে শিশুশ্রমিকরা। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিশু-কিশোরের বয়স ৯ থেকে ১৪ বছরের মধ্যে।

উপজেলা সদরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, সকাল বেলা তীব্র শীতের মাঝে সামান্য একটা শীতবস্ত্র গায়ে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করছে ছোট ছোট বাচ্চাগুলো। মোটর সাইকেলের গ্যারেজে তীব্র শীতের মধ্যে ঠান্ডা পানি দিয়ে গাড়ী পরিস্কার করছে তারা। কেউ হোটেলের এঁটো প্লেট পরিস্কার করছে।খোলাবাজারে চায়ের দোকানগুলোতে চা বানানোর কারিগর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কমবয়সী বাচ্চাদের। কাস্টমারদের চা দিতে দেরী হলে যথারিতী বকুনিও খেতে হচ্ছে তাদের। এছাড়াও বিভিন্ন কাজের সাথে জড়িয়ে পড়ছে শিশু-কিশোররা।

ভ্রাম্যমান চা বিক্রেতা আরিফুল ইসলাম জানায়, “আমার বয়স ১২ বছর। আমার বাবা নেই। আমি ৪র্থ শ্রেণীতে পড়ি। আমার মা মানুষের বাসায় কাজ করে। স্কুল বন্ধ থাকার জন্য আমি বসে না থেকে চা বিক্রি করি। আমি সকালে ২ফ্লাক্স ও সন্ধার পরে ৩/৪ ফ্লাক্স চা ফেরি করে বিক্রি করি”। এতে তার আয় কত হয় তা জানতে চাইলে বলে “প্রতিদিন ৪/৫শ’ টাকার চা বিক্রি করি। এতে আমার মা ও আমি ভালোভাবে সংসার চালাতে পারি।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ব্যবসায়ী বলেন, ছোট বাচ্চারা যখন চায়ের ফ্লাক্স হাতে নিয়ে দোকানে আসে তখন অনিচ্ছা স্বত্বেও চা খাই। কারন এতে হয়তো তার পরিবার কিছুটা স্বাচ্ছন্দে থাকতে পারবে। আরিফুল ইসলামের মতো অনেক শিশুরাই সদরের বিভিন্ন দোকান ও কল-কারখানার কাজ করছে।

এলাকার একাধিক সচেতন ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে কথা হলে তারা জানান, বর্তমান সময়ে করোনার প্রকোপ বেড়ে গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে। অনেকের কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবার কারনে দারিদ্রতা অনেকটা বেড়ে গেছে। যার ফলশ্রুতিতে অনেক বাচ্চারা পেটের ক্ষুধা নিবারন, নিজের পকেট খরচ ও অনেকে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশার সাথে জড়িয়ে পড়ছে। যা জাতির জন্য হমকি স্বরূপ। ভবিষ্যতে অর্থের লোভে পড়ে অনেক শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন তারা।

বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বে শিশুশ্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এর পরেও এই উপজেলায় থেমে নেই শিশুশ্রম! একটি সূত্র জানায়, উপজেলা সদর সহ বিভিন্ন মোড়ে অবস্থিত দোকান গুলোতে প্রায় দেড় শতাধিক শিশু শ্রমিক কাজ করে। এর মধ্যে বেশিরভাগ কাজ করে হোটেল, চায়ের দোকান, ডিমের দোকান, চপের দোকান সহ নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে।

একজন হোটেল মালিকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমরা শিশুদের কাজে রাখতে চাইনা। তারপরেও তাদের অবিভাবকরা হাতে পায়ে ধরে রেখে যায়। আমরা তাদের কথা ফেলতে না পেরে এবং দারিদ্রতার দিকে খেয়াল রেখে তাদেরকে কাজে লাগাই। তারা ভালো বেতন পায়। এছাড়াও অনেক কাস্টমার তাদেরকে বখশিশ দেয়। যাতে করে তাদের ভালো আয় হয়। শিশুশ্রম বে-আইনী তারপরেও কেন তাদের কাজে রাখা হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ভারি কোন কাজ তাদেরকে দিয়ে করাইনা। হয়তো প্লেট পরিস্কার, টেবিল মোছা, পানির গ্লাস দেওয়া এসব কাজ করে। আমরা বে-আইনী কাজ করছিনা বরং একটা পরিবারকে ভালো রাখতে তাদের কাজ দিয়ে সহযোগীতা করছি।

বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুল্যাহ আল মামুন জানান, শিশুশ্রমের বিষয়ে অবিভাবকদের সচেতনতা জরুরী। আমরা বিষয়টি নিরসনে জনসচেতনতা মূলক কাজ করবো। এছাড়াও মাইকিং, পোষ্টারের মাধ্যমে জনগনকে শিশুশ্রমে নিরুৎসাহিত করার জন্য কাজ শুরু করবো।

এধরণের ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম থেকে রক্ষা পেতে হলে অবিভাবকদের সচেতন হতে হবে। এছাড়াও মহাজনদের শ্রমিক রাখার বিষয়ে বয়সের দিকে খেয়াল রেখে কাজ দিলে শিশুশ্রম কমতে পারে বলে ধারণা করছেন এলাকার অভিজ্ঞমহল।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
amazing-link-zeus.ca