ইসরায়েলের নির্বাচনের পর সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট। তাঁর দাবি, নির্বাচনে ভোটাররা নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের পরিবর্তে নতুন সরকার চেয়েছেন। একই সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তাকে ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক করেছেন তিনি। তবে বুথফেরত জরিপে কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় পরবর্তী সরকার গঠন নিয়ে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে তেল আবিবে নিজের দল ইয়াশারের কার্যালয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান আইজেনকোট। তিনি বলেন, দেশটির মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তাই সমাজের বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব করবে, এমন একটি সরকার গঠনে জোটসঙ্গীদের নিয়ে কাজ করবেন তিনি।
আইজেনকোটের মতে, আবার নির্বাচন আয়োজন করা হবে ভুল সিদ্ধান্ত। জনগণের রায় বাস্তবায়নে সম্ভাব্য সবকিছু করা তাঁর দায়িত্ব। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগেই তিনি দাবি করেন, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের বিরোধী জায়নবাদী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান আগের তুলনায় শক্তিশালী হয়েছে।
নেতানিয়াহুকে সরাসরি উদ্দেশ করে আইজেনকোট বলেন, নিজের রাজনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে ইসরায়েলের নিরাপত্তাকে ব্যবহার করা উচিত নয়। তাঁর এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নির্বাচনের পর দুই পক্ষের রাজনৈতিক বিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আহ্বান: বক্তব্যে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও সতর্ক করেন আইজেনকোট। তাঁর ভাষ্য, নেতানিয়াহু বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান। নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কোনো রাজনৈতিক নেতার ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করা নয়, বরং দেশের নাগরিকদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
রাজনৈতিক চাপের মুখেও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে অবিচল থাকার আহ্বান জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাসও দেন বিরোধী নেতা। একই সঙ্গে বিভাজন ও উসকানিনির্ভর রাজনীতির অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
আইজেনকোটের ঘোষিত পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে এমন একটি জায়নবাদী সরকার গঠন, যার অন্যতম লক্ষ্য হবে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক নিয়োগ নিশ্চিত করা। ইসরায়েলের রাজনীতিতে সামরিক নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের বিষয়। নতুন সরকার গঠিত হলে এ বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগ্রহ রয়েছে।
বুথফেরত জরিপে দুই পক্ষের কাছাকাছি অবস্থান: ইসরায়েলের টেলিভিশন চ্যানেল ১৩-এর হালনাগাদ বুথফেরত জরিপে নেতানিয়াহুর জোট এবং আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট—উভয় পক্ষের জন্য ৫১টি করে আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আরব দলগুলো পেতে পারে ১৮টি আসন। দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১টি আসন।
এর আগে চ্যানেল ১২-এর জরিপে বিরোধী জোটের জন্য ৫২টি আসন এবং নেতানিয়াহুর জোটের জন্য ৫০টি আসনের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। আরব দলগুলোর জন্য অনুমান করা হয়েছিল ১৮টি আসন। অর্থাৎ বিভিন্ন জরিপে আসনসংখ্যার কিছু পার্থক্য থাকলেও কোনো পূর্বাভাসেই প্রধান দুই জোটের কেউ এককভাবে সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি।
বুথফেরত জরিপে আরব দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে তারা কোন জোটকে সমর্থন করবে, কিংবা সরকার গঠনের আলোচনায় কী ভূমিকা রাখবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে নির্বাচনে প্রাপ্ত আসনের পাশাপাশি বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক অবস্থান ও জোট গঠনের সমীকরণও চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকার গঠনের দায়িত্ব কার হাতে: চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল এবং পার্লামেন্টের দলগুলোর সুপারিশ বিবেচনায় প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দিতে পারেন। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে নির্বাচনের ফল এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানের ওপর।
ইসরায়েলের সংসদীয় ব্যবস্থায় কোনো দল বা জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে সরকার গঠনের জন্য বিভিন্ন দলের সমর্থন প্রয়োজন হয়। এ কারণে নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আলোচনা দীর্ঘায়িত হতে পারে। কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সমর্থন জোগাড় করতে ব্যর্থ হলে দেশটিতে নতুন করে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
ভোটার উপস্থিতিতে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি: ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৯৯৯ সালের পর এটিই সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি। ২০২২ সালের নির্বাচনের তুলনায় এবার ভোটদানের হার বেড়েছে ৭ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) স্থানীয় সময় রাত ১০টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ভোট গণনা শুরু হয়। নির্বাচনে উচ্চ ভোটার উপস্থিতি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার গুরুত্ব তুলে ধরলেও এর মাধ্যমে কোন পক্ষ সরকার গঠন করবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
বুথফেরত জরিপে প্রকাশিত আসনসংখ্যা চূড়ান্ত ফল নয়। ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের কথা রয়েছে আগামী ৪ নভেম্বর। ফলে চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগে জোটগুলোর আসনসংখ্যা ও সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকছে।
এ অবস্থায় আইজেনকোটের সরকার গঠনের উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফল এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সমর্থনের ওপর। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু ও তাঁর জোটের অবস্থানও পরবর্তী সরকার গঠনের সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি,