বাংলাদেশে মোটরসাইকেল চালান, কিন্তু এখনো ড্রাইভিং লাইসেন্স করেননি? কিংবা নতুন করে মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালানোর লাইসেন্স করার কথা ভাবছেন? তাহলে জেনে রাখা জরুরি, বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স শুধু ট্রাফিক পুলিশের জরিমানা এড়ানোর কাগজ নয়; এটি আইন মেনে সড়কে চলাচল, নিজের চালানোর যোগ্যতার প্রমাণ এবং নির্দিষ্ট পেশায় কাজের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন, তাঁদের জন্য সঠিক ক্যাটাগরির লাইসেন্স থাকা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান ও সংশ্লিষ্ট সেবা পরিচালনা করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সংস্থাটির নিয়ম অনুযায়ী, মোটরসাইকেল চালানোর জন্য সংশ্লিষ্ট ক্যাটাগরির বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হয়। শুধু মোটরসাইকেলের রেজিস্ট্রেশন, নম্বরপ্লেট বা অন্য কাগজপত্র থাকলেই লাইসেন্সের প্রয়োজনীয়তা শেষ হয়ে যায় না। একইভাবে গাড়ি চালানোর লাইসেন্স থাকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি পাওয়া যায় না; লাইসেন্সে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের ক্যাটাগরি থাকতে হবে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি চালককে আইন মেনে মোটরযান চালানোর যোগ্যতা দেয়। সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৪ ও ৬৬ ধারা অনুযায়ী, প্রযোজ্য বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ছাড়া জনসাধারণের চলাচলের স্থানে মোটরযান চালানো অপরাধ। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। তাই লাইসেন্স না করে নিয়মিত মোটরসাইকেল চালালে আইনি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তবে লাইসেন্স থাকলেই সব ধরনের ট্রাফিক মামলা বা জরিমানা থেকে মুক্ত থাকা যায় না; ট্রাফিক আইন ও অন্যান্য কাগজপত্রের নিয়মও মানতে হবে।
লাইসেন্সের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো, এটি চালকের দক্ষতা যাচাইয়ের একটি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। বিআরটিএর নির্ধারিত পদ্ধতিতে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ শেষে লিখিত, মৌখিক এবং ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। এর মাধ্যমে সড়কের নিয়ম, ট্রাফিক সাইন, নিরাপদ চালনা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান যাচাই করা হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া এবং লাইসেন্স পাওয়া চালককে দায়িত্বশীলভাবে গাড়ি বা মোটরসাইকেল চালানোর প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করে। অবশ্য শুধু লাইসেন্স থাকলেই কেউ দুর্ঘটনা ঘটাবেন না, এমন নিশ্চয়তা নেই; নিরাপদ চালনার জন্য নিয়মিত সতর্কতা ও ট্রাফিক আইন মেনে চলা অপরিহার্য।
যাঁরা মোটরসাইকেল দিয়ে আয় করতে চান, তাঁদের জন্যও বৈধ লাইসেন্স গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মোটরসাইকেল চালক, ডেলিভারি রাইডার, কুরিয়ার কর্মী কিংবা মাঠপর্যায়ের কর্মী হিসেবে কাজের ক্ষেত্রে নিয়োগদাতা বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স চাইতে পারেন। তবে প্রতিটি চাকরিতে একই শর্ত প্রযোজ্য নয়। কাজের ধরন, প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা এবং সংশ্লিষ্ট যানবাহনের ক্যাটাগরি অনুযায়ী যোগ্যতা যাচাই করতে হয়। শুধু মোটরসাইকেলের লাইসেন্স থাকলেই সব ধরনের পেশাদার চালকের চাকরি করা যাবে, এমন ধারণাও ঠিক নয়।
মোটরসাইকেলের পাশাপাশি গাড়ি চালানোর পরিকল্পনা থাকলে লাইসেন্সের ক্যাটাগরি নির্বাচন করার সময় বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। বিআরটিএর নিয়ম অনুযায়ী, একজন আবেদনকারী নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে প্রয়োজনীয় ক্যাটাগরির লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে পারেন। একাধিক ক্যাটাগরির জন্য আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট নিয়ম, ফি ও পরীক্ষার শর্ত প্রযোজ্য হবে। তাই শুধু মোটরসাইকেল চালাতে চাইলে সেই ক্যাটাগরিতে আবেদন করুন; গাড়ি চালানোর অনুমতিও প্রয়োজন হলে উপযুক্ত ক্যাটাগরির নিয়ম জেনে আবেদন করুন।
নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে হলে প্রথমে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খুলে শিক্ষানবিশ বা লার্নার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। সরকারি পোর্টালটি হলো https://bsp.brta.gov.bd/। সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্র, নির্ধারিত চিকিৎসকের মেডিকেল সার্টিফিকেট, শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ঠিকানার সমর্থনে ইউটিলিটি বিল বা অন্য নথি প্রয়োজন হতে পারে। আবেদনকারীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা সাধারণত অষ্টম শ্রেণি পাস। অপেশাদার লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পেশাদার লাইসেন্সের জন্য ২১ বছর হতে হয়। আবেদন করার আগে নিজের ক্যাটাগরি অনুযায়ী বিআরটিএর পোর্টালে সর্বশেষ শর্ত ও প্রয়োজনীয় নথির তালিকা দেখে নেওয়া উচিত।
লার্নার লাইসেন্স পাওয়ার পর নির্ধারিত নিয়মে প্রস্তুতি ও প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এরপর বিআরটিএর নির্ধারিত তারিখে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার পর লাইসেন্স ইস্যুর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ফি, পরীক্ষার সময়সূচি ও লাইসেন্স সরবরাহের সময় পরিবর্তিত হতে পারে। তাই পুরোনো কোনো পোস্টে দেওয়া টাকার অঙ্কের ওপর নির্ভর না করে আবেদন করার সময় সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত ফি অনুসরণ করুন। প্রয়োজনে বিআরটিএর হেল্পলাইন ১৬১০৭-এ যোগাযোগ করে তথ্য যাচাই করা যেতে পারে।
লাইসেন্স করার সময় আরেকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। শিক্ষানবিশ লাইসেন্স ও চূড়ান্ত ড্রাইভিং লাইসেন্স এক নয়। শিক্ষানবিশ লাইসেন্স থাকলেও সেটির শর্ত ও মেয়াদ মেনে চলতে হবে। একইভাবে লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী নবায়ন করতে হবে। লাইসেন্সে যে ক্যাটাগরির অনুমতি দেওয়া আছে, তার বাইরে অন্য শ্রেণির যানবাহন চালানো যাবে না। পেশাদার চালকদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যোগ্যতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের শর্তও থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে, নতুন মোটরসাইকেল বা ড্রাইভিং লাইসেন্স করার সুবিধা শুধু জরিমানা এড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি আইন মেনে সড়কে চলাচল, চালকের দক্ষতা যাচাই, নির্দিষ্ট চাকরিতে যোগ্যতার শর্ত পূরণ এবং নিজের ও অন্যের নিরাপত্তার বিষয়ে সচেতন হতে সাহায্য করে। যাঁরা নিয়মিত মোটরসাইকেল চালান, তাঁদের উচিত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ঠিক রাখা এবং সঠিক ক্যাটাগরির বৈধ লাইসেন্স নেওয়া। আর যাঁরা নতুন করে লাইসেন্স করতে চান, তাঁরা দালালের ওপর নির্ভর না করে বিআরটিএর সরকারি পোর্টাল থেকে আবেদনপ্রক্রিয়া, ফি ও প্রয়োজনীয় শর্ত যাচাই করে এগিয়ে যেতে পারেন।