আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলার অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার পরিবারকে হত্যার হুমকি দেওয়ার ঘটনায় অবশেষে বড় ধরনের শাস্তির মুখে পড়েছেন অভিযুক্ত ব্যক্তি। ২০২৪ সালে ডি মারিয়ার মেয়ে পিয়াকে হত্যার হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনায় ৪৫ বছর বয়সী সার্জিও গ্যাব্রিয়েল ‘বেবে’ ডি ভানিকে সাত বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন আর্জেন্টিনার আদালত। ২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর রোজারিওর ফৌজদারি বিচারকেন্দ্রে এই রায়ের বিষয়টি সামনে আসে। বিচারক পাওলা আলভারেজ অভিযুক্তের আইনজীবী ও সরকারি কৌঁসুলি পাওলা বারোসের মধ্যে হওয়া সমঝোতামূলক বিচারপ্রক্রিয়ার চুক্তি অনুমোদন করেন। এই রায়ের মধ্য দিয়ে ডি মারিয়ার পরিবারকে ঘিরে তৈরি হওয়া ভয়াবহ পরিস্থিতির ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক অগ্রগতি হলো।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের মার্চ মাসে। তখন ডি মারিয়া পর্তুগিজ ক্লাব বেনফিকার হয়ে খেলছিলেন। তবে ইউরোপের ফুটবল ছেড়ে নিজের শৈশবের ক্লাব রোজারিও সেন্ট্রালে ফিরে আসার পরিকল্পনা করছিলেন আর্জেন্টিনার এই তারকা। নিজের শহরের ক্লাবে ক্যারিয়ারের শেষ সময় কাটানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। কিন্তু সেই পরিকল্পনাকে কেন্দ্র করেই শুরু হয় ভয়াবহ হুমকি ও আতঙ্কের ঘটনা। রোজারিও সেন্ট্রাল এবং নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ শহরটির দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফুটবল ক্লাব। দুই দলের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে। ডি মারিয়ার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তদন্তকারীদের ধারণা, প্রতিপক্ষ ক্লাবে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঠেকানোই ছিল হুমকিদাতাদের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ডি মারিয়ার পরিবারের ওপর প্রথম বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটে তাঁদের বসবাসের এলাকার কাছাকাছি। রোজারিও শহরের কাছে ফুনেস হিলস মিরাফ্লোরেস নামের একটি আবাসিক এলাকার সামনে গাড়ি নিয়ে এসে দুর্বৃত্তরা গুলিবর্ষণ করে। সেখানে একটি ভীতিকর বার্তাও রেখে যায় তারা। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ডি মারিয়ার বোনের মালিকানাধীন একটি আবাসন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে আরও ভয়ংকর দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে একটি বাক্সের মধ্যে শূকরের কাটা মাথা রেখে যাওয়া হয়, যার কপালে গুলির চিহ্ন ছিল। সঙ্গে ছিল হুমকিসংবলিত একটি চিরকুট। বার্তাটিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, ডি মারিয়া যদি রোজারিও সেন্ট্রালে ফিরে আসেন, তাহলে পরবর্তী লক্ষ্য হবে তাঁর মেয়ে পিয়া। এমন হুমকি শুধু একজন ফুটবলারের জন্য নয়, পুরো পরিবারের জন্যই ছিল চরম আতঙ্কের।
ঘটনাগুলো ডি মারিয়ার ফুটবলজীবনের অন্যতম কঠিন সময় তৈরি করে। নিজের শহরে ফিরে প্রিয় ক্লাবের হয়ে খেলার স্বপ্ন থাকলেও পরিবারের নিরাপত্তার বিষয়টি তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। হুমকির পর পরিস্থিতি বিবেচনায় তিনি প্রথমে আর্জেন্টিনায় ফেরার পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ান। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কারণে তিনি রোজারিও সেন্ট্রালে ফেরার সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছিলেন। ডি মারিয়া একাধিকবার নিজের পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া হুমকির ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তাঁর বোনের প্রতিষ্ঠানের সামনে শূকরের মাথা রেখে যাওয়ার ঘটনাটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। কারণ, সেখানে শুধু তাঁকে নয়, সরাসরি তাঁর ছোট মেয়েকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। একজন বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলারের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছিল।
তদন্তে সার্জিও ডি ভানির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সামনে আসে। তিনি নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের উগ্র সমর্থকগোষ্ঠীর একটি অংশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সমর্থকগোষ্ঠীর ভেতরে নেতৃত্ব ও প্রভাব বিস্তার নিয়ে বিরোধ চলছিল। ডি ভানির বিরুদ্ধে ডি মারিয়ার পরিবারের উদ্দেশে পাঠানো হুমকির বার্তা তৈরির অভিযোগ আনা হয়। তদন্তে আরও উঠে আসে, ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই রোজারিওর কুলিন এলাকার একটি বাড়িতে গুলিবর্ষণের ঘটনাতেও তাঁর সংশ্লিষ্টতা ছিল। ওই হামলায় একজন ব্যক্তি পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। পাশাপাশি নিউয়েলসের সমর্থকগোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধমূলক সংগঠনের সদস্য হওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে ছিল। ফলে আদালতের দেওয়া সাত বছর ছয় মাসের সাজা কেবল ডি মারিয়ার পরিবারকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা ঘিরে নয়; এর সঙ্গে অন্যান্য গুরুতর অপরাধের বিষয়ও যুক্ত রয়েছে।
এই মামলায় ডি ভানির পাশাপাশি আরও কয়েকজনের নাম তদন্তে উঠে আসে। ২৫ বছর বয়সী বেলেন গুতিয়েরেস নামের এক নারীকে একই ধরনের হুমকির ঘটনায় জড়িত হিসেবে শনাক্ত করে প্রসিকিউশন। ২০২৬ সালের জুনে সমঝোতামূলক বিচারপ্রক্রিয়ায় তিনি সাড়ে তিন বছরের কারাদণ্ড পান। অন্যদিকে মামলার আরেক সন্দেহভাজন ব্যক্তিও বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, হুমকির ঘটনা বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের চার মিলিয়ন আর্জেন্টাইন পেসো দেওয়ার প্রস্তাব ছিল। তদন্তকারীরা মনে করেন, এর পেছনে শুধু একজন ফুটবলারের প্রত্যাবর্তন ঠেকানোর বিষয় ছিল না, বরং সমর্থকগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ২৮ অক্টোবরের রায়ে ডি ভানির বিরুদ্ধে এসব অপরাধের বিচারিক পরিণতি নির্ধারিত হয়।
তবে এত ভয়াবহ পরিস্থিতির পরও শেষ পর্যন্ত নিজের শৈশবের ক্লাবে ফেরার স্বপ্ন পূরণ করেন অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। ২০২৫ সালে তিনি রোজারিও সেন্ট্রালে যোগ দেন এবং ক্লাবটির হয়ে মাঠে নামেন। যে প্রত্যাবর্তন একসময় পরিবারের নিরাপত্তার কারণে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত বাস্তবে রূপ নেয়। শুধু তাই নয়, ২০২৫ সালের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার লিগে শিরোপা জয়েও গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পায় রোজারিও সেন্ট্রাল। ফলে নিজের শহরে ফিরে খেলার স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি দলীয় সাফল্যও পান এই বিশ্বকাপজয়ী তারকা। অন্যদিকে তাঁর পরিবারকে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত ডি ভানির সাত বছর ছয় মাসের কারাদণ্ড আর্জেন্টিনার ফুটবলে সমর্থকগোষ্ঠীর সহিংসতা ও অপরাধী তৎপরতা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবল মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কখনোই খেলোয়াড় কিংবা তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে না।