২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হারের পর নিজেদের পারফরম্যান্স ও ম্যাচের বিভিন্ন দিক নিয়ে মুখ খুলেছেন দলটির মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজ। তাঁর মতে, ম্যাচটি যদি পেনাল্টি শুটআউট পর্যন্ত গড়াত, তাহলে শিরোপা জিতত আর্জেন্টিনা। এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন গোলরক্ষক এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেজকে। এনজোর বিশ্বাস, পেনাল্টি শুটআউটে দিবুর উপস্থিতি মানেই আর্জেন্টিনার জন্য বাড়তি আত্মবিশ্বাস। কারণ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পেনাল্টি ঠেকানোর অসাধারণ দক্ষতা রয়েছে এই আর্জেন্টাইন গোলরক্ষকের। সম্প্রতি ‘লস এদুল’ নামের একটি অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিশ্বকাপ ফাইনাল নিয়ে নিজের এমন বিশ্বাসের কথা জানান তিনি।
বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে নির্ধারিত সময়ের খেলায় সমতা ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়েও দুই দলের মধ্যে লড়াই চলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত স্পেনের হয়ে ফেররান তোরেসের করা গোলে শিরোপা নিশ্চিত হয় স্প্যানিশদের। ফলে স্বপ্নের বিশ্বকাপ ট্রফি থেকে বঞ্চিত হয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচটির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এনজো ফার্নান্দেজ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। তাঁর বিদায়ের পর বাকি সময় একজন কম নিয়ে খেলতে হয় আর্জেন্টিনাকে। এমন পরিস্থিতিতে দলটির জন্য ম্যাচে ফিরে আসা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ১-০ গোলের পরাজয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় লিওনেল মেসির দলকে।
সাক্ষাৎকারে পেনাল্টি শুটআউট নিয়ে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এনজো। তিনি বলেন, পেনাল্টিতে গেলে আর্জেন্টিনাই বিশ্বকাপ জিতত। কারণ তাদের দলে ছিলেন দিবু মার্তিনেজ। তাঁর ভাষায়, ‘পেনাল্টিতে গেলে আমরা জিততাম। অবশ্যই জিততাম। আমাদের সঙ্গে দিবু ছিল। আমরা সবাই জানি, পেনাল্টি শুটআউটে সে কখনো ব্যর্থ হয় না।’ এনজোর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সতীর্থ গোলরক্ষকের সামর্থ্যের ওপর তাঁর কতটা বিশ্বাস রয়েছে। বিশেষ করে বড় ম্যাচে চাপের মুহূর্ত সামলানো এবং প্রতিপক্ষের শট ঠেকানোর ক্ষেত্রে দিবুর অতীত পারফরম্যান্সই তাঁকে এমন আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে। তবে এটি এনজোর ব্যক্তিগত বিশ্বাস, ম্যাচের সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো বাস্তবতা নয়।
দিবু মার্তিনেজের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আরও একটি চমকপ্রদ তথ্য সামনে এনেছেন এনজো। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপের গুরুত্বপূর্ণ পর্বে মার্তিনেজ আঙুলের গুরুতর চোট নিয়েই খেলেছেন। এমনকি তাঁর একটি আঙুলে অনুভূতি ছিল না এবং সেটি ঠিকভাবে নড়াচড়াও করতে পারছিলেন না। বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে এনজো বলেন, দিবুর এমন অবস্থায় খেলা ছিল অবিশ্বাস্য। তাঁর ভাষায়, ‘এটা ছিল অবিশ্বাস্য। তার আঙুলে কোনো অনুভূতি ছিল না। বিষয়টি ছিল পাগলামির মতো। কিন্তু এটাই দিবু, সে অসাধারণ।’ সতীর্থের এমন লড়াকু মানসিকতা এবং দলের প্রতি নিবেদনকে বিশেষভাবে প্রশংসা করেছেন এই আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার।
অন্যদিকে, স্পেনের বিপক্ষে পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্বও স্বীকার করেছেন এনজো। তাঁর মতে, ফাইনালে স্পেন বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে রেখেছিল এবং আর্জেন্টিনার তুলনায় ভালো ফুটবল খেলেছে। তাই স্পেনকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার যোগ্য দল হিসেবেই দেখছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাইনাল নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা ও ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব ছড়িয়ে পড়লেও সেগুলোকে ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন এই মিডফিল্ডার। তাঁর বক্তব্য, ম্যাচে অস্বাভাবিক কিছু ঘটেনি এবং স্পেন নিজেদের যোগ্যতায় জিতেছে। প্রতিপক্ষকে অভিনন্দন জানানো উচিত বলেও মনে করেন তিনি। অর্থাৎ পেনাল্টি নিয়ে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করলেও মাঠের পারফরম্যান্সে স্পেনের শ্রেষ্ঠত্ব অস্বীকার করেননি এনজো।
বিশ্বকাপের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের শারীরিক অবস্থাও ভালো ছিল না বলে জানিয়েছেন এনজো। তাঁর মতে, টুর্নামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দলের কয়েকজন ফুটবলার চোট ও শারীরিক ক্লান্তির সমস্যায় ভুগছিলেন। বিশেষ করে এর আগে একাধিক ম্যাচে অতিরিক্ত সময় খেলতে হওয়ায় দলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছিল। কেপ ভার্দে ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে অতিরিক্ত সময়ের লড়াই খেলোয়াড়দের ক্লান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়। এনজোর ভাষ্য অনুযায়ী, দলের প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড় কোনো না কোনো শারীরিক সমস্যায় ছিলেন। ফলে ফাইনালে নিজেদের সেরাটা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ফাইনালে পৌঁছানোকে দলের বড় অর্জন হিসেবে দেখছেন তিনি।
এদিকে নিজের লাল কার্ডের ঘটনাটিও ভুলে যাননি এনজো ফার্নান্দেজ। বিশ্বকাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসরের ফাইনালে দলকে বিপদে ফেলে মাঠ ছাড়তে হওয়ায় নিজের কাছে বিষয়টি কষ্টের বলে জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, কোনো ফুটবলারই ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে লাল কার্ড দেখতে চায় না। সময়ের সঙ্গে ঘটনাটি মেনে নিতে শিখলেও এটি এখনো তাঁর মনে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে পরাজয় নিয়ে হতাশা থাকলেও দলের প্রচেষ্টাকে মূল্যায়ন করছেন এনজো। শিরোপা জিততে না পারলেও আর্জেন্টিনাকে আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে নিয়ে যাওয়ার জন্য সতীর্থদের পরিশ্রমের প্রশংসা করেছেন তিনি। আর পেনাল্টি শুটআউট হলে দিবু মার্তিনেজের ওপর ভরসা করেই বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন এই আর্জেন্টাইন তারকা।