বাংলাদেশে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা পেশাগত প্রয়োজনে বাস-ট্রাক চালাতে বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু নতুন করে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গেলে কত টাকা খরচ হয়, লার্নার লাইসেন্সের ফি কত, স্মার্ট কার্ড পেতে কত টাকা দিতে হয় কিংবা পেশাদার ও অপেশাদার লাইসেন্সের খরচের মধ্যে পার্থক্য কত—এসব বিষয়ে অনেকেরই পরিষ্কার ধারণা নেই।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে শিক্ষানবিশ বা লার্নার লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। এরপর নির্ধারিত সময়ে লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের মোট খরচ নির্ভর করে আপনি কোন ধরনের যানবাহনের জন্য আবেদন করছেন, এক ক্যাটাগরি নাকি দুই ক্যাটাগরি যুক্ত করছেন এবং পেশাদার নাকি অপেশাদার লাইসেন্স নিচ্ছেন তার ওপর। এ ছাড়া মেডিকেল সার্টিফিকেট, ডোপ টেস্ট, অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে ও ডাকযোগে কার্ড বিতরণের মতো বিষয়েও অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
এই প্রতিবেদনে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে, লার্নার লাইসেন্সের ফি, স্মার্ট কার্ডের খরচ, পেশাদার ও অপেশাদার লাইসেন্সের পার্থক্য, নবায়ন ফি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং অনলাইনে আবেদন করার নিয়ম বিস্তারিত তুলে ধরা হলো।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?
বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে খরচকে মূলত দুটি ধাপে ভাগ করা যায়। প্রথম ধাপে শিক্ষানবিশ বা লার্নার লাইসেন্সের আবেদন ফি দিতে হয়। দ্বিতীয় ধাপে দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মূল ড্রাইভিং লাইসেন্স বা স্মার্ট কার্ডের জন্য ফি জমা দিতে হয়।
বিআরটিএর প্রকাশিত আবেদনসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী প্রচলিত ফি নিচে দেওয়া হলো।
খরচের ধরন
ফি
শিক্ষানবিশ লাইসেন্স, এক ক্যাটাগরি
৫১৮ টাকা
শিক্ষানবিশ লাইসেন্স, দুই ক্যাটাগরি
৭৪৮ টাকা
অপেশাদার স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স
৪,৪৯৭ টাকা
পেশাদার স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স
২,৭৭২ টাকা
ডাকযোগে লাইসেন্স বিতরণ
৬০ টাকা
এই হিসাব অনুযায়ী, এক ক্যাটাগরির অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে শিক্ষানবিশ ফি, স্মার্ট কার্ড ফি ও ডাক খরচ মিলিয়ে আনুমানিক ৫,০৭৫ টাকা লাগতে পারে। দুই ক্যাটাগরির অপেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে একই হিসাব অনুযায়ী খরচ দাঁড়ায় প্রায় ৫,৩০৫ টাকা।
অন্যদিকে এক ক্যাটাগরির পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে শিক্ষানবিশ ফি, স্মার্ট কার্ড ফি ও ডাক খরচ মিলিয়ে আনুমানিক ৩,৩৫০ টাকা হতে পারে। দুই ক্যাটাগরির আবেদন হলে এই খরচ আরও বাড়বে।
তবে এগুলো কেবল উল্লেখিত সরকারি ফিগুলোর যোগফল। মেডিকেল সার্টিফিকেট, পেশাদার লাইসেন্সের ডোপ টেস্ট এবং পেমেন্ট গেটওয়ে চার্জ যুক্ত হলে প্রকৃত খরচ ভিন্ন হতে পারে। আবেদন করার সময় বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে প্রদর্শিত সর্বশেষ ফি অনুসরণ করতে হবে।
লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?
ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার প্রথম ধাপ হলো লার্নার বা শিক্ষানবিশ ড্রাইভিং লাইসেন্স। এটি মূল লাইসেন্স নয়; বরং নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে গাড়ি চালানো শেখা ও দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য দেওয়া হয়।
বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক ক্যাটাগরির শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের ফি ৫১৮ টাকা এবং দুই ক্যাটাগরির জন্য ৭৪৮ টাকা।
এক ক্যাটাগরির আবেদন বলতে সাধারণত শুধু মোটরসাইকেল অথবা শুধু হালকা মোটরযানের জন্য আবেদন বোঝায়। দুই ক্যাটাগরির ক্ষেত্রে মোটরসাইকেল ও হালকা মোটরযান—দুই ধরনের যানবাহন অন্তর্ভুক্ত করা যায়।
যেমন, কেউ শুধু মোটরসাইকেল চালানোর লাইসেন্স নিতে চাইলে এক ক্যাটাগরিতে আবেদন করতে পারেন। আবার মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি—দুই ধরনের যানবাহনের লাইসেন্স নিতে চাইলে দুই ক্যাটাগরির আবেদন করতে পারেন।
আবেদনের সময় নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ক্যাটাগরি নির্বাচন করা জরুরি। কারণ পরে নতুন কোনো শ্রেণি যুক্ত করতে চাইলে আলাদা আবেদন ও ফি দিতে হতে পারে।
অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?
যাঁরা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেট কার বা হালকা মোটরযান চালাবেন, তাঁদের জন্য অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রযোজ্য।
বিআরটিএর প্রকাশিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর অপেশাদার স্মার্ট কার্ড লাইসেন্সের জন্য ৪,৪৯৭ টাকা ফি দিতে হয়। এই লাইসেন্সের মেয়াদ ১০ বছর বলে বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্যতে উল্লেখ রয়েছে। ডাকযোগে কার্ড বিতরণের জন্য অতিরিক্ত ৬০ টাকা লাগতে পারে।
এক ক্যাটাগরির লার্নার ফি ৫১৮ টাকা ধরে হিসাব করলে অপেশাদার লাইসেন্সের প্রাথমিক সরকারি খরচ দাঁড়ায়:
লার্নার লাইসেন্স ফি: ৫১৮ টাকা
স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স ফি: ৪,৪৯৭ টাকা
ডাক খরচ: ৬০ টাকা
মোট: ৫,০৭৫ টাকা
দুই ক্যাটাগরির লার্নার আবেদন করলে মোট খরচ হবে আনুমানিক ৫,৩০৫ টাকা।
এখানে মেডিকেল সার্টিফিকেট ও অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের সম্ভাব্য চার্জ যোগ করা হয়নি। তাই আবেদনকারীর প্রকৃত ব্যয় কিছুটা বেশি হতে পারে।
পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?
যাঁরা বাণিজ্যিক বা পেশাগত কাজে গাড়ি চালাতে চান, তাঁদের জন্য পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রয়োজন। যেমন বাস, ট্রাক, পণ্যবাহী যানবাহন বা পেশাগতভাবে ব্যবহৃত অন্যান্য যানবাহন চালানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির পেশাদার লাইসেন্স নিতে হয়।
আরো পড়ুন-নতুন মোটরসাইকেল ও ড্রাইভিং লাইসেন্স করলে কী কী সুবিধা?
বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পেশাদার স্মার্ট কার্ড লাইসেন্সের ফি ২,৭৭২ টাকা। এই লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর। ডাকযোগে কার্ড বিতরণ করা হলে অতিরিক্ত ৬০ টাকা লাগতে পারে।
এক ক্যাটাগরির লার্নার ফি ৫১৮ টাকা ধরে হিসাব করলে পেশাদার লাইসেন্সের প্রাথমিক সরকারি খরচ দাঁড়ায়:
লার্নার লাইসেন্স ফি: ৫১৮ টাকা
পেশাদার স্মার্ট কার্ড ফি: ২,৭৭২ টাকা
ডাক খরচ: ৬০ টাকা
মোট: ৩,৩৫০ টাকা
তবে পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্টসহ অতিরিক্ত শর্ত প্রযোজ্য হতে পারে। আবেদনকারীর বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, যানবাহনের শ্রেণি এবং অন্যান্য যোগ্যতাও যাচাই করতে হবে।
মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?
মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য লাইসেন্স নিতে চাইলে আবেদনকারী এক ক্যাটাগরি অথবা দুই ক্যাটাগরির আবেদন করতে পারেন।
শুধু মোটরসাইকেলের জন্য আবেদন করলে এক ক্যাটাগরির লার্নার লাইসেন্সের ফি প্রযোজ্য হবে। একইভাবে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য আবেদন করলেও এক ক্যাটাগরির ফি প্রযোজ্য।
কিন্তু কেউ যদি মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ি—দুই ধরনের যানবাহন চালানোর অনুমতি চান, তাহলে দুই ক্যাটাগরির জন্য আবেদন করতে হবে। সে ক্ষেত্রে লার্নার ফি ৭৪৮ টাকা।
অর্থাৎ এক ক্যাটাগরির তুলনায় দুই ক্যাটাগরির লার্নার ফি ২৩০ টাকা বেশি। মূল স্মার্ট কার্ডের ফি ও অন্যান্য শর্তও আবেদনকারীর নির্বাচিত শ্রেণি অনুযায়ী পোর্টালে প্রদর্শিত হতে পারে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কী কী কাগজপত্র লাগে?
ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা ভালো। কাগজপত্র অসম্পূর্ণ থাকলে আবেদন যাচাই বা পরবর্তী ধাপে সমস্যা হতে পারে।
সাধারণত শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের আবেদনে যেসব তথ্য ও কাগজপত্র প্রয়োজন হয়, সেগুলো হলো:
জাতীয় পরিচয়পত্রের স্ক্যান কপি।
নির্ধারিত চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট।
শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ।
আবেদনকারীর সাম্প্রতিক ছবি।
বর্তমান ঠিকানা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ইউটিলিটি বিলের কপি।
আবেদনকারীর এনআইডির সঙ্গে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর।
ঠিকানা ও পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে বিআরটিএর নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এনআইডির স্থায়ী ঠিকানা ও বর্তমান ঠিকানা আলাদা হলে বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে ইউটিলিটি বিল চাওয়া হতে পারে।
পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কাগজপত্র, ডোপ টেস্ট সনদ বা অন্যান্য যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে। কোন পর্যায়ে কোন নথি জমা দিতে হবে, তা আবেদনকারীর লাইসেন্সের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করার বয়স কত?
ড্রাইভিং লাইসেন্সের ক্ষেত্রে বয়স একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। অপেশাদার ও পেশাদার লাইসেন্সের জন্য বয়সের শর্ত এক নয়। তাই আবেদন করার আগে নিজের নির্বাচিত লাইসেন্সের শ্রেণি অনুযায়ী বিআরটিএর সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।
সাধারণভাবে অপেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ২১ বছর ধরা হয়। তবে শুধু বয়স পূর্ণ হলেই লাইসেন্স পাওয়া যায় না; শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক সক্ষমতা, যানবাহনের শ্রেণি এবং দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার শর্তও পূরণ করতে হয়।
অনলাইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার নিয়ম
বর্তমানে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে ড্রাইভিং লাইসেন্সের শিক্ষানবিশ পর্যায়ের আবেদন করা যায়। আবেদন করতে প্রথমে একটি অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র দিয়ে আবেদন জমা দিতে হবে।
প্রথম ধাপ: বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে প্রবেশ
প্রথমে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টাল ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন। এরপর নিজের এনআইডির বিপরীতে নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট তৈরি বা লগইন করুন।
দ্বিতীয় ধাপ: প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ
অ্যাকাউন্টে প্রবেশের পর ড্রাইভিং লাইসেন্স বা শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের আবেদন নির্বাচন করুন। আবেদনকারীর ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা, লাইসেন্সের ধরন এবং যানবাহনের ক্যাটাগরি নির্ধারণ করুন।
তৃতীয় ধাপ: কাগজপত্র আপলোড
নির্ধারিত জায়গায় জাতীয় পরিচয়পত্র, মেডিকেল সার্টিফিকেট, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য নথির স্ক্যান কপি আপলোড করুন। ছবি ও নথির ফাইল নির্ধারিত আকার ও ফরম্যাটে দিতে হবে।
চতুর্থ ধাপ: আবেদন ফি পরিশোধ
আবেদন যাচাই করে নির্ধারিত লার্নার ফি অনলাইনে পরিশোধ করুন। পেমেন্ট সম্পন্ন হলে রসিদ বা লেনদেনের তথ্য সংরক্ষণ করুন।
পঞ্চম ধাপ: লার্নার লাইসেন্স সংগ্রহ
আবেদন অনুমোদিত হলে পোর্টাল থেকে শিক্ষানবিশ লাইসেন্স বা সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবে। এরপর নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নিয়ম মেনে গাড়ি চালানো শেখার প্রস্তুতি নিতে হবে।
ষষ্ঠ ধাপ: দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা
বিআরটিএ নির্ধারিত তারিখে লিখিত, মৌখিক ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর মূল ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা যাবে।
সপ্তম ধাপ: স্মার্ট কার্ডের ফি জমা
দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নিজের BSP অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে নির্ধারিত স্মার্ট কার্ড ফি পরিশোধ করতে হবে। প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ ও অন্যান্য প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে লাইসেন্স প্রস্তুত হওয়ার বিষয়ে এসএমএসের মাধ্যমে জানানো হতে পারে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষায় কী কী থাকে?
ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার জন্য শুধু আবেদন করলেই হয় না। আবেদনকারী গাড়ি চালানোর নিয়ম জানেন কি না এবং বাস্তবে নিরাপদভাবে গাড়ি চালাতে পারেন কি না, তা যাচাই করা হয়।
সাধারণত দক্ষতা যাচাই প্রক্রিয়ায় তিন ধরনের পরীক্ষা থাকতে পারে।
লিখিত পরীক্ষা: সড়ক পরিবহন আইন, ট্রাফিক সাইন, রাস্তার নিয়ম, নিরাপদে গাড়ি চালানো এবং যানবাহন পরিচালনার মৌলিক বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়।
মৌখিক পরীক্ষা: ট্রাফিক চিহ্ন, গাড়ির বিভিন্ন অংশ, সড়কে চলাচলের নিয়ম ও নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশ্ন করা হতে পারে।
ব্যবহারিক পরীক্ষা: নির্ধারিত স্থানে যানবাহন চালিয়ে আবেদনকারীর নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা ও নিরাপদে গাড়ি চালানোর সক্ষমতা যাচাই করা হয়।
পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হলে পরবর্তী প্রক্রিয়ায় যেতে সমস্যা হতে পারে। তাই শুধু লাইসেন্স পাওয়ার জন্য নয়, বাস্তবে নিরাপদ চালক হওয়ার জন্যও যথাযথ প্রশিক্ষণ নেওয়া জরুরি।
ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়ন করতে কত টাকা লাগে?
ড্রাইভিং লাইসেন্সের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হলে সেটি নবায়ন করতে হয়। অপেশাদার ও পেশাদার লাইসেন্সের নবায়ন ফি আলাদা এবং মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কত দিন পার হয়েছে, তার ওপরও অতিরিক্ত অর্থ দিতে হতে পারে।
বিআরটিএর বিভিন্ন প্রকাশিত সেবা-তথ্যে নবায়ন ফি ও বিলম্ব ফি সম্পর্কে ভিন্ন অঙ্ক দেখা যায়। কোথাও পুরোনো ফি, কোথাও হালনাগাদ স্থানীয় সেবা-তথ্য প্রকাশিত রয়েছে। ফলে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ককে সব সার্কেলের জন্য বর্তমান ও চূড়ান্ত ফি বলা ঠিক হবে না।
নবায়নের আগে নিজের BSP অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে লাইসেন্সের তথ্য অনুযায়ী প্রদর্শিত ফি যাচাই করুন। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিলম্ব না করে নবায়নের আবেদন করা ভালো। পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে পুনরায় ব্যবহারিক পরীক্ষা বা অতিরিক্ত কাগজপত্রের শর্ত থাকতে পারে।
ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে গেলে ডুপ্লিকেট করতে কত টাকা লাগে?
স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্স হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হলে নির্ধারিত নিয়মে প্রতিলিপি বা ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হয়। এ ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাই, প্রয়োজনীয় আবেদন ও নির্ধারিত ফি জমা দেওয়ার বিষয় থাকে।
ডুপ্লিকেট লাইসেন্সের ফি লাইসেন্সের ধরন এবং বিআরটিএর কার্যকর ফি-তালিকা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। হারানো লাইসেন্সের ক্ষেত্রে জিডি বা অন্য কোনো নথি প্রয়োজন কি না, তা আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট বিআরটিএ সার্কেল অফিস বা BSP পোর্টাল থেকে নিশ্চিত করা উচিত।
পুরোনো ফি-তালিকার অঙ্ক দেখে আবেদন না করে বর্তমান পোর্টালে প্রদর্শিত ফি অনুসরণ করাই নিরাপদ।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের শ্রেণি পরিবর্তন বা নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করতে কত টাকা লাগে?
কেউ আগে শুধু মোটরসাইকেলের লাইসেন্স নিয়েছেন, পরে ব্যক্তিগত গাড়ি চালানোর অনুমতি নিতে চাইলে নতুন শ্রেণি সংযোজনের প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে পেশাগত প্রয়োজনে যানবাহনের শ্রেণি পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও বিআরটিএর নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হয়।
শ্রেণি সংযোজন বা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন আবেদন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং নির্ধারিত ফি প্রযোজ্য হতে পারে। সব ধরনের শ্রেণি একসঙ্গে বা সরাসরি যুক্ত করা যায় না। বিশেষ করে পেশাদার ভারী যানবাহনের লাইসেন্সের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী শ্রেণির লাইসেন্স ও অভিজ্ঞতার শর্ত থাকতে পারে।
তাই নতুন ক্যাটাগরি যুক্ত করার আগে বিআরটিএর সংশ্লিষ্ট নির্দেশনা দেখে আবেদন করা উচিত।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত দিন সময় লাগে?
ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে নির্দিষ্ট একটি সময় সবার জন্য প্রযোজ্য নয়। কারণ আবেদন জমা, কাগজপত্র যাচাই, লার্নার লাইসেন্স অনুমোদন, পরীক্ষার তারিখ, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া, বায়োমেট্রিক তথ্য গ্রহণ এবং স্মার্ট কার্ড প্রিন্ট—প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হতে আলাদা সময় লাগতে পারে।
পরীক্ষার তারিখ পেতে অপেক্ষা করতে হতে পারে। আবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর স্মার্ট কার্ড প্রস্তুত ও বিতরণেও সময় লাগতে পারে। তাই আবেদন করার সময় পোর্টালে দেওয়া নির্দেশনা এবং বিআরটিএর এসএমএস অনুসরণ করা উচিত।
ই-ড্রাইভিং লাইসেন্সের সুবিধা পাওয়া গেলে সেটি গ্রহণের নিয়মও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী অনুসরণ করতে হবে।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফি কোথায় ও কীভাবে জমা দেবেন?
বর্তমানে বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালের মাধ্যমে নির্ধারিত ফি অনলাইনে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। পেমেন্টের জন্য পোর্টালে প্রদর্শিত অনুমোদিত পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।
বিআরটিএর সেবা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন পেমেন্টে ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল আর্থিক সেবার মতো নির্ধারিত মাধ্যম ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে সব পেমেন্ট মাধ্যম সব সময় একইভাবে উপলভ্য নাও থাকতে পারে। তাই পেমেন্ট করার সময় পোর্টালে প্রদর্শিত অপশন অনুসরণ করুন।
কোনো ব্যক্তি বা দালালের ব্যক্তিগত নম্বরে টাকা পাঠিয়ে লাইসেন্স করার চেষ্টা করবেন না। সব ফি সরকারি পোর্টাল বা অনুমোদিত পদ্ধতিতে জমা দিয়ে রসিদ সংরক্ষণ করুন।
ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে গিয়ে যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন
ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন করার সময় কিছু সাধারণ ভুলের কারণে আবেদন আটকে যেতে পারে বা পরবর্তী ধাপে সমস্যা হতে পারে।
প্রথমত, নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক ক্যাটাগরি নির্বাচন করতে হবে। শুধু মোটরসাইকেল চালাতে চাইলে অপ্রয়োজনীয় ক্যাটাগরি নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই। আবার দুই ধরনের যানবাহনের লাইসেন্স প্রয়োজন হলে শুরুতেই সঠিকভাবে আবেদন করা ভালো।
দ্বিতীয়ত, এনআইডির তথ্য ও আবেদনপত্রের তথ্য মিলিয়ে দিতে হবে। নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা বা মোবাইল নম্বরে ভুল থাকলে যাচাইয়ে সমস্যা হতে পারে।
তৃতীয়ত, অস্পষ্ট বা ভুল স্ক্যান কপি আপলোড করা যাবে না। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরিষ্কারভাবে স্ক্যান করে নির্ধারিত ফরম্যাটে জমা দিতে হবে।
চতুর্থত, পরীক্ষার প্রস্তুতি ছাড়া পরীক্ষায় অংশ নেওয়া উচিত নয়। ট্রাফিক আইন, সাইন এবং ব্যবহারিক গাড়ি চালানোর দক্ষতা ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে।
পঞ্চমত, লাইসেন্সের ফি সম্পর্কে পুরোনো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করবেন না। বিআরটিএর সর্বশেষ নির্দেশনা ও নিজের BSP অ্যাকাউন্টে প্রদর্শিত ফি অনুসরণ করুন।
ড্রাইভিং লাইসেন্সের খরচ সম্পর্কে সাধারণ জিজ্ঞাসা
১. বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে সর্বনিম্ন কত টাকা লাগে?
বিআরটিএর প্রকাশিত ফি অনুযায়ী, এক ক্যাটাগরির লার্নার লাইসেন্সের জন্য ৫১৮ টাকা দিতে হয়। এরপর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে মূল স্মার্ট কার্ডের ফি দিতে হয়। তাই শুধু লার্নার ফি দিয়ে সম্পূর্ণ ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া যায় না।
২. মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?
শুধু মোটরসাইকেলের জন্য এক ক্যাটাগরির লার্নার ফি ৫১৮ টাকা। এরপর স্মার্ট কার্ডের জন্য লাইসেন্সের ধরন অনুযায়ী নির্ধারিত ফি দিতে হবে।
৩. প্রাইভেট কারের ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কত টাকা লাগে?
প্রাইভেট কারের জন্য সাধারণত অপেশাদার লাইসেন্স প্রয়োজন। এক ক্যাটাগরির লার্নার ফি ৫১৮ টাকা এবং অপেশাদার স্মার্ট কার্ডের ফি ৪,৪৯৭ টাকা। ডাক খরচ ৬০ টাকা যুক্ত হলে মোট সরকারি ফি আনুমানিক ৫,০৭৫ টাকা হতে পারে।
৪. মোটরসাইকেল ও গাড়ির লাইসেন্স একসঙ্গে করা যায় কি?
হ্যাঁ, সংশ্লিষ্ট দুই ক্যাটাগরির জন্য আবেদন করা যায়। এ ক্ষেত্রে লার্নার ফি ৭৪৮ টাকা বলে বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তবে আবেদনকারীর যোগ্যতা ও শ্রেণি অনুযায়ী অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য হবে।
৫. অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ কত বছর?
বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অপেশাদার স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ ১০ বছর।
৬. পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ কত বছর?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, পেশাদার স্মার্ট কার্ড ড্রাইভিং লাইসেন্সের মেয়াদ পাঁচ বছর।
৭. ড্রাইভিং লাইসেন্সের আবেদন কি অনলাইনে করা যায়?
হ্যাঁ। বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে অ্যাকাউন্ট খুলে শিক্ষানবিশ লাইসেন্সের আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড এবং নির্ধারিত ফি পরিশোধ করা যায়।
৮. ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে কি মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগে?
হ্যাঁ। বিআরটিএর আবেদন প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত চিকিৎসকের দেওয়া মেডিকেল সার্টিফিকেট প্রয়োজনীয় নথির মধ্যে রয়েছে।
৯. পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে ডোপ টেস্ট লাগে কি?
পেশাদার লাইসেন্সের ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট সনদ চাওয়া হতে পারে। আবেদন করার সময় বিআরটিএর সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
১০. ড্রাইভিং লাইসেন্সের ফি কি পরিবর্তন হতে পারে?
হ্যাঁ। সরকারি ফি ও সেবা-সংক্রান্ত নির্দেশনা পরিবর্তিত হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে বিআরটিএর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও BSP পোর্টালে প্রদর্শিত সর্বশেষ ফি যাচাই করা উচিত।
উপসংহার
বাংলাদেশে ড্রাইভিং লাইসেন্স করতে খরচ নির্ভর করে লাইসেন্সের ধরন, যানবাহনের ক্যাটাগরি এবং আবেদনকারীর প্রয়োজনীয়তার ওপর। বিআরটিএর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এক ক্যাটাগরির লার্নার লাইসেন্সের ফি ৫১৮ টাকা এবং দুই ক্যাটাগরির জন্য ৭৪৮ টাকা। দক্ষতা যাচাই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর অপেশাদার স্মার্ট কার্ডের জন্য ৪,৪৯৭ টাকা এবং পেশাদার স্মার্ট কার্ডের জন্য ২,৭৭২ টাকা দিতে হয়। ডাকযোগে বিতরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৬০ টাকা লাগতে পারে।
অর্থাৎ অন্যান্য সম্ভাব্য খরচ বাদে এক ক্যাটাগরির অপেশাদার লাইসেন্স করতে আনুমানিক ৫,০৭৫ টাকা এবং পেশাদার লাইসেন্স করতে ৩,৩৫০ টাকা সরকারি ফি লাগতে পারে। তবে আবেদন করার আগে নিজের লাইসেন্সের ধরন অনুযায়ী বিআরটিএ সার্ভিস পোর্টালে প্রদর্শিত সর্বশেষ ফি যাচাই করুন। সঠিক নিয়মে আবেদন করুন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দিন এবং দালাল এড়িয়ে সরকারি পদ্ধতিতে লাইসেন্স সংগ্রহ করুন।