• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন

ধুম ধাম করে কাজের মেয়ের বিয়ে দিলেন গৃহকর্তা

Reporter Name / ৩৮৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৭ জুলাই, ২০২১

মোহাম্মদ আলী ॥
আত্মীয় স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশির অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে, উৎসব আনন্দঘন পরিবেশে ধুম ধাম করে কাজের মেয়ের বিয়ে দিলেন গৃহকর্তা!

বৃহস্পতিবার, জামালপুর জেলার পাথালিয়া গ্রামে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অল্প পরিসরে উৎসব আয়োজনের মধ্যে দিয়ে কাজের মেয়ে নুরানীর বিয়ে সম্পন্ন করলেন, গৃহকর্তা ঔষধ ব্যবসায়ী আবুল কামাল আজাদ (কমল) ও তার স্ত্রী সুলতানা রাবেয়া কাজল।

জানা যায়, আাজ থেকে ১০বছর আগে ৮বছরের নুরারীকে পাশের উপজেলা ইসলামপুরের হরিণধরা গ্রাম থেকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন কমলের স্ত্রী কাজল। সেই থেকেই নুরানী কমলের ছোট্ট মেয়ে সাবিহা তাসনিমের খেলার সাথী। সে তার মেয়ের সাথেই থাকে, মেয়ের সাথেই খায়, মেয়ের সাথেই ঘুমায়। এমনকি মেয়ের সাথেই স্কুলে যেতো। এভাবেই সে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার সুযোগ পায়। সময়ের পরিক্রমায় আজ নুরারী ১৮ বছরের যুবতী। রাষ্ট্রিয় ও ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী সে বিবাহের উপযুক্ত। সেই তাগিদ থেকেই তাকে সুপাত্রস্থ করলেন গৃহকর্তা।

এ ব্যাপারে গৃহকর্তা কমল জানান, নুরানী এতিম। তার বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে তার মা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। তাই, এমতবস্থায় আমরাই তার অভিভাবক। সামাজিক ও মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে এ দায়িত্ব আমাদেরই। তাই, আমরা আমাদের সাধ্যমত তাকে পাত্রস্থ করার চেষ্টা করেছি। বাকীটা আল্লাহর মর্জি।

গৃহকর্তার স্ত্রী দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটেটর, কাজল অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, কোনো একদিন যমুনার ওপাড়ে ত্রাণ দিতে গিয়েছিলাম। বিতরণ শেষে দেখলাম ৭/৮ বছরের একটি অর্ধনগ্ন, মলিণ শিশু আমাদের সামনে ঘুর ঘুর করছে। শিশুটিকে দেখেই আমার মায়া হলো। আমি তাকে কাছে ডেকে এনে জিজ্ঞেস করলাম তুমি আমার সাথে যাবে? সে কোনো জবাব না দিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। আমি আবারও বল্লাম যাবে, গেলে গোসল করে জামা কাপড় পড়ে এসো। যাও। একটু পরে দেখলাম সে গোসল করে জামা পড়ে তার মাকে সাথে নিয়ে এসেছে। আমার পরিচয় জেনে তার মা খুশি হয়ে আমার সাথে নুরানীকে তুলে দেন। সেই থেকেই নুরানী আমার পরিবারের একজন। আমি ও আমার পরিবার তাকে কখনও কাজের মেয়ে হিসেবে দেখিনি। সে আমার মেয়ের সাথে খেলেছে, খেয়েছে ও রাতে একই বিছানায় ঘুমিয়েছে। তাকে আমার মেয়ের সাথেই স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। এভাবেই দেখতে দেখতে আজ সে বিবাহের উপযুক্ত হয়ে উঠেছে। এখন তার নিজের একটি সংসার প্রয়োজন। সেই প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়েই পাশের উপজেলা মেলান্দহের পশ্চিম জালালপুর গ্রামে আমরা তার বিয়ে সম্পন্ন করলাম। তার স্বামী শাকিল একজন নির্মাণ শ্রমিক। সে খুব ভাল। তার কোনো যৌতুকের দাবি নেই। আল্লাহর কাছে আশা করছি তারা সুখী হবে।

নুুরানীর মা জহুরা বেগম বলেন, আমরা নদী ভাঙ্গন এলাকার মানুষ। আমার স্বামী ছিলেন একজন দিন মজুর। তিনটি সন্তান রেখে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর পর আমি অন্যের বাড়িতে কাজ করতাম। সে কাজে যা পেতাম তা দিয়ে তিন বেলা খাবার ঝুটত না। মেয়েটি আমার ভাত কাপড়ে কষ্ট করছিল। এমন সময় কাজল আপা আমার মেয়ের জন্য ফেরেস্তা হয়ে এলেন। তাই, আমি খুশি হয়েই তার কাছে আমার মেয়ে নুরানীকে তার হাতে শপে দিয়েছিলাম। আজ কমল ভাই ও কাজল আপা আমার মেয়েকে যে সম্মান ও মর্যাদা দিলেন তা হয়তো আমার স্বামীও দিতে পারতেন না।

বিয়েতে আমন্ত্রীত মেহমান, পাথালিয়া গ্রামের বাসিন্দা, এ্যাড. দিদারুল ইসলাম বলেন, আমাদের গ্রামবাসীর কাছে কমলের পরিবার শিক্ষনীয় হয়ে থাকল। কাজের মেয়ের প্রতি তারা যে সামাজিক দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ দেখালেন তা বর্তমান সময়ে খুবই বিড়ল।

আরেক মেহমান জামালপুর জজকোর্টের পেশকার, এস.এম. শফিউল আলম (দুলাল) বলেন, কমল ও তার স্ত্রী প্রমাণ করল কাজের মেয়েরাও মানুষ। তাদের প্রতিও আমাদের করণীয় রয়েছে। পৃথিবীর সব গৃহকর্তারা যদি কমলের পরিবারের মতো হতো তাহলে মানুষে মানুষে বৈষম্য অনেক কমে যেত।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
amazing-link-zeus.ca