ওয়াজেদুল হক মণি, মহেশখালী প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী—যেখানে একসময় মিষ্টি পান চাষ ছিল কৃষকদের স্বপ্নপূরণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। প্রাকৃতিকভাবে অনুকূল মাটি ও আবহাওয়ার কারণে এখানকার পান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ চাহিদা পেত। কিন্তু সেই ঐতিহ্য এখন হুমকির মুখে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় পান চাষিরা।
রমজান মাস জুড়ে বাজারে পান বিক্রি হলেও দাম আশানুরূপ না হওয়ায় হতাশা বাড়ছে চাষিদের মধ্যে। বর্তমানে প্রতি ‘বিরা’ পান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ টাকায়, যা উৎপাদন খরচের তুলনায় অত্যন্ত কম বলে দাবি কৃষকদের।
🟥খরচ বাড়ছে, লাভ কমছে
মহেশখালীর বড় মহেশখালী, গোরকঘাটা, শাপলাপুর ও হোয়ানকসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পান বরজে নিরলস পরিশ্রম করছেন চাষিরা। তবে এই পরিশ্রমের যথাযথ মূল্য মিলছে না বাজারে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক একর জমিতে পান চাষ করতে গড়ে প্রায় দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। বাঁশ, খুঁটি, দড়ি, পাতা, সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে বাজারমূল্য না থাকায় চাষিরা পড়ছেন লোকসানের মুখে।
সিপাহীর পাড়ার পান চাষি শাহরিয়ার আমিন বলেন, “অনেক আশা নিয়ে পান চাষ করি। কিন্তু বাজারে যে দাম পাই, তাতে খরচই উঠে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর চাষ করা সম্ভব হবে না।”
ছোট মহেশখালীর চাষি আবদুল মজিদ জানান,
“পান বরজ রক্ষণাবেক্ষণ খুবই কঠিন। সামান্য অবহেলায় রোগবালাই দেখা দেয়। এত ঝুঁকি নিয়ে চাষ করেও যদি লাভ না হয়, তাহলে এই পেশায় টিকে থাকা কঠিন।”
চাষিদের অভিযোগ, মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণেই তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্থানীয় বাজার থেকে কম দামে পান কিনে এসব ব্যবসায়ীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বেশি দামে বিক্রি করলেও কৃষকের হাতে সেই লাভ পৌঁছায় না।
পান সংরক্ষণের জন্য মহেশখালীতে নেই কোনো আধুনিক ব্যবস্থা। ফলে চাষিরা দীর্ঘদিন পান ধরে রাখতে পারেন না। বাধ্য হয়ে কম দামে হলেও দ্রুত বিক্রি করতে হয়, যা লোকসানের অন্যতম কারণ।
সম্ভাবনা থাকলেও প্রয়োজন পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞদের মতে, মহেশখালীর মাটি ও আবহাওয়া মিষ্টি পান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। সঠিক বাজার ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধা ও সরাসরি ক্রয়ব্যবস্থা চালু করা গেলে এই খাত থেকে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
চাষিদের দাবি,
▫️কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি পান সংগ্রহের ব্যবস্থা
▫️পান বাজারে ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ
▫️মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ
▫️আধুনিক সংরক্ষণাগার বা হিমাগার স্থাপন
মহেশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল গফফার বলেন, “মহেশখালীতে মিষ্টি পান চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে আমরা সহযোগিতা করছি। তবে বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত না হলে চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাবেন না।”
চাষিরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হলে মহেশখালীর ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি পান চাষ ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু কৃষক নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিও।
মহেশখালীর মিষ্টি পান শুধু একটি কৃষিপণ্য নয়, এটি একটি ঐতিহ্য ও সম্ভাবনার প্রতীক। কিন্তু সেই সম্ভাবনা টিকিয়ে রাখতে হলে এখনই প্রয়োজন কার্যকর নীতিমালা, সুষ্ঠু বাজারব্যবস্থা এবং কৃষকবান্ধব উদ্যোগ। নইলে মিষ্টি পাতার এই গল্প খুব শিগগিরই তিক্ত বাস্তবতায় হারিয়ে যেতে পারে।