আজ মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০, ১২:৩২ পূর্বাহ্ন
Smiley face

একজন শাহরিয়ার একজন স্বপ্নদ্রষ্টা

মানুষটির সম্পর্কে লেখার ধৈর্য্য আমার নেই।কারন তার কাজের কাছে আমার লেখার ধৈর্য্য শক্তি খুব কম।একটা ঘটনা বলি তাহলে মানুষটিকে আমরা আরও একটু ভালো ভাবে চিনতে পারবো।মানিকগঞ্জে এডিসি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহনের পর তাকেই দেখেছি বলতেঃ”আমার রুমে সকলেই ঢুকতে পারবে।ঢুকতে কোন অনুমতি লাগবে না।দল -মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী,পেশার মানুষ আসবে, কাউকে আটকাবেন না।”
যাই হোক ২০১৭ সাল ঘিওর উপজেলায় মাদক বিরোধী একটি প্রোগ্রামে স্যার প্রধান অতিথি হিসেবে যাবেন।শিশু কিশোরের নিয়ে প্রোগ্রামটি হবে তাই আমাদের বেশ কয়েজন তরুণকেও সাথে নিলেন।গাড়ীর ব্যবস্থা করা হলো-বললাম স্যার আপনি তাহলে আপনার গাড়ীতে আসেন।আমরা সকলে অন্য একটা গাড়ীতে যাচ্ছি। তিনি বললেন না।শুধু শুধু দুটি সরকারী গাড়ির তেল খরচ করে কি লাভ! আমার গাড়ী নেওয়ার দরকার নাই – সকলে একসাথে এক গাড়ীতেই যাবো।যাই হোক রওনা হলাম প্রোগ্রাম শেষে সন্ধ্যা হয়ে গেলে।মানিকগঞ্জে ফেরার জন্য রওনা হলাম।কিছুদূর এগিয়ে আসতে রাস্তার পাশে কিছু মানুষ। আমরা আসলে এতো মানুষ কেন সেদিকে নজর দিলাম না -কিন্তু স্যারের নজর ঠিকই পড়লো ড্রাইভারকে বললেন গাড়ী থামাতে,থামলো।কি হয়েছে? জানতে পারলাম একটি মেয়ে সাইকেল চালাতে গিয়ে রাস্তার পাশে নদীতে পড়ে গেছে।হাত পা ভেঙ্গে গেছে সকলের ধারনা!দেখাও যাচ্ছে গরিব পরিবারের মেয়ে। এলাকাটা একটু ভিতরে হওয়ায় যাতায়াত বেশ কষ্টজনক।স্যার মেয়ের মাকে আর বাবাকে ডেকে বললেন আমাদের গাড়ীতে আসেন।মানিকগঞ্জ হসপিটালে পৌঁছে দিবো সমস্যা নেই।আমরা ভাবলাম কষ্ট করে ২ জন বসা গেলেও ৩ জন কোন মতেই হবে না এর মধ্যে স্যার আবার এদেন কেন উঠালেন! বললাম স্যার জায়গা হবে কি? বললো জায়গা বের করতে হবে।সকলে একটু চেপে চেপে বসো আমিও বসি।মেয়েটিকে আর মেয়ের বাবা ও মাকে উঠানো হলো।রওনা হলাম গাড়ী দ্রুত চললে মেয়েটির কষ্ট হচ্ছে বুঝা যাচ্ছিল তাই স্যার বললেন ধীরে ধীরে যেতে।কিছুপথ যাওয়ার পর মেয়েটি হালকা বমি করলো! বমির কিছু অংশ গাড়ীর ছিটেও ভরলো।আমাদের অনেকেই মুখ সরিয়ে নিলো।কিন্তু যিনি মুখ সরিয়ে নিলেন না তিনি হলেন মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার। টিস্যু বের করে কিছু দিলেন মেয়ের মায়ের কাছে মোছার জন্য, আর কয়েকটি টিস্যু নিজে হাতে নিয়ে মুছতে শুরু করলেন।দৃশ্যটি দেখে আমরা বিশেষ করে আমি পারসোনালি অনেক অবাক হয়েছিলাম।মনে মনে তখন থেকে তার প্রতি ভালোবাসা জমতে শুরু করলো।যাই হোক তারপর মানিকগঞ্জে পৌছালাম স্যার মেয়ের বাবাকে বললেনঃ”এখনতো রাত সদর হসপিটালে নিয়ে যাই। সদরে অলটাইম ডাক্তার থাকে।” কিন্তু মেয়ের মা বাবা রাজি না তিনি সরকারী হসপিটালের চিকিৎসা দিতে একদমই রাজি না।স্যার বললেন আপনারা চিন্তা করবেননা আমার পরিচিত ডাক্তার আছে আমি বলে দিবো ভালো চিকিৎসাই হবে-সদরেই নেই, স্যারের পরিচয় গোপন রেখে নানা ভাবে তাদের বুঝালেন।কিন্তু মেয়ের বাবা মা একদমই মানতে রাজি না। মেয়েটির বাবা মায়ের কথায় আমরা অনেকেই বিরক্ত হচ্ছিলাম, স্যারের প্রতিও বিরক্ত হচ্ছিলাম যে কেউ যদি নিজের ভালো না বুঝে তাদের প্রতি এতো দরদ দেখানোর কোন মানে হয়!কিন্তু স্যার বার বার বুঝানোর চেষ্টা করে বুঝাতে পারলেন না।মেয়েটির মা বললোঃ”একটা প্রাইভেট হসপিটালে আমার এক ভাই থাকে।সে বলছে তার হসপিটালে নিতে।”যাই হোক অবশেষে তাদের কথা মতো তাদের পরিচিত ভাইয়ের হসপিটালেই নেওয়া হলো।তার কথিত এলাকার ভাইও (দালাল)হসপিটালের সামনেই এসে দাড়িয়ে আছেন।জেলা প্রশাসনের গাড়ী থেকে নামতে দেখা মাত্রই তার ভাইটি দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো।বিষয়টিতে আমরাও বুঝতে পারলাম সে হসপিটালটির দালাল, স্যারকে দেখে ভয় পেয়েছে।ভাবলাম এখানেই বুঝি এ পর্ব শেষ করবেন স্যার।কিন্তু স্যার যখনই বুঝলেন তারা দালালের খপ্পরে পড়েছে,স্যার এখানেই তাদের ছেড়ে দিলেন না।স্যারের পিএ রানা ভাইকে ডেকে বললেনঃ”রানা যাওতো কোন ডাক্তারের কাছে নেয় দেখবা, ডাক্তারকে বলবে এডিসি স্যারের রোগী। আমার কথা বলবা।আর হসপিটালের মালিকের ও ডাক্তারের ফোন নাম্বার নিয়ে আসবা। আমরা অফিসে যাই তুমি চিকিৎসা প্রক্রিয়া দেখে এসো।”
যাই হোক রাতেই, ডিসি অফিস থেকে আমরা বিদায় নিয়ে চলে গেলাম।ভাবলাম ঘটনাটিও এখানেই ইতি।কিন্তু পরের দিন সকালে গেলাম স্যারের সাথে দেখা করতে তার অফিসে।আগেই বলেছি স্যারের রুমে ঢুকতে কোন অনুমতি লাগতো না কারো।ভিতরে জায়গা থাকলেই সকলে ঢুকে পড়তো।আমিও ঢুকলাম,দেখলাম ফোনে কথা বলছেন কোন এক রোগীর খোজ নিচ্ছেন ডাক্তারের কাছে থেকে।ইশারায় আমাকে বসতে বললেন আমিও চেয়ারে বসলাম।কথা শেষ করার পর বললাম বাসার কেউ অসুস্থ কিনা? সকলে কি ভালো? বললেন -জি আলহামদুলিল্লাহ। তাহলে ডাক্তারের থেকে কোন রোগীর খোজ নিলেন? বললো ঐ যে গতকাল যে শিশুটিকে হসপিটালে রেখে আসলাম রানা ঐ ডাক্তারে ফোন নাম্বার এনে দিয়েছে,তাই খোজ নিলাম।ডাক্তার বললো এখন ভালো আছে,হাত ভেঙ্গে গেছে।কিছুক্ষন পর রানা ভাইকে ডেকে স্যার বললেনঃ”রানা কাজের ফাঁকে আজ একটু হসপিটাল থেকে শিশুটিকে দেখে আসবা তো!!! এর রকম কতো ঘটনা যে নিজ চোখে দেখেছি, আগেই বলেছি এতো লেখার ধৈর্য্য আমার নেই।শেষ করবো দুটি কথা বলে- ভাবুনতো একজন এডিসির পদোন্নতি হয়েছে এর জন্য শিশু কিশোরেরা মিষ্টি বিতরন করছেন!অথচ যার পদোন্নতির জন্য করছেন তিনিই এটা জানেন না। এ রকম দৃশ্য আর কোন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ঘটেছে কিনা জানিনা।জনাব মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার স্যারের পদোন্নতিতে ঘটেছে-আমি নিজে তার সাক্ষী।ডিসি অফিসে আনুষ্ঠানিক বিদায় হওয়ার পরও তাকে ৩ দিন মানিকগঞ্জে অবস্থান করতে হয়েছে তার বিদায় অনুষ্ঠানের জন্য।মানিকগঞ্জের প্রায় সকল স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন স্যারের বিদায় অনুষ্ঠান করার শিডিউল নেওয়ার জন্য এমনভাবে উঠে পড়ে লেগেছিলো যে তিনি একসাথে ২/৩ টি সংগঠনকে মিলে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে বলতেন, আলাদা আলাদা সময় দিতে পারেননি।এমন কি তিনি যাদের সব চাইতে বেশি ভালোবাসতেন তার নিজ হাতে গড়া ও তার সবচেয়ে প্রিয় কিশোর, তরুণদের সংগঠন “দিশারী”। আমি নিজে দিশারী কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি হিসেবে বার বার অনুরোধ করেও আলাদা সময় নিতে পারি নি স্যারের থেকে।আমরাও ৪ টি সংগঠনের সাথে যৌথভাবে স্যারের বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে বাধ্য হয়েছি।তিনি মানিকগঞ্জে নেই প্রায় ২ বছরের বেশি সময় কিন্তু তার জন্মদিন মানিকগঞ্জে ঠিকই পালিত হয়।

যিনি জেলার শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ ও সরকারী শিশু পরিবারের শিশুরা সহ সকল শ্রেণীর মানুষের কাছে একজন ভালোবাসার মানুষ।
এমন একজন মহৎ মানুষকে কি ভালো না বেসে পারা যায়?অনেক ভালোবাসি স্যার আপনাকে ও আপনার কাজকে।
শুভ জন্মদিন স্যার,আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘ হায়াত দান করুক।আমিন।
লেখকঃ- মোঃ হাসান শিকদার
উপদেষ্টা , জাতীয় শিশু টাস্কফোর্স(এনসিটিএফ)।
সভাপতি,দিশারী (স্বেচ্ছাসেবী তরুণ সংগঠন)।
শিক্ষার্থী,রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ,সরকারী দেবেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ,মানিকগঞ্জ।

Print Friendly, PDF & Email
error: Content is protected !!