• শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৫৫ পূর্বাহ্ন

অপ্রিয় সত্য বচন! ১ লাখ ১৮ হাজার ঘরের মধ্যে ভেঙ্গেপড়া ঘর মাত্র দশমিক ২৫%

Reporter Name / ৫১৭ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৮ জুলাই, ২০২১

দেশের ৬৪টা জেলার ৪৯২টা উপজেলায় ভূমিহীন-গৃহহীনদের সরকার ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ পরিবারকে ইতিমধ্যে ঘর দিয়েছে। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় আগে যে কাবিখা,টিআর প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল সেখান থেকে বরাদ্দ কমিয়ে ভূমিহীন-গৃহহীনদের ঘর দিয়েছে। এসব প্রকল্পের টাকা আগে সাগর চুরি হতো। এই টাকা অন্তত গরিব মানুষের একটা ঘর পাওয়ার কাজে এবার ব্যবহার হলো।

স্বাধীনতার পর যদি কোনো ভাল কাজ হয়, এটি হলো সেই ভাল কাজ। এ জন্য সরকার ও মাঠ পর্যায়ের আমলাদের অভিনন্দন।
বাংলাদেশের মত একটি গরিব দেশে যাদের একটা ঘর নেই, তারাই জানেন একটি পাকা ঘরের স্বপ্ন নিয়ে কত মানুষ জীবন পার করেন। আমাদের বহু মানুষের জীবনটা জসিমউদ্দের আসমানিদের মত, পদ্মা নদীর কুবের মাঝির মত। আমি বেঁচে থাকতে যদি দেখতে পেতাম, বাংলাদেশের সব মানুষের মাথা গোজার একটা ব্যবস্থা আছে, তাহলে খুব ভাল লাগত।

তাহলে এতো ভাঙ্গা বাড়ির ছবি কেন!!??
১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ ঘর বানিয়েছে সরকার। তার মধ্যে কত শতাংশ ভেঙ্গে পড়েছে? আন্দাজ করুন ফেসবুকবাসী?
এই ভেঙ্গে পড়া সংখ্যা দশমিক ২৫ শতাংশও। ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ টি ঘরের মধ্যে ভেঙ্গে পড়েছে বা অভিযোগ এসেছে ৩০০টি ঘরের বিষয়ে।
যেসব স্থানে বেশি অভিযোগ ওঠেছে, সেগুলো দেখবেন কয়েকটা। বরগুনার আমতলী, বগুড়ার শেরপুর, মুন্সিগঞ্জ সদর, সিরাজগঞ্জের কাজীপুর, কুড়িগ্রামের রৌমারী, লালমনিরহাট সদর উপজেলা,বরিশালের আগৈলঝাড়া ও মেহেন্দিগঞ্জ, গোপালগঞ্জেন সদর উপজেলার নামই বেশি শুনেছেন। এসব স্থানেও সব ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। খেয়াল করলে দেখবেন ঘুরেফিরে এসব জায়গার ছবিই ফেসবুকে ভাসছে।

ঘর ভেঙ্গে পড়ার কারণ কী?
দুই রুমের আধা-পাকা ঘরের প্রতিটির নির্মাণ ব্যায় ১,৭১,০০০ টাকা। মালামাল নেওয়ার জন্য ৪ হাজার টাকা দেয়া হয়েছে।
ক) ১ লাখ ৭১ হাজার টাকায় পাকা ঘর করা কঠিন কাজ। রডের দাম ও সিমেন্টের দাম বহু বেড়েছে। যে রড ছিল মাত্র ৪৮ থেকে ৫২ হাজার টাকা টন সেটি ৬৮ হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। সিমেন্টের বাজারও অস্থিতিশীল।
খ) দ্বিতীয় যেটা মনে হয়েছে, দ্রুত বাড়ি বানাতে গিয়ে খাস জমি যা নেয়া হয়েছে তা সব বিলের বালু এলাকায়। এতে করে মাটি নরম ছিল। সময় নিয়ে স্থান নির্বাচিত করা উচিত ছিল। তড়িঘড়ি করে করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে।
গ) ইউএনদের বাড়ি বানানোর অভিজ্ঞতা নেই। এটি তাদের কাজও না। তাদের দিয়ে এই বাড়ি বানাতে গিয়ে অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেক সংকট তৈরি হয়েছে।

ঘ) এটির সাথে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের প্রকৌশলীদের যুক্ত করা উচিত ছিল। দীর্ঘমেয়াদি প্লানের আওতায় এনে সারা দেশে অন্তত ৩০টি প্যাকেজের আওতায় দরপত্র ডাকা উচিত ছিল। ঘল নির্মাণে যারা যোগ্য তারা এটি করত।
ঙ) ঘরগুলো খাস জমিতে করতে হয়েছে। অধিকাংশ খাস জমি ছিল বিল এলাকায় ও চর এলাকায়। এখানকার মাটিতে সময় না নিয়ে করার কারণে ঘর ভেঙ্গে পড়েছে। এটি কাম্য ছিল না। সময় নিয়ে ঘরের মাটির পাইলিংয়ের অংশটা করা উচিত ছিল।

দরপত্রের মাধ্যমে একটি ইউনিফায়েড ডিজাইনে ঘরগুলো করা গেলে ঘরের আরসিসি পিলারগুলো হয়তো ঠিকাদার কোম্পানি একটি কারখানা স্থাপন করে এক জায়গায় বানিয়ে নিতেন, তাতে খরচও কম পড়ত। তা ছাড়া বড় ঠিকাদার করলে ঘর নির্মানে ব্যয় কমে যেতো। কারণ একসাথে মালামাল কেনা, বড় গোডাউন করা একটি অঞ্চলে, বড় প্রতিষ্ঠানের কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় কাজ করতে গিয়ে সিস্টেম লস কম হয় ইত্যাদি। এতে মান ভাল যেমন হয়, খরচ তেমনি কমে।

দশমিক ২৫% ঘরের বিষয়ে অভিযোগ এসেছে। এবারে ভূমিহীন ও ঘরহীনদের তালিকা অন্যান্যবারের চেয়ে অনেক ভাল হয়েছে। যতদুর জানা গেছে যারা ঘর পেয়েছেন তাদের প্রায় অধিকাংশ যোগ্য, প্রকৃত দাবিদার।

যে ঘরগুলো ভেঙ্গে পড়েছে, আর একটু যত্ন, আর একটু কৌশলী হলে এই সংকট এড়ানো যেতো। দরপত্র করা হলে আমরা ঠিকাদারদের ধরতে পারতাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা হয়েছে তা বাংলাদেশের মত অর্থনীতির দেশে ইতিহাস তৈরি করেছে সন্দেহ নেই। সরকারের উচিত ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ ঘরের মধ্যে কতগুলো ঘর ভেঙ্গেছে সে বিষয়ে পরিচ্ছন্ন তথ্য উন্মুক্ত করা। যেগুলো ভেঙ্গেছে তার দায় নেয়া। সেগুলোর তালিকা নিশ্চয় সরকার প্রকাশ করবে।

এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিভাগে ১০ শতাংশের মত সিস্টেম লস, তিতাস গ্যাস সহ গ্যাস বিতরণ কোম্পানির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তারা মান সম্মত প্রেসারে গ্যাস বেচেন না, হাওয়া বিক্রি করেন। সে কারণে ইভিসি মিটার দেয় না তারা যাতে ধরা পড়ে যাবে।
ওয়াসার সিস্টেম লস কত? সরকারের প্রতিটি প্রকল্পে ব্যয় বাড়ে কত শতাংশ? ওষুধ কোম্পানির ওষুদে মান অনুযায়ী গুন থাকে না, যেমন ৬০০ এমজির নাপা এক্সট্রাতে ময়দার পরিমান অনেক বেশি থাকে, বাজারের সরিষার তেলে উগ্র ঝাচ কারণ ক্যামিকাল এরকম হাজারো শয়তানির দেশ বাংলাদেশ। শুধু সরকারি কর্মকর্তরা এখানে চোর বাকিরা সব ফেরেশতা এমনটা না।
১ লাখ ৭১ হাজার টাকার মান অনুযায়ী বিচার করলে আশ্রয়ন প্রকল্পটি এখন পর্যন্ত আশা জাগানিয়া। সরকারের উচিত ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ করা। উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ঘর বানানো।

রাজনৈতিক, দল ও আন্দোলনকর্মীরা এই দশমিক শূন্য ২৫ শতাংশ ভেঙ্গে পড়া ঘর নিয়ে আশ্রয়ন প্রকল্পটির সমালোচনা করবে, সেটা ঠিক আছে। সেই সমালোচনা থেকে সরকারের শেখার আছে। আগামিতে এ ধরনের ভুল না হয় সেটা তারা দেখবে।
কিন্তু মিডিয়ার একটা দায় আছে। সেটা হলো, গোটা ঘটনাকে একটি ছবি হিসেবে দেখানো। আমি বিশ্বাস করি গণমাধ্যম সারা দেশের ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৮০ ঘরের মধ্যে সত্যিকারে কতগুলো ঘর এ পর্যন্ত ভেঙ্গে পড়েছে তার তালিকা দেবে। আমরা ভেঙ্গে পড়া ঘরগুলোর শতাংশ জানতে চাই।

ভেঙ্গেপড়া ঘরগুলো সরকার নিশ্চয় ফের তুলে দেবে। কিন্তু গণহারে গরিব মানুষের ঘর সম্পর্কে ট্রল করার আগে আমাদের জানা দরকার এই প্রকল্পটি মানুষের জন্য কত প্রয়োজন। গরিব মানুষকে গরিব রাখা অন্যায়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
amazing-link-zeus.ca