• শনিবার, ২২ জানুয়ারী ২০২২, ০৭:৫৫ অপরাহ্ন



আজ ঐতিহাসিক যশোর মুক্ত দিবস

Reporter Name / ৫২ Time View
Update : সোমবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০২১



সেলিম আহম্মেদ,স্টাফ রিপোর্টারঃ
আজ ৬ ডিসেম্বর । ঐতিহাসিক যশোর হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে মুক্ত হয় যশোর জেলা। এদিন দুপুরের পরপরই যশোর সেনানিবাস ছেড়ে পালিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা।

যশোর ছিল মুক্তিযুদ্ধের ৮ নম্বর রণাঙ্গন। কমান্ডার ছিলেন মেজর মঞ্জু। অন্যদিকে, পাকিস্তানি বাহিনীর মোতায়েন ছিল ১০৭ নম্বর ব্রিগেড। এর কমান্ডার ছিলেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান। যশোর সেনানীবাস থেকে শত্রুবাহিনী ৬টি জেলা নিয়ন্ত্রণ করত।

২০ নভেম্বর মুক্তিবাহিনী ও মিত্র বাহিনী যশোর সেনানীবাস দখলে অভিযান শুরু করে। এদিন পাকিস্তানি বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের শক্তিশালী ঘাঁটি চৌগাছা ঘিরে ফেলে সম্মিলিত বাহিনী। ফলে মিত্রবাহিনীর গোলার আওতায় আসে যশোর সেনানীবাস।

২২ নভেম্বর রাতে পতন হয় চৌগাছার। হানাদার বাহিনী সলুয়া বাজারে তৈরি করে অগ্রবর্তী ঘাঁটি। এসময় যশোর সেনানীবাসের তিন দিকেই মিত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনী শক্ত ঘাঁটি গেড়ে বসে। এ অঞ্চলের পাকিস্তানি বাহিনীর কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার হায়াত খান প্রাণভয়ে তার অফিস স্থানান্তর করেন খুলনায়।

৫ ও ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর উপর ব্যাপক হামলা চালানো হয়। যুদ্ধে টিকতে না পেরে ৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী পালিয়ে যায় খুলনার দিকে। মুক্ত হয় যশোর জেলা। যুদ্ধ বিধ্বস্ত মুক্ত যশোরেই প্রথম উঠেছিল বিজয়ী বাংলাদেশের রক্তসূর্য খচিত গাঢ় সবুজ পতাকা। যা ছিল স্বাধীন দেশের প্রথম পতাকা।

জানা যায়, ১৯৭১ সালের ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। এসময় মুক্তি বাহিনীও সীমান্ত এলাকা থেকে যশোর সেনানীবাসসহ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। হামলায় পর্যুদস্ত পাকিস্তানি বাহিনী ৫ ডিসেম্বর থেকে পালানো শুরু করে।

যশোর সেনানীবাস ছেড়ে তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে খুলনার গিলাতলা সেনানীবাসের দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। এসময় শহরতলীর রাজারহাটসহ বিভিন্ন স্থানে মুক্তি বাহিনীর সাথে তাদের প্রচন্ড লড়াই হয়।

যশোরের বীর মুক্তিযোদ্ধা হেরমত আলী জানান, ৬ ডিসেম্বর বিকেলে যশোর সেনানীবাস খালি করে পালিয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদাররা। এরপর মিত্র বাহিনীর কমান্ডার জেনারেল বারাতের নেতৃত্বে মিত্র ও মুক্তিবাহিনী সেনানীবাসে প্রবেশ করে দখল নেয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে মুক্তির আনন্দে উচ্ছসিত মুক্তিযোদ্ধা জনতার ঢল নামে যশোর শহরে। পাড়া মহল্লায়ও চলে খন্ড খন্ড আনন্দ মিছিল।

মুক্তির আনন্দে জয় বাংলা শ্লোগানে ফেটে পড়ে গোটা যশোরের মানুষ। তিনি বলেন, একাত্তরের ২০ নভেম্বর মুক্তি বাহিনী ও মিত্র বাহিনী যশোর সেনানীবাস দখলে অভিযান শুরু করে। তখন পাক বাহিনীর পশ্চিমাঞ্চলের ঘাঁটি চৌগাছা ঘিরে ফেলে সম্মিলিত বাহিনী। এরপর ২২ নভেম্বর রাতে চৌগাছার পতন হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধের শেষ অভিযান চলে ৩, ৪ ও ৫ ডিসেম্বর।

এই তিন দিন যশোর অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। এসময় মিত্র বাহিনীও সীমান্ত এলাকা থেকে যশোর সেনানীবাসসহ পাক আর্মীদের বিভিন্ন স্থাপনায় বিমান হামলা ও গোলা নিক্ষেপ করে। এক পর্যায়ে পাক বাহিনী পালাতে শুরু করে। ৫ডিসেম্বর সকাল থেকে পাকিস্তানের নবম ডিভিশনের সঙ্গে ভারতীয় নবম পদাতিক ও চতুর্থ মাউন্টে ডিভিশনের প্রচন্ড লড়াই হয়।

বিকেলেই পাকসেনা অফিসাররা বুঝতে পারে যশোর দূর্গ আর কোনভাবেই রক্ষা করা সম্ভব নয়। এরপর বেনাপোল অঞ্চলে দায়িত্বরত লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শামসকে নওয়াপাড়ার দিকে দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন ব্রিগেডিয়ার হায়াত। আর নিজের ব্রিগেড নিয়ে রাতের আঁধারে যশোর ক্যান্টনমেন্ট থেকে তিনি পালিয়ে যান খুলনার দিকে।

জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের পর নিজ জেলা শত্রুমুক্ত হওয়ার সেই বিজয় উল্লাসের কথা স্মরণ করে আজও আবেগ আপ্লুত বীর সেনানীরা। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় প্রকাশিত যশোর গেজেটিয়ার এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ ৬ তারিখ সন্ধ্যা হতে না হতেই পাকবাহিনীর সবাই যশোর ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করে পালিয়ে যায়।

৭ ডিসেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ ৮ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর মঞ্জুর ও মিত্র বাহিনীর নবম ডিভিশনের কমান্ডার মেজর জেনারেল দানবীর সিং যশোরে প্রবেশ করেন। তখনও তারা জানতেন না যে যশোর ক্যান্টনমেন্ট শূন্য। তারা কোন রকম প্রতিরোধ না দেখে বিস্মিত হন।

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর জেলার সাবেক কমান্ডার রাজেক আহমেদ বলেন, ৬ ডিসেম্বরেই আমরা যশোর শহর থেকে শত্রু সেনাদের বিতাড়িত করি। কিন্তু সেদিন যশোর শহর ছিল জন মানব শূণ্য। ফলে পরদিন ৭ ডিসেম্বর বিজয় মিছিল বের করা হয়।

প্রসঙ্গত, স্বাধীনতার পর থেকে ৭ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করা হতো। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ও ইতিহাসবিদদের দেয়া তথ্য যাচাই বাছাই শেষে ২০১০ সালে ৬ ডিসেম্বরকে যশোর মুক্ত দিবস ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকেই ৬ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক যশোর মুক্ত দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে।

৮ ডিসেম্বর যশোর শহরের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় মুক্তিবাহিনী। ১০ ডিসেম্বর যশোরের জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন ওয়ালিউল ইসলাম। ১১ ডিসেম্বর টাউন হল মাঠে বিশাল জনসভা হয়। সেখানে মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ ও অস্থায়ী রাস্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। অফিস আদালতের কার্যক্রম শুরু হয় ১২ ডিসেম্বর।

গৌরবময় দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন উপলক্ষে যশোর জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন সংগঠন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কর্মসূচির মধ্যে যশোর শামস উল হুদা স্টেডিয়ামে মুক্তিযোদ্ধা জনতার মহা সমাবেশ, টাউন হল মাঠ থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল রয়েছে।




আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category