“করোনা ভাইরাসের মিউটেশন ও অন্যান্য কথা” ডা.নুসরাত সুলতানা

প্রকাশিত: ৮:০৯ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৫, ২০২০

মিউটেশন ভাইরাসের স্বাভাবিক ধর্ম। প্রতিকূল পরিবেশ বেঁচে থাকার জন্য ও প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য, টিকা বা এন্টিভাইরাল ড্রাগের বাধাকে অতিক্রম করার জন্য ভাইরাস প্রতিনিয়ত নিজের রূপ পরিবর্তন করে থাকে। কখনো এই মিউটেশন ভাইরাসকে দূর্বল করে দেয়, কখনো শক্তিশালী। আরএনএ ভাইরাসের ক্ষেত্রে এই মিউটেশনের হার অনেক বেশী। কারন RNA dependent RNA polymerase এর Proof reading ক্ষমতা দূর্বল থাকে।

গত নভেম্বরে ইংল্যান্ডের কিছু এলাকায় কোভিড-১৯ এর সংক্রমন আশংকাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কারণ প্যান্ডেমিক এই ভাইরাসটি মিউটেশন করে রোগটির মো্ড় যে কোন দিকে ঘুরিয়ে নিতে পারে তারা এই বিষয়ে সজাগ ছিলেন। পরে সিকুএন্সিং করে জানা যায়, এটি SARS-CoV-2 এর সম্পূর্ণ নতুন একটি ভ্যারিএন্ট বা রূপ যার নামকরণ করা হয়েছে VUI 202012/1 যেখানে ১৭ টি মিউটেশন পাওয়া গেছে, যার ১০ টি মিউটেশনই স্পাইক প্রোটিনে। এর মাঝে তিনটি Deletion mutation আর বাকীগুলো Point mutation. Point mutation এ প্রোটিনের তেমন পরিবর্তন না ঘটলেও Deletion mutation এ mutation এর জায়গার পরের Amino acid sequence ও পরিবর্তিত হয়। ফলে প্রোটিনের দৃশ্যমান পরিবর্তন ঘটে।

মলেকিউলার ক্লক অনুযায়ী SARS-CoV-2 এর জিনোমে প্রতি মাসে দুটি করে মিউটেশন হওয়ার কথা। সে হিসেবে জিনোমে ২৫ টি Nucleotide substitution হওয়ার কথা। কিন্তু ইউকে ভ্যারিয়েন্টে ২৯ টি Nucleotide substitution পাওয়া গেছে।

SARS-CoV-2 ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের গুরুত্ব কি?

স্পাইক প্রোটিন হচ্ছে ভাইরাসটির মোক্ষম অস্ত্র কোষকে আক্রমন করার জন্য এবং একে টার্গেট করেই ভ্যাক্সিন তৈরি করা হয়। মিউটেশনের ফলে এর চেহারা যদি পরিবর্তিত হয় তাহলে ন্যাচারাল বা Vaccine induced Antibodyর এর বিরুদ্ধে কাজ করা চ্যালেঞ্জিং হবে। স্পাইক প্রোটিনে মিউটেশনের ফলে ভাইরাসটির রোগ সংক্রমনের হার ৭০% বেড়ে গেছে। Ro ১.১ থেকে হয়েছে ১.৭।

স্পাইক প্রোটিনে বেশী সংখ্যক মিউটেশনের কি কি কারণ হতে পারে?
স্পাইক প্রোটিনে অস্বাভাবিকভাবে বেশী সংখ্যক মিউটেশন Gradual accumulation of mutation এর মাধ্যমে হয়নি। কারণ ইংল্যান্ডে সিকুএন্সিং কভারেজ অনেক বেশী থাকায় বিজ্ঞানীরা আগেই তা আঁচ করে ফেলতো।
অনেক বিজ্ঞানী ধারনা করছেন এই ভ্যারিয়েন্টটি এমন দেশ থেকে এসেছে, যেখানে সিকুএন্সিং কভারেজ অনেক কম। ফলে মিউটেশন ধীরে ধীরে জমা হলেও তা সনাক্ত করা হয়নি।

এছাড়াও আরেকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হচ্ছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম সম্পন্ন কোন কোভিডে আক্রান্ত রোগীর কাছ থেকেও এই ভ্যারিয়েন্ট ইমার্জ করতে পারে। কারন এই ধরনের রোগীরা কোভিডে লম্বা সময় ধরে আক্রান্ত থাকায়, অনেক গুলো Escape mutation জমা হতে পারে।

RT-PCR টেস্টে এর কোন প্রভাব পড়বেনা। কারন প্রথম থেকেই Multiple gene কে টার্গেট করে RT-PCR এর প্রাইমের ডিজাইন করা হয়।

ভ্যাক্সিনে এর কোন প্রভাব পরবে কি? ভ্যাক্সিন দিলে যে Antibody তৈরি হয় তা Polyclonal অর্থাৎ স্পাইক প্রোটিনের বিভিন্ন অংশে আক্রমন করতে পারে। তাই নিরাশ হওয়ার এখনি কোন কারণ নেই। যেহেতু ভ্যাক্সিনের মূল ফ্রেমটি তৈরী আছে, শুধুমাত্র একটু ফাইন টিউনিং অর্থাৎ স্ট্রেইনের ধরণ অনুযায়ী ভ্যাক্সিনে সামান্য পরিবর্তন করা লাগতে পারে, যেটা প্রতি বছর ফ্লু ভ্যাক্সিনের জন্য করা হয়।

অদৃশ্য শত্রু আমাদের ঘিরে রেখেছে। যুদ্ধের ময়দান থেকে সরে আসার কোন উপায় নেই। মাস্ক পরে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে, নিয়মিত হাত ধুয়ে আপাতত এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে।

লেখক:
ডাঃ নুসরাত সুলতানা
সহকারী অধ্যাপক,ভাইরোলজী বিভাগ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ
অনুলিখন: রিফাত আল মাজিদ