সারা দেশে গত দেড় মাসে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় তিনশ ছুঁইছুঁই। মৃতদের বেশিরভাগই কোমলমতি শিশু। দেশে প্রায় নির্মূল হয়ে যাওয়া হামে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুতে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের টিকা কেনা সংক্রান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত। একসময় বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার এক ভিন্ন ও সংকটাপন্ন চিত্র সামনে এনেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত না হওয়া এবং টিকা কেনার প্রচলিত পদ্ধতিতে হঠাৎ পরিবর্তনের কারণেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
চার বছর ধরে নেই বড় ক্যাম্পেইন
তথ্যমতে, ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে হামের বিশেষ ক্যাম্পেইন স্থগিত করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর অন্তর এই ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ বা ২০২৫ সালে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্যাম্পেইন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগের অভাব ছিল।
সেক্টর কর্মসূচি থেকে প্রস্থান ও সংকট
১৯৯৮ সাল থেকে চলে আসা ‘স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি’ (এইচপিএনএসপি) থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেরিয়ে আসে অন্তর্বর্তী সরকার। অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২৪ সাল থেকেই পিসিভি, আইপিভি, পেন্টা ভ্যালেন্ট ও এমআরসহ শিশুদের প্রায় সব টিকার সংকট দেখা দেয়।
সূত্র জানায়, দাতা সংস্থাগুলোর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পভিত্তিক কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কিন্তু এই পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি ছিল দীর্ঘ ও জটিল, যা টিকা সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটায়।
অর্থ ছাড়ের দীর্ঘসূত্রতা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৫ সালের আগস্টে টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও চূড়ান্ত অর্থ ছাড় হতে সময় লাগে প্রায় পাঁচ মাস। সরাসরি ক্রয়ের (ডিপিএম) মাধ্যমে ইউনিসেফ থেকে টিকা কেনার অনুমোদন দিলেও অর্থ বিভাগ থেকে অনুমোদন মিলতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি হয়ে যায়। এই দীর্ঘ প্রশাসনিক জটিলতার সরাসরি প্রভাব পড়ে মাঠ পর্যায়ের টিকাদানে।
ইউনিসেফের সতর্কতা ও সায়েন্সের প্রতিবেদন
যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) মাধ্যমে টিকা কেনা স্থগিত করে উন্মুক্ত দরপত্রের পথে হাঁটতে চেয়েছিল। ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স তখন সতর্ক করেছিলেন যে, উন্মুক্ত দরপত্রে টিকা পেতে সময় লাগবে, যা মহামারির ঝুঁকি বাড়াবে। তিনি তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে এই সিদ্ধান্ত না নিতে অনুরোধ করেছিলেন।
বর্তমান সরকারের ভাষ্য
হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের অবহেলা ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “কিছু মানুষের গাফিলতির কারণে টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব শিশুস্বাস্থ্যে পড়েছে।” বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনও টিকার মজুত সংকটের জন্য পূর্ববর্তী প্রশাসনের নীতিগত ভুলকে দায়ী করেছেন।
তবে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান দাবি করেছেন, টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো পরিবর্তন করা হয়নি, বরং আইনি বাধ্যবাধকতা মেনেই কাজ করা হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, “এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। টিকা না পাওয়া শিশুর সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ১০-২০ লাখে পৌঁছেছে। এটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়, বরং ম্যানেজমেন্ট ইনফিশিয়েন্সি বা ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা।” তিনি মনে করেন, হাম নির্মূলে ৯৫ শতাংশ কাভারেজ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে তা কখনোই ৮০ শতাংশের উপরে যায়নি, যা হার্ড ইমিউনিটি তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।