• রবিবার, ০১ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম
মাদক সেবন করে মাতলামির অভিযোগ, আটক কৃষক দলের দুই নেতা ধৈর্যই সাফল্যের মূলমন্ত্র, জানালেন কৌশানি ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ২৬ মার্কিন ঘাঁটি, লোকসান কয়েক শ কোটি ডলার নওগাঁয় রাতভর ডিবির অভিযান, তিন উপজেলায় মিলল যা জমির খতিয়ান নিয়ে ভোগান্তি কমছে, ডিজিটাল ডাটাবেজে ৮ কোটির বেশি খতিয়ান আত্রাইয়ে জাতীয় যুব দিবসে ১৪ লাখ টাকার ঋণ, পেলেন কারা? শীতের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত আত্রাইয়ের লেপ-তোষক কারিগররা, বেড়েছে দাম ৪৭ বছর বয়সে এইচএসসি পাস, জিপিএ ৪.৬৩ পেলেন ইউপি সদস্য সোমবার থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশা নিবন্ধন শুরু, চলবে ৮ জোনে ৮ রঙের গাড়ি ঘরে বসেই বাইকের ট্যাক্স টোকেন নবায়ন করবেন যেভাবে

জমির খতিয়ান নিয়ে ভোগান্তি কমছে, ডিজিটাল ডাটাবেজে ৮ কোটির বেশি খতিয়ান

Reporter Name / ১৮ Time View
Update : রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

জমির খতিয়ান সংগ্রহ করতে আর আগের মতো বারবার ভূমি অফিসে ছুটতে হবে না—দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল রূপান্তরের ফলে নাগরিকদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন সুযোগ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রেকর্ড রুমের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে আট কোটির বেশি খতিয়ান বা পর্চা ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। ফলে জমির রেকর্ড অনুসন্ধান, মালিকানাসংক্রান্ত তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজনীয় ভূমিসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ছে। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভূমি অফিসে যাতায়াতের ভোগান্তি কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য, দেশের সব খতিয়ানের তথ্য পর্যায়ক্রমে সরকারি ব্যবস্থার আওতায় অনলাইনে নিয়ে আসা। এ জন্য পুরোনো ভূমি রেকর্ডসহ বিভিন্ন জরিপের খতিয়ান ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাইজেশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক পারভেজ হাসান জানান, সব খতিয়ান অনলাইনে আপলোড করার লক্ষ্যে ডাটা এন্ট্রি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় ইতোমধ্যে ১১টি উপজেলায় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।

তিনি জানান, পরবর্তী সময়ে সারাদেশে এ কার্যক্রম সম্প্রসারণের জন্য একটি ক্রয় প্রস্তাব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাব অনুমোদন এবং পরবর্তী দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা সম্ভব হবে। সব খতিয়ানের তথ্য অনলাইনে পাওয়া গেলে জমির রেকর্ড সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ঘোরাঘুরি কমবে। একই সঙ্গে জমির মালিকানা ও রেকর্ডসংক্রান্ত তথ্য সহজে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।

ডিজিটাল ডাটাবেজে থাকা আট কোটির বেশি খতিয়ানের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের রেকর্ড রয়েছে। এর মধ্যে সিএস, এসএ, আরএস ও বিএসসহ বিভিন্ন জরিপের খতিয়ান যেমন রয়েছে, তেমনি ই-নামজারির মাধ্যমে তৈরি ও হালনাগাদ হওয়া রেকর্ডও রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন সার্ভে খতিয়ানের ডাটাবেজে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ থেকে পাঁচ কোটি ১৩ লাখ খতিয়ান রয়েছে। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রায় পাঁচ কোটি ১২ লাখ খতিয়ান অনলাইনে উন্মুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ই-নামজারি ও অন্যান্য ভূমিসেবা ডিজিটাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাটাবেজে রেকর্ডের সংখ্যা বেড়েছে।

ভূমি ব্যবস্থাপনার ডিজিটাল রূপান্তরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ই-নামজারি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫১৬টি উপজেলা ও সার্কেল ভূমি অফিস এবং ৩ হাজার ৪৬৭টি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ই-নামজারি কার্যক্রম চালু হয়েছে। এ ব্যবস্থায় প্রতি মাসে অনলাইনে প্রায় পাঁচ লাখ নামজারি মামলা নিষ্পত্তি করা হচ্ছে।

জমি ক্রয়, উত্তরাধিকার, দান কিংবা অন্য কোনো বৈধ উপায়ে মালিকানা পরিবর্তনের পর সরকারি ভূমি রেকর্ডে নতুন মালিকের তথ্য হালনাগাদ করার প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে নামজারি বলা হয়। আগে এ কাজের জন্য আবেদন জমা, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ এবং আবেদনের অগ্রগতি জানতে অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার ভূমি অফিসে যেতে হতো। ই-নামজারির মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ, নথি যাচাই, মামলার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সিদ্ধান্ত জানার প্রক্রিয়া অনলাইনে সম্পন্ন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

খতিয়ান সংগ্রহের ক্ষেত্রেও ডিজিটাল ব্যবস্থা নাগরিকদের জন্য সুবিধা তৈরি করেছে। অনলাইনে জমির তথ্য অনুসন্ধান করে সংশ্লিষ্ট খতিয়ান পাওয়া গেলে প্রাথমিকভাবে জমির দাগ নম্বর, রেকর্ডভুক্ত মালিকের নাম ও জমির পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সার্টিফায়েড কপির জন্যও আবেদন করা যায়। এতে যাতায়াত খরচ, কর্মঘণ্টার অপচয় এবং মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর সুযোগ রয়েছে।

জমি কেনাবেচার আগে রেকর্ড যাচাই করা ক্রেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ডাটাবেজে খতিয়ানের তথ্য সহজে পাওয়া গেলে জমির প্রাথমিক তথ্য যাচাই করা তুলনামূলক সহজ হয়। একইভাবে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির রেকর্ড খুঁজে বের করা, পুরোনো দলিলের সঙ্গে খতিয়ানের তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং নামজারির প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রেও অনলাইন ব্যবস্থা সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু অনলাইনে খতিয়ান দেখে জমির মালিকানা চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় না। জমি কেনার আগে দলিল, নামজারি, দখল, ভূমি উন্নয়ন করসহ সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য যথাযথভাবে যাচাই করা জরুরি।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্যও ডিজিটাল ভূমিসেবা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিদেশে অবস্থান করেও অনলাইনে জমির রেকর্ড অনুসন্ধানের সুযোগ থাকলে দেশে থাকা আত্মীয়স্বজনের ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। তবে পরিচয় যাচাই, অনুমোদিত আবেদন এবং সার্টিফায়েড কপি সংগ্রহের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করতে হবে।

ডিজিটাল ভূমিসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ভূমি উন্নয়ন কর অনলাইনে আদায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ কোটি ৭০ লাখ হোল্ডিংয়ের তথ্য ম্যানুয়াল পদ্ধতি থেকে ডিজিটাল ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় এক কোটি ১০ লাখ অনলাইন দাখিলা দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ই-পর্চার মাধ্যমে সরকারের কোষাগারে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা জমা হয়েছে। একই সময়ে ভূমিসেবা ব্যবস্থার বিভিন্ন খাতে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণও বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ডিজিটাল রেকর্ড ব্যবস্থার ফলে নথি সংরক্ষণ ও অনুসন্ধানের কাজ নির্দিষ্ট ব্যবস্থার আওতায় আসছে। এতে কাগজের নথি খুঁজে পেতে বিলম্ব এবং নথি হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমানোর সুযোগ রয়েছে। আবেদন, ফি পরিশোধ ও নিষ্পত্তির তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকলে নাগরিকেরা সেবার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারেন। পাশাপাশি ভূমি প্রশাসনের কাজেও জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

তবে ডিজিটাল সেবার সুফল পুরোপুরি নিশ্চিত করতে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা প্রয়োজন। ওয়েবসাইট ও সার্ভারের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম, তথ্যের নিরাপত্তা, ডাটাবেজের নির্ভুলতা এবং ব্যবহারবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো নাগরিক নিজের জমির তথ্য খুঁজে না পেলে, রেকর্ডে ভুল থাকলে কিংবা আবেদন সংশোধনের প্রয়োজন হলে কার্যকর সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। পুরোনো কাগুজে নথি যাচাই করে সঠিক তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ডিজিটাল ভূমিসেবার পাশাপাশি ভূমি অফিসগুলোর অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সারাদেশে ১ হাজার ৩৩০টি ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ এবং ১৫০টি সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণের লক্ষ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি প্রণয়নের উদ্যোগ রয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নথি সংরক্ষণ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মপরিবেশ এবং নাগরিকদের সেবা গ্রহণের পরিবেশ উন্নত হতে পারে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ড্রোন ব্যবহার করে ভূমি জরিপের বিষয়টিও রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে জরিপের সময় কমানো এবং তথ্য সংগ্রহের নির্ভুলতা বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে জমিসংক্রান্ত তথ্য অনুসন্ধানের সুযোগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা, রাজস্ব মামলা ব্যবস্থাপনা এবং ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ কমানোর ক্ষেত্রেও ডিজিটাল তথ্যব্যবস্থা সহায়ক হতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী বলেন, ভূমিসেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে সরকার ডিজিটাল কার্যক্রম সম্প্রসারণে কাজ করছে। সব খতিয়ান পর্যায়ক্রমে অনলাইনে আনা সম্ভব হলে নাগরিকেরা ঘরে বসেই জমির রেকর্ড সংগ্রহ ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করতে পারবেন। এতে সময় ও অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভূমি অফিসে মানুষের যাতায়াত কমবে এবং ভূমির রেকর্ড সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনার সুফল নিশ্চিত করতে তথ্যের নির্ভুলতা, নিয়মিত হালনাগাদ, তথ্যের নিরাপত্তা এবং নাগরিকদের সহজে সেবা পাওয়ার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবার পাশাপাশি পুরোনো রেকর্ড সংরক্ষণ ও যাচাই, ভুল তথ্য সংশোধন এবং নাগরিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হবে।

সব মিলিয়ে, আট কোটির বেশি খতিয়ান ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত হওয়া দেশের ভূমি প্রশাসনের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে সব খতিয়ান অনলাইনে অন্তর্ভুক্ত করা, তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য সেবা গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে জমির রেকর্ড সংগ্রহ ও যাচাইয়ের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়তে পারে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category
amazing-link-zeus.ca