আতঙ্কের জনপদ কোম্পানীগঞ্জ, ৩০০ পুলিশ-র‌্যাব মোতায়েন

প্রকাশিত: ১১:০৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০২১

আতঙ্কের জনপদ কোম্পানীগঞ্জ, ৩০০ পুলিশ-র‌্যাব মোতায়েন

আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ। তিন মাস ধরে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সাতটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নিহত হয়েছেন সাংবাদিকসহ দুজন। আতঙ্কের এই জনপদে এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে প্রশাসন। নতুন করে যেন আর কোনো সহিংসতার ঘটনা না ঘটে, সেজন্য মোতায়েন করা হয়েছে ৩০০ পুলিশ এবং ১৬ র‌্যাব সদস্য।

জেলা পুলিশের পাশাপাশি রাঙামাটি থেকে আনা হয়েছে ২০০ পুলিশ সদস্য। রয়েছেন পুলিশের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এবং প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) সকাল থেকে বসুরহাটের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অবস্থান নিয়েছেন পুলিশ সদস্যরা।

এদিকে একাধিক মামলায় গ্রেফতার আতঙ্কে পুরুষশূন্য কোম্পানীগঞ্জ। এ অবস্থায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি চান আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি নোয়াখালীর বসুরহাট পৌরসভা নির্বাচন কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াতে শুরু করে কোম্পানীগঞ্জে। এরই মধ্যে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি কোম্পানীগঞ্জের চাপরাশির হাট পূর্ব বাজারে মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বাদলের সমর্থকদের মধ্যে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় সাংবাদিক বুরহান উদ্দিন মুজাক্কির নিহত হন।

এরপর থেকে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বসুরহাট পৌর এলাকা। মঙ্গলবারও দুই পক্ষের সংঘর্ষে একজন নিহতসহ অর্ধশত আহত হয়েছেন। একের পর এক হামলা, ভাঙচুর ও সংঘর্ষের ঘটনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন এলাকাবাসী।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, বসুরহাট পৌরসভার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারার মেয়াদ বুধবার রাত ১২টায় শেষ হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নতুন করে ১৪৪ ধারা জারি না করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বসুরহাটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন রাখা এবং টহল জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সেখানে কাউকে কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। কেউ কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বসুরহাট ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন নিজাম জানান, তিন মাস ধরে প্রায় অচল হয়ে আছে উপজেলার প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র বসুরহাট। করোনার ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই একের পর এক রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনায় স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। আমরা খুব দ্রুত এই অবস্থা থেকে মুক্তি চাই।

গত মঙ্গলবার নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাট বাজারে মেয়র আবদুল কাদের মির্জা ও মিজানুর রহমান বাদলের সমর্থকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় আলাউদ্দিন (৩২) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন।

কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর জাহেদুল হক রনি দাবি করে বলেন, পুলিশের গুলিতে কোনো লোক মারা যায়নি। বরং দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলি থামাতে গিয়ে তিনিসহ ছয়জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

এদিকে বুধবার (১০ মার্চ) দুপুরে কোম্পানীগঞ্জ থানা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) জাকির হোসেন বাদী হয়ে ৯৮ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ১৫০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৮ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

কোম্পানীগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহত অটোরিকশাচালক মো. আলাউদ্দিনের (৩২) বাড়িতে শোকের মাতম চলছে। এক ছেলে ও এক প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে কী করবেন, কোথায় যাবেন আর তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা কীভাবে হবে, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় স্ত্রী পারভীন আক্তার।

আলাউদ্দিনের স্ত্রী পারভীন আক্তার বলেন, মঙ্গলবার মাগরিবের সময় শেষবারের মতো ফোন করে দ্রুত বাড়ি ফিরবেন বলে জানিয়েছিলেন আলাউদ্দিন। সেটাই তার শেষ ফোন। এরপর রাতে আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে জানতে পারি বসুরহাট পৌরসভা এলাকায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলির সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাকে নোয়াখালী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে তিনি মারা যান।

পারভীন আরও জানান, আলাউদ্দিনের উপার্জনে তাদের সংসার চলত। তিনি স্থানীয় যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি চাকরিজীবী বলেন, কোম্পানীগঞ্জের মানুষ শান্তি চায়। আমরা এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি চাই না। আজ দুইজন মায়ের বুক খালি হয়েছে। এভাবে আর কতদিন চলবে? কোম্পানীগঞ্জ আগের মতো শান্তির পরিবেশে ফিরে আসুক।

(তথ্যসুত্র – ঢাকা পোষ্ট)