সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার এক সাক্ষীর বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গভীর রাতে হামলা, ভাঙচুর ও ব্যাপক লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় পরিবারের নারী সদস্যদের মারধর ও লাঞ্ছিত করার ঘটনা ঘটে, যাতে অন্তত পাঁচজন আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) মধ্যরাতে উপজেলার প্রত্যন্ত দৌলতপুর গ্রামে এ হামলার ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে শাল্লা থানা-পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আলামত সংগ্রহ করেছে।
ভুক্তভোগী পরিবার সূত্রে জানা যায়, দৌলতপুর গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার একজন গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। মহান মুক্তিযুদ্ধে দুলাল মিয়ার বাবা মামুদ আলীসহ তাঁদের পরিবারের সাতজন সদস্য শহীদ হন। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে দুলাল মিয়াসহ মোট ৩২ জন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই মামলার আসামি তোতা টেইলার্স ও জলিল মিয়াসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে একাত্তরে ৩৪ জনকে হত্যা, পাঁচ নারীকে ধর্ষণ, ৩১ জনকে অপহরণ, ১৪ জনকে নির্যাতন এবং ৩০টি বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর আসামিরা সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হন।
হামলার শিকার দুলাল মিয়ার মেয়ে উজ্জ্বলা আক্তার জানান, তাঁর বাবা যুদ্ধাপরাধ মামলার সাক্ষী হওয়ার পর থেকেই পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিল। দুলাল মিয়া ও তাঁর জামাতা হেলাল মিয়া গ্রামের একটি দোকানে যৌথভাবে ব্যবসা পরিচালনা করেন। গত ২৩ অক্টোবর ওই দোকানে চুরির ঘটনা ঘটলে বিষয়টি শাল্লা থানাকে জানানো হয়। এর প্রেক্ষিতে ২৯ অক্টোবর বৃহস্পতিবার দিনের বেলায় পুলিশ তদন্তে গ্রামে আসে। তখন আসামিপক্ষের লোকজন গ্রামে পুলিশ আসার কারণ নিয়ে তাঁদের সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডায় জড়ায় এবং পুলিশের সঙ্গেও উচ্চবাচ্য করে।
উজ্জ্বলা আক্তারের অভিযোগ, পুলিশ গ্রাম থেকে চলে যাওয়ার পর মধ্যরাতে যুদ্ধাপরাধ মামলার আসামি তোতা টেইলার্সের ভাতিজা জালাল মিয়া ও অপর আসামি জলিল মিয়ার নাতি শাহিন মিয়ার নেতৃত্বে তোফাজ্জল, হেকিম মড়ল, সুলতান, রাজ্জাক, তারেক, শামিম, নূর ইসলামসহ ১৫ থেকে ২০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের বাড়ি ও দোকানে অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলাকারীরা বসতঘর ও দোকান ভাঙচুর করে নগদ চার লাখ টাকা, দুটি ভরি স্বর্ণালঙ্কার, চারটি ফ্রিজ এবং গোয়ালঘরের ছয়টি গরু লুট করে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন স্বজনেরা। এ ছাড়া বাধা দিতে গেলে পরিবারের ফাতেমা বেগম, ফরিদা বেগম ও রোকেয়া বেগমকে মারধর ও যৌন নিপীড়নের চেষ্টা চালানো হয়। আহতদের উদ্ধার করে দিরাই ও শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে।
দুলাল মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আসামিরা এলাকায় প্রভাবশালী হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের নানাভাবে হুমকি ও নির্যাতন করে আসছিল। মধ্যরাতে সব লুট করে নেওয়ার পর থেকে তাঁর স্বামী দুলাল মিয়াকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দুলাল মিয়ার জামাতা হেলাল মিয়া জানান, ঘটনার সময় বাড়িতে কোনো পুরুষ সদস্য না থাকার সুযোগে এই নৃশংস হামলা ও লুটপাট চালানো হয়।
শাল্লা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোকতাদির আহমদ জানান, দৌলতপুর গ্রাম থেকে তিন নারী ও এক শিশু আহত অবস্থায় হাসপাতালে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত জালাল মিয়ার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
শাল্লা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সোহেল জানান, বৃহস্পতিবার দিনে একটি অভিযোগের তদন্তে পুলিশ ওই গ্রামে গেলে কিছু লোকের সঙ্গে পুলিশের কথা-কাটাকাটি হয়েছিল। পরে রাতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আলামত সংগ্রহ করেছে। তিনি আরও বলেন, ভুক্তভোগীরা আহতদের চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মামলা করতে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে; লিখিত অভিযোগ পেলেই প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।