ঋত্বিক নয়ন, চট্টগ্রাম
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েল কেন্দ্রিক নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে জ্বালানি তেলের মজুত দিয়ে আপাতত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি হলে বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে দেশ।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ ‘হরমুজ প্রণালি’তে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। শিপিং ডেটা অনুযায়ী, এই জলপথের দুই প্রবেশমুখে শত শত জ্বালানি তেল ও এলএনজিবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ। এর মধ্যে সৌদি আরবের তেল শোধনাগারে হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
এদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় বাজার থেকে সাময়িকভাবে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’। সোমবার প্রতিষ্ঠানটি জানায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তারা এলএনজি উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে।
আমদানিনির্ভরতা ও বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। দেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন এলএনজি আমদানি করা হয়, যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ টনই আসে কাতার থেকে। বর্তমানে দেশীয় খনি থেকে প্রতিদিন ১৭১ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলেও চাহিদার বড় অংশ মেটাতে হয় আমদানিকৃত ৮৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি দিয়ে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. এরফানুল হকবলেন, “আমাদের দুটি এলএনজি টার্মিনালে সীমিত মজুত রাখার সুযোগ আছে। ইতোমধ্যে ছয়টি কার্গোর মধ্যে চারটি দেশে পৌঁছেছে। বাকি দুটির উৎস হরমুজ প্রণালি না হওয়ায় সেগুলো নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কম।” তিনি আরও জানান, সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস খুঁজতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু হয়েছে। তবে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হবে।
এলপিজি ও তেলের মজুত পরিস্থিতি
দেশে বছরে অন্তত ১৪ লাখ টন এলপিজির চাহিদা রয়েছে, যার পুরোটাই মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সহসভাপতি মোহাম্মদ হুমায়ুন রশিদ বলেন, “ইতোমধ্যে ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি দেশে পৌঁছেছে। চলতি মাসে আরও ১ লাখ ৯০ হাজার টন আসার কথা। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী না হলে আপাতত বড় সংকটের আশঙ্কা নেই।”
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশে ৩৬ দিনের মজুত সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে মজুত আছে ১৫ দিনের। তবে সমুদ্রপথে ও খালাসের অপেক্ষায় আছে আরও ২০ থেকে ২৫ দিনের তেল। বিপিসির এক কর্মকর্তা জানান, জুন পর্যন্ত চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে আমদানির চুক্তি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, “সংঘাত যদি দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হয়, তবে সব ধরনের জ্বালানি সরবরাহে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে এবং আমদানি ব্যয় অনেক বেড়ে যাবে।” তিনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান জোরদার এবং অন্তত তিন মাসের মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, “হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আসতে হয়। এতে জাহাজ ভাড়া ও পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তবে সোমবার পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য আতঙ্কিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।”