শীতকালে ত্বকের পাশাপাশি ঠোঁটেরও বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। কারণ ঠোঁটের ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের ত্বকের তুলনায় পাতলা এবং এতে তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি নেই। ফলে ঠান্ডা বাতাস, কম আর্দ্রতা ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণে ঠোঁট দ্রুত শুষ্ক হয়ে যায়। প্রথমে ঠোঁটে টান অনুভূত হয়, পরে চামড়া উঠতে শুরু করে। অনেক সময় ঠোঁটে ফাটল, জ্বালাপোড়া এমনকি রক্তপাতও হতে পারে।
অনেকে ঠোঁট ফাটলে বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজান কিংবা শুকনো চামড়া হাত দিয়ে তুলে ফেলেন। এতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও সমস্যা আরও বাড়তে পারে। আবার কেউ কেউ ঠোঁটের শুষ্কতা দূর করতে সুগন্ধিযুক্ত লিপবাম বা প্রসাধনী ব্যবহার করেন, যা সংবেদনশীল ঠোঁটে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
তাই শুধু লিপবাম ব্যবহার করলেই হবে না, ঠোঁট ফাটার প্রকৃত কারণ বুঝে সঠিক পরিচর্যা করা জরুরি। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ঠোঁট ফাটলে পুষ্টির ঘাটতি, অ্যালার্জি কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
শীতকালে ঠোঁট ফাটার প্রধান কারণ
শীতকালে ঠোঁট ফাটার পেছনে শুধু ঠান্ডা আবহাওয়া দায়ী নয়। দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস, পুষ্টির ঘাটতি, অ্যালার্জি এবং ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার কারণেও ঠোঁট শুষ্ক ও ফেটে যেতে পারে।
১. ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া
শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায়। ঠান্ডা বাতাস ও শুষ্ক পরিবেশের কারণে ঠোঁট থেকে আর্দ্রতা দ্রুত হারিয়ে যায়। ঠোঁটের ত্বকে তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি না থাকায় এটি সহজেই শুষ্ক হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে বাইরে বেশি সময় কাটালে, ঠান্ডা বাতাসের সরাসরি সংস্পর্শে থাকলে কিংবা ঠোঁট ঢেকে না রাখলে সমস্যা বাড়তে পারে।
২. বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজানো
ঠোঁট শুকিয়ে গেলে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজান। এতে সাময়িকভাবে আরাম পাওয়া গেলেও পরে সমস্যা আরও বাড়ে।
লালার মধ্যে থাকা কিছু এনজাইম ঠোঁটের সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে। আবার লালা শুকিয়ে গেলে ঠোঁটের আর্দ্রতাও কমে যায়। ফলে বারবার ঠোঁট ভেজানোর অভ্যাস ঠোঁট ফাটার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৩. শরীরে পানির ঘাটতি
শরীরে পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। শীতকালে অনেকেই গরমের তুলনায় কম পানি পান করেন। ফলে পানিশূন্যতার ঝুঁকি তৈরি হয়।
বিশেষ করে ঠোঁট শুষ্ক হয়ে যাওয়া, মুখ শুকিয়ে থাকা এবং প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে পর্যাপ্ত পানি পান করছেন কি না, তা খেয়াল করা উচিত।
৪. ঠোঁটের যত্নে ভুল প্রসাধনী ব্যবহার
সব ধরনের লিপবাম বা লিপস্টিক ঠোঁটের জন্য উপযোগী নয়। কিছু প্রসাধনীতে থাকা সুগন্ধি, রং, মেনথল, ক্যাম্ফর, পুদিনা বা অন্যান্য উপাদান সংবেদনশীল ঠোঁটে অ্যালার্জি ও জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে।
এ কারণে নতুন কোনো লিপবাম ব্যবহারের পর ঠোঁটে জ্বালাপোড়া, চুলকানি বা শুষ্কতা বেড়ে গেলে সেটি ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।
৫. ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি
কিছু ভিটামিন ও খনিজের অভাবের সঙ্গে ঠোঁটের প্রদাহ, শুষ্কতা এবং বিশেষ করে ঠোঁটের দুই কোণে ফাটল দেখা দেওয়ার সম্পর্ক রয়েছে।
বিশেষ করে ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬, বি১২, আয়রন ও জিঙ্কের ঘাটতি থাকলে কিছু মানুষের ঠোঁট ও মুখের কোণে সমস্যা হতে পারে। তবে শীতকালে ঠোঁট ফাটলেই ভিটামিনের অভাব হয়েছে, এমন ধারণা সঠিক নয়।
৬. সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি
অনেকে মনে করেন, শীতকালে সূর্যের আলো থেকে ঠোঁটের কোনো ক্ষতি হয় না। কিন্তু শীতকালেও সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠোঁটের ত্বকের ক্ষতি করতে পারে।
দীর্ঘদিন সূর্যের আলোতে সুরক্ষা ছাড়া থাকলে ঠোঁট শুষ্ক হওয়া, প্রদাহ এবং রং পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৭. অ্যালার্জি ও ত্বকের রোগ
কিছু মানুষের ঠোঁটের ত্বক স্বাভাবিকভাবেই সংবেদনশীল। টুথপেস্ট, মাউথওয়াশ, লিপস্টিক, লিপবাম কিংবা খাবারের নির্দিষ্ট উপাদানের কারণে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এ ছাড়া একজিমা, কন্টাক্ট ডার্মাটাইটিস এবং চিলাইটিসের মতো সমস্যার কারণেও ঠোঁট শুষ্ক, লাল ও ফাটা অবস্থায় থাকতে পারে।
ঠোঁট ফাটে কোন ভিটামিনের অভাবে?
ঠোঁট ফাটার অন্যতম আলোচিত কারণ হলো ভিটামিনের ঘাটতি। বিশেষ করে ঠোঁটের দুই পাশে বারবার ফাটল, লালচে ভাব বা ক্ষত দেখা দিলে কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি আছে কি না, তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে।
ভিটামিন বা খনিজ
ঘাটতির সম্ভাব্য প্রভাব
ভিটামিন বি২
ঠোঁটের কোণে ফাটল ও মুখে প্রদাহ
ভিটামিন বি৩
মুখ ও ঠোঁটের প্রদাহসহ ত্বকের সমস্যা
ভিটামিন বি৬
মুখের কোণে ক্ষত ও ত্বকের সমস্যা
ভিটামিন বি১২
মুখের প্রদাহ ও অন্যান্য রক্তস্বল্পতাজনিত লক্ষণ
আয়রন
ঠোঁটের কোণে ফাটল ও রক্তস্বল্পতা
জিঙ্ক
ত্বকের স্বাভাবিক মেরামত প্রক্রিয়ায় সমস্যা
ভিটামিন বি২: রিবোফ্লাভিন নামে পরিচিত এই ভিটামিন শরীরের বিভিন্ন বিপাকীয় কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে ঠোঁটের কোণে ফাটল, মুখের ভেতরে প্রদাহ এবং জিহ্বার সমস্যা দেখা দিতে পারে।
ভিটামিন বি৩: নিয়াসিনের ঘাটতি গুরুতর হলে ত্বকের প্রদাহসহ বিভিন্ন সমস্যা দেখা যায়। ঠোঁট ও মুখের ভেতরেও অস্বস্তি হতে পারে।
ভিটামিন বি৬ ও বি১২: এসব ভিটামিনের ঘাটতি থাকলে মুখের ভেতরে প্রদাহ, ঠোঁটের কোণে ক্ষত এবং অন্যান্য শারীরিক উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
আয়রন: শরীরে আয়রনের ঘাটতি হলে রক্তস্বল্পতা হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে ঠোঁটের দুই পাশে ফাটল বা অ্যাঙ্গুলার চিলাইটিসের সঙ্গে এর সম্পর্ক পাওয়া যায়।
তবে শুধু ঠোঁট ফাটার কারণে নিজে থেকে ভিটামিন বা আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক পরীক্ষা করে ঘাটতি শনাক্ত করবেন এবং সেই অনুযায়ী চিকিৎসা দেবেন।
ঠোঁট ফাটা দূর করার ঘরোয়া উপায়
ঠোঁট ফাটলে সব সময় দামি প্রসাধনী ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। কিছু সহজ ও নিরাপদ অভ্যাসের মাধ্যমে ঠোঁটের শুষ্কতা কমানো যায়।
১. পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করুন
ঠোঁট ফাটা দূর করার সবচেয়ে সহজ উপায়গুলোর একটি হলো সাদা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করা। এটি ঠোঁটের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে এবং আর্দ্রতা বেরিয়ে যাওয়া কমায়।
দিনে কয়েকবার এবং বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে পরিষ্কার ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগাতে পারেন।
২. পর্যাপ্ত পানি পান করুন
শীতকালেও নিয়মিত পানি পান করা জরুরি। তৃষ্ণা কম পেলেও শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি পান করুন।
পানির পাশাপাশি ফল, শাকসবজি, স্যুপ ও অন্যান্য পানিসমৃদ্ধ খাবার খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন।
৩. মধু ব্যবহারে সতর্ক থাকুন
মধু নিয়ে অনেক ঘরোয়া পরিচর্যার পরামর্শ প্রচলিত রয়েছে। তবে ঠোঁট ফাটার চিকিৎসায় মধু পেট্রোলিয়াম জেলির চেয়ে ভালো—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
মধু ব্যবহার করলে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হচ্ছে কি না খেয়াল রাখুন। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিচর্যা হিসেবে সুগন্ধিমুক্ত পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করাই ভালো।
৪. ঠোঁট কামড়ানো বন্ধ করুন
ঠোঁটের শুকনো চামড়া দাঁত দিয়ে কামড়ানো বা হাত দিয়ে টেনে তোলা উচিত নয়। এতে ঠোঁটে ক্ষত তৈরি হতে পারে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
৫. ঘরের আর্দ্রতা বজায় রাখুন
শীতকালে ঘরের বাতাস খুব শুষ্ক হলে হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করতে পারেন। তবে যন্ত্রটি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে, যাতে ছত্রাক ও জীবাণু জমে না যায়।
৬. ঠোঁট পরিষ্কার ও সুরক্ষিত রাখুন
ঠোঁটে ধুলাবালি বা প্রসাধনীর অবশিষ্টাংশ জমে থাকলে পরিষ্কার পানি দিয়ে আলতোভাবে পরিষ্কার করুন। ঘষাঘষি বা শক্ত ব্রাশ ব্যবহার করবেন না।
ঠোঁটের ওপরের মৃত চামড়া নিজে থেকে উঠে যেতে দিন। ফাটা অবস্থায় স্ক্রাব ব্যবহার করলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
ঠোঁট ফাটার ক্রিম কোনটি ব্যবহার করবেন?
ঠোঁট ফাটলে এমন লিপবাম বা ময়েশ্চারাইজিং অয়েন্টমেন্ট ব্যবহার করা উচিত, যা ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং ত্বকে জ্বালাপোড়া তৈরি করে না।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, নিচের উপাদানগুলো রয়েছে এমন পণ্য বেছে নিতে পারেন।
উপাদান
উপকারিতা
Petroleum Jelly
ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখে
Shea Butter
ঠোঁটের শুষ্কতা কমাতে সাহায্য করে
Ceramide
ত্বকের সুরক্ষামূলক স্তর বজায় রাখতে সাহায্য করে
Dimethicone
ঠোঁটের ওপর সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে
Mineral Oil
আর্দ্রতা হারানো কমায়
Beeswax
ঠোঁটের ওপর সুরক্ষামূলক আবরণ তৈরি করে
কোন ধরনের ক্রিম বা লিপবাম বেছে নেবেন?
সুগন্ধিমুক্ত (Fragrance-free) পণ্য।
অ্যালার্জি হওয়ার ঝুঁকি কম এমন পণ্য।
পেট্রোলিয়াম জেলিভিত্তিক অয়েন্টমেন্ট।
বাইরে ব্যবহারের জন্য SPF ৩০ বা তার বেশি রয়েছে এমন লিপবাম।
মেনথল, ক্যাম্ফর, ইউক্যালিপটাস, পুদিনা, সুগন্ধি এবং স্যালিসাইলিক অ্যাসিডযুক্ত লিপবাম ঠোঁটের শুষ্কতা ও জ্বালাপোড়া বাড়াতে পারে। তাই ঠোঁট ফাটা অবস্থায় এসব উপাদান এড়িয়ে চলা ভালো।
ঠোঁট ফাটার ওষুধ কী?
সাধারণ শীতকালীন ঠোঁট ফাটার জন্য সাধারণত আলাদা কোনো ওষুধের প্রয়োজন হয় না। নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার বা পেট্রোলিয়াম জেলি ব্যবহার করলেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা কমে যায়।
তবে ঠোঁটের ফাটল দীর্ঘস্থায়ী হলে বা ঠোঁটের দুই কোণে ক্ষত তৈরি হলে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
যেমন:
অ্যালার্জিজনিত সমস্যা: কোন প্রসাধনী বা উপাদান থেকে অ্যালার্জি হচ্ছে, তা শনাক্ত করে এড়িয়ে চলতে হয়।
ছত্রাকের সংক্রমণ: চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম দিতে পারেন।
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ: নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক ক্রিম প্রয়োজন হতে পারে।
ভিটামিন বা আয়রনের ঘাটতি: পরীক্ষা করে ঘাটতি নিশ্চিত হলে প্রয়োজনীয় সাপ্লিমেন্ট দেওয়া হয়।
নিজে থেকে স্টেরয়েড, অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম ব্যবহার করবেন না। কারণ সব ধরনের ঠোঁট ফাটার চিকিৎসা এক নয়।
ঠোঁট ফাটা ভালো করার দৈনিক পরিচর্যার নিয়ম
শীতকালে ঠোঁট ভালো রাখতে প্রতিদিন একটি সহজ পরিচর্যার রুটিন অনুসরণ করতে পারেন।
সময়
কী করবেন
সকালে
মুখ ধোয়ার পর পেট্রোলিয়াম জেলি লাগান
বাইরে যাওয়ার আগে
SPF ৩০ বা বেশি যুক্ত লিপবাম ব্যবহার করুন
দুপুরে
খাবারের পর আবার লিপবাম লাগান
বিকেলে
ঠোঁট শুষ্ক লাগলে পুনরায় ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন
রাতে
ঘুমানোর আগে একটু পুরু করে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগান
বাইরে থাকলে প্রতি দুই ঘণ্টা পর এবং খাবার বা পানীয় গ্রহণের পর প্রয়োজন অনুযায়ী লিপবাম আবার ব্যবহার করুন।
ঠোঁট গোলাপি করার উপায় কী?
অনেকেই শীতকালে ঠোঁট ফাটার পাশাপাশি ঠোঁটের স্বাভাবিক রং ধরে রাখতে চান। কেউ কেউ ঠোঁট কালচে হয়ে গেলে গোলাপি করার বিভিন্ন ঘরোয়া পদ্ধতি খোঁজেন।
তবে প্রথমে একটি বিষয় জানা প্রয়োজন। সবার ঠোঁটের স্বাভাবিক রং এক নয়। বংশগত বৈশিষ্ট্য, ত্বকের রং, মেলানিনের পরিমাণ এবং অন্যান্য কারণে ঠোঁটের রং ভিন্ন হতে পারে। তাই সবার ঠোঁট গোলাপি করার কোনো নিশ্চিত বা স্থায়ী পদ্ধতি নেই।
তবে কিছু অভ্যাস ঠোঁটকে সুস্থ রাখতে এবং শুষ্কতা বা জ্বালাপোড়াজনিত কালচে ভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে।
১. নিয়মিত লিপবাম ব্যবহার করুন
ঠোঁট শুষ্ক থাকলে তা ফেটে যেতে পারে এবং প্রদাহের কারণে রং পরিবর্তিত হতে পারে। নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি বা উপযুক্ত লিপবাম ব্যবহার করলে ঠোঁটের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় থাকে।
২. সূর্যের আলো থেকে ঠোঁট রক্ষা করুন
সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি ঠোঁটের রং গাঢ় করতে পারে। তাই বাইরে যাওয়ার আগে SPF ৩০ বা তার বেশি যুক্ত লিপবাম ব্যবহার করুন।
৩. ধূমপান এড়িয়ে চলুন
ধূমপানের কারণে ঠোঁটের স্বাভাবিক রং ও ত্বকের স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ঠোঁট সুস্থ রাখতে ধূমপান পরিহার করা ভালো।
৪. ঠোঁটে লেবু বা বেকিং সোডা ব্যবহার করবেন না
অনেকে ঠোঁট গোলাপি করার জন্য লেবুর রস, বেকিং সোডা কিংবা বিভিন্ন ধরনের স্ক্রাব ব্যবহার করেন। কিন্তু এসব উপাদান ঠোঁটের সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া, প্রদাহ ও ক্ষত তৈরি করতে পারে। ফলে ঠোঁটের রং আরও গাঢ় হতে পারে।
৫. পুষ্টিকর খাবার খান
ফলমূল, শাকসবজি, ডিম, মাছ, বাদাম ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস করুন। শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি বজায় থাকলে ত্বক ও ঠোঁটের স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
ঠোঁট হঠাৎ কালচে হয়ে গেলে, দীর্ঘদিন রং পরিবর্তিত থাকলে বা ক্ষত তৈরি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
শীতকালে ঠোঁট ফাটা প্রতিরোধের ১০টি কার্যকর উপায়
ঠোঁট ফেটে যাওয়ার পর চিকিৎসা করার চেয়ে আগে থেকেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া ভালো। বিশেষ করে শীতকালে নিচের অভ্যাসগুলো অনুসরণ করলে ঠোঁটের শুষ্কতা ও ফাটার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
১. দিনে কয়েকবার সুগন্ধিমুক্ত লিপবাম ব্যবহার করুন।
২. ঘুমানোর আগে ঠোঁটে পেট্রোলিয়াম জেলি লাগান।
৩. পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
৪. ঠোঁট বারবার জিভ দিয়ে ভেজানো বন্ধ করুন।
৫. ঠোঁটের শুকনো চামড়া টেনে তুলবেন না।
৬. বাইরে গেলে ঠোঁট ঢেকে রাখুন।
৭. SPF ৩০ বা বেশি যুক্ত লিপবাম ব্যবহার করুন।
৮. অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত ও জ্বালাপোড়া তৈরি করে এমন প্রসাধনী এড়িয়ে চলুন।
৯. পুষ্টিকর খাবার খান এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
১০. দীর্ঘদিন ঠোঁট ফাটা বা ঠোঁটের কোণে ক্ষত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
এই অভ্যাসগুলো নিয়মিত মেনে চললে শীতের শুষ্ক আবহাওয়ায় ঠোঁটের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ও সুরক্ষা বজায় রাখা সহজ হবে।
ঠোঁট ফাটা নিয়ে প্রশ্ন ও উত্তর (FAQ)
১. ঠোঁট ফাটে কোন ভিটামিনের অভাবে?
ভিটামিন বি২, বি৩, বি৬ ও বি১২-এর ঘাটতির সঙ্গে ঠোঁটের প্রদাহ এবং মুখের কোণে ফাটলের সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া আয়রন ও জিঙ্কের ঘাটতিও কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে। তবে ঠোঁট ফাটার একমাত্র কারণ ভিটামিনের অভাব নয়।
২. শীতকালে ঠোঁট বেশি ফাটে কেন?
শীতকালে বাতাসের আর্দ্রতা কমে যায় এবং ঠান্ডা বাতাস ঠোঁটের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়। ঠোঁটে তেল উৎপাদনকারী গ্রন্থি না থাকায় এ সময় ঠোঁট দ্রুত শুষ্ক ও ফাটা হয়ে যায়।
৩. ঠোঁট ফাটা দূর করার সবচেয়ে ভালো উপায় কী?
দিনে কয়েকবার সুগন্ধিমুক্ত পেট্রোলিয়াম জেলি বা ভালো মানের লিপবাম ব্যবহার করা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ঠোঁট চাটা বন্ধ করা সবচেয়ে কার্যকর সাধারণ পরিচর্যার উপায়।
৪. ঠোঁট ফাটলে ভ্যাসলিন ব্যবহার করা যাবে?
হ্যাঁ। সাদা পেট্রোলিয়াম জেলি বা ভ্যাসলিন ঠোঁটের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে রাতে ঘুমানোর আগে ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যেতে পারে।
৫. ঠোঁট ফাটার জন্য কোন ক্রিম ভালো?
পেট্রোলিয়াম জেলি, সিরামাইড, শিয়া বাটার বা ডাইমেথিকনযুক্ত সুগন্ধিমুক্ত লিপবাম ব্যবহার করতে পারেন। বাইরে যাওয়ার সময় SPF ৩০ বা বেশি যুক্ত লিপবাম বেছে নেওয়া ভালো।
৬. ঠোঁট ফাটলে কি ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে হবে?
না, শুধু ঠোঁট ফাটার কারণে ভিটামিন ট্যাবলেট খাওয়ার প্রয়োজন নেই। পরীক্ষায় কোনো ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি ধরা পড়লে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা উচিত।
৭. ঠোঁট গোলাপি করার ঘরোয়া উপায় কী?
ঠোঁটের স্বাভাবিক রং ধরে রাখতে নিয়মিত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার, সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষা এবং ধূমপান পরিহার করা ভালো। লেবু বা বেকিং সোডার মতো জ্বালাপোড়া তৈরি করতে পারে এমন উপাদান ব্যবহার করবেন না।
৮. ঠোঁটের দুই পাশে বারবার ফাটে কেন?
ঠোঁটের দুই পাশে বারবার ফাটাকে অ্যাঙ্গুলার চিলাইটিস বলা হতে পারে। এর পেছনে লালার সংস্পর্শ, ছত্রাক বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ, আয়রন ও ভিটামিনের ঘাটতি কিংবা ত্বকের প্রদাহ কাজ করতে পারে।
৯. ঠোঁট ফাটা ভালো হতে কত দিন লাগে?
সাধারণ শুষ্কতার কারণে ঠোঁট ফাটলে নিয়মিত পরিচর্যায় কয়েক দিন থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে উন্নতি হতে পারে। তবে সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বারবার ফিরে এলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
১০. ঠোঁট ফাটলে কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে?
ঠোঁট অতিরিক্ত ফুলে গেলে, লাল হয়ে ব্যথা করলে, পুঁজ বা সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিলে কিংবা দীর্ঘদিনের ক্ষত না শুকালে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। বিশেষ করে ঠোঁটের নিচের অংশে দীর্ঘস্থায়ী খসখসে, শক্ত বা না-শুকানো ক্ষত অবহেলা করা উচিত নয়।
উপসংহার
শীতকালে ঠোঁট ফাটা একটি সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা ব্যথা, জ্বালাপোড়া, ক্ষত এমনকি রক্তপাতের কারণ হতে পারে। তাই শীত শুরু হওয়ার আগেই ঠোঁটের যত্ন নেওয়া প্রয়োজন। নিয়মিত পেট্রোলিয়াম জেলি বা উপযুক্ত লিপবাম ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান, ঠোঁট চাটা বন্ধ করা এবং সূর্যের আলো থেকে সুরক্ষা ঠোঁট সুস্থ রাখতে সাহায্য করে।
ঠোঁট ফাটার পেছনে ভিটামিন বা খনিজের ঘাটতি, অ্যালার্জি কিংবা অন্য কোনো রোগ রয়েছে কি না, সেটিও প্রয়োজন অনুযায়ী যাচাই করতে হবে। নিজে থেকে ওষুধ বা ভিটামিন সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ না করে সমস্যার কারণ বুঝে চিকিৎসা নেওয়াই ভালো।