ওথ অফ হিপোক্রিটাস ও একটি ভালোবাসার গল্প

প্রকাশিত: ১:৫২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৪, ২০২০

রাজীব উল আহসান :
“চাকরি ছাড়বে, নাকি আলাদা থাকবে? তোমার চয়েজ। আমার যা বলার ছিল বলে দিয়েছি। ব্যাস! এটাই ফাইনাল”।

এটুকু বলে রনি পাশের রুমে চলে গেল। সাথে করে নিয়ে গেল একমাত্র মেয়ে মুনিয়াকে। পাশের রুম থেকে বাবা মেয়ের খুনসুটি ভেসে আসছে সুমির কানে। হিহি করে হাসছে মেয়েটা। রনিও সমানভাবে তাল মেলাচ্ছে মুনিয়ার সাথে। সবকিছুই যেন স্বাভাবিক। যেন কিছুই হয়নি এবাড়িতে। কোন ঝগড়া হয়নি! হয়নি কোন মানভিমান। কিম্বা হলেও সেটার আঁচ যেন অন্য কাওকে ছুঁয়ে যায়নি। তাহলে মিছেমিছি সুমি কেন নিজেনিজে দগ্ধ হচ্ছে বারবার?

মুনিয়ার হাসি আবার কানে আসতেই সুমির চোখে জল নামলো।

মেয়েটা একেবারে বাবার ন্যাওটা হয়েছে। রনির চেহারাও পেয়েছে হুবহু। সুমির ছিটেফোঁটাও পায়নি মেয়েটা। স্বভাবেও রনির মত হয়েছে। মা বাবার রাগ অভিমানে নির্ধিধায় বাবার পক্ষ নেয় ছয় বছরের মুনিয়া। মেয়ের উপর তাই রাগ হয় সুমির। কিছুটা হাহাকার এসে গ্রাস করে বোধহয়। একাকিত্বে মুষড়ে যায় নিজের মধ্যে।

তবু মাঝরাতের এ ঝগড়া আর বাড়তে দেয়না সুমি। নিশ্চুপ থাকে। এছাড়া আর কি’ইবা করার আছে তার। রনির কথার পাল্টা উত্তর যে তার জানা নেই, সেটা নয়। ইচ্ছে করলেই জবাব দিতে পারে সুমি। তবু নিশ্চুপ থাকে সুমি। কী হবে এই মধ্যরাতে ঝগড়ার ডালপালা গজিয়ে! রনিতো তার ফাইনাল কথা বলেই দিয়েছে। এরপর কি আর কোন কথা থাকতে পারে?

ড্রইংরুম থেকে এসে বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে সুমি। চারিদিকে শুনশান অন্ধকার। রাতের আকাশটাও মেঘলা হয়ে আছে। কখন ঝুমঝুম করে বৃষ্টি নামে তার ঠিক নেই। ঠিক যেন সুমির মনের মত অবস্থা। অন্ধকার আকাশে তবু আশার প্রদীপ হয়ে কতক তারা মিটিমিট করে আলো জ্বেলে চলছে। কিন্তু সুমির মন যেন অচেনা কোন কৃষ্ণগহবরে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। যেখানে শুধুই অন্ধকার আর অন্ধকার।

মানসিকভাবে উদভ্রান্ত সুমি ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। এলিয়ে দেয়া কপালে মাধবিলতা এসে ছুঁয়ে দেয় সুমিকে। চমকে উঠে সুমি। অথচ বারান্দার টবে মাধবিলতা সুমি নিজের হাতেই লাগিয়েছে।

একটু ধাতস্থ হতেই মাধবিলতার সুবাস নাকে এসে বাড়ি খায় সুমির। মাধবিলতার ঝাড়ে থোকায় থোকায় ফুল ফুটে আছে। ফুলের গন্ধে মাতাল হওয়ার মত অবস্থা সুমির।

মাধবীলতার গন্ধে ভাবনায় জড়িয়ে যায় সুমি। কত কিছুই মনে পড়ে যায় ওর। সবকিছুই যেন তার মনের মানসপটে ভেসে উঠে কোন ডুবো চরের মত।

এই তো ক’দিনের কথা!
সুমি আর রনি মেডিকেলে পড়তো। একই ব্যেচের স্টুডেন্ট তারা। এমনিতে সুমি চীরচেনা মুখচোরা স্বভাবের। গলায় স্টেথেস্কোপ আর পড়নে এপ্রোন জড়িয়ে আটপৌড়ে সুমি যেদিন ক্যাম্পাসে এসেছিল, সেদিন কোন ছেলের সাথে কথা বলা দূরে থাক কারো চোখের দিকেই ভালো করে তাকাতে সাহস করেনি সুমির। কিন্তু কিভাবে যেন কদিনেই বিপরীত মেরুর রনির সাথেই জমে গেল সে।

ক্লাসের ফাঁকে দু’জনে একদিন বসেছিল ফিজিওলজি ল্যাবের বারান্দায়। খোসগল্পে একটু নির্ভার হতে চেয়েছিল রনি। কিন্তু সুমি আবদার করেছিল রনির কাছে, মাধবীলতা ফুল এনে দাও প্লিজ।

সুমির কথায় রনি হা করে তাকিয়ে ছিল।

আশ্চর্য হয়েছিল সুমি, কারন রনি নাকি মাধবীলতা চেনে না!

অথচ ফিজিওলজি বিল্ডিংয়ের কার্নিশে সে সময় মাধবীলতা ঝুলছিল। হালকা বৃষ্টির ছাটে লাল-গোলাপী-সাদা মাধবীলতা ফুলের থোকাগুলো ভিজেছিল। আর হালকা বাতাসে দুলছিল।
রনির কথায় সুমির চোখ জলে ভরে এসেছিল সেদিন।

রনি বলেছিল, কাঁদছো কেন?
রনির প্রশ্নের কোন জবাব দেয়নি সুমি।

কিন্তু রনি ঠিকি বুঝতে পারে সুমির কান্নার কারন। হো হো করে হেসে উঠে রনি। সুমির চিবুকে আলতো করে ধরে বলে, মাধবীলতার জন্য কাঁদছো? ঠিক আছে! শুধু ফুল নয়। আমি তোমার জন্য মাধবীলতার আস্ত গাছ এনে দেব! এত বড় গাছ যে তুমি দোল খেতে পারবে।

সুমি লজ্জা পেয়ে রনির হাত সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, যাও! তোমার যত আদিখ্যেতা।

রনি বলেছিল, হুম, মোটেও আদিখ্যেতা নয়। সত্যিই তোমাকে আমি মাধবিলতার গাছ এনে দেবো। সেই মাধবীলতায় দুলে দুলে তুমি গাইবে “সেদিন দুজনে দুলেছিনু বনে…….”
রনির বেসুরো রবিন্দ্রসংগীতে সুমি কান্নাভুলে হেসে উঠেছিল সেদিন।

তবে সত্যিই রনি তার কথা রেখেছে। বাড়ির সামনের ছোট্ট লনটা ভরিয়ে দিয়েছে সুমির পছন্দের বিভিন্ন ফুলের গাছ দিয়ে।

রনি বলেছিল, তুমি কেন ডাক্তার হলে সুমি? ডাক্তারি তোমার রক্তে নেই। তোমার রক্তে আছে গাছ আর গাছ। তবে বেশির ভাগ গাছই মনে হয় চিরতা বর্গের হবে। নিদেনপক্ষে নিম বর্গের তো হবেই! দেখতে স্নিগ্ধ, কিন্তু খুব তিক্ত স্বাদ।

রনির কটু কথায় ক্ষেপে যেত সুমি।

রেগেমেগে হোস্টেলের পথ ধরতো।

তখন রনি গিয়ে পথ আগলে বলতো, সরি, সরি, সরি, মিস জগদীশ চন্দ্র বসু। এই কানে ধরছি। নাক মলছি। আর আজেবাজে কথা বলবো না।
সুমি বলতো, পথ ছাড়ো। দেরি হয়ে যাচ্ছে। হোস্টেলের গেট কিন্তু বন্ধ হয়ে যাবে। তখন?

রনি বলেছিল, আমিতো সেটাই চাই!

কী? সুমি যেন বিষম খায়!

রনি হাসতে হাসতে বলেছিল, আচ্ছা! এখন হোস্টেলে যাবে তো যাও। কিন্তু যে’দিন আমার ঘরে যাবে সে’দিন থেকে আর একদিনও তোমাকে ছাড়া থাকতে পারবো না কিন্তু। মনে রেখো কথাটা!

হুম। সুমির সব কথা মনে আছে। অথচ কি অবলীলায় রনি বলে ফেললো, “ঘর ছাড়তে!”
রনির কি তবে কিছুই মনে নেই?রনি কি সব ভুলে বসে আছে?

বারান্দায় বসে সুমি এসব ভাবছে আর মাধবীলতাকে ছুঁয়ে দিচ্ছে। মাধবীলতার মত মুক্ত হয়ে দুলতে চায় সুমির মন। এক লাগামহীন উন্মাদনানায় আকাশ ছুঁতে ইচ্ছে হয় সুমির। পরক্ষনেই আবার যেন মাটিতে নেমে এসে ডানা ঝাপটায় উড়তে না পারা পাখির মত।
আসলেই তো! চাইলেই কি আর পারা যায়! সারা পৃথিবী আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। ছোট্ট একটা অনুজীবের কাছে আজ সবাই ধরাশায়ী।

এ জন্যই তো রনির আজকের এই আল্টিমেটাম! রনির শেষ কথাগুলো আবার সুমির কানে এসে বিঁধল যেন, “চাকরি ছাড়বে, নাকি আলাদা থাকবে? তোমার চয়েজ। আমার যা বলার ছিল বলে দিয়েছি। ব্যাস! এটাই ফাইনাল”।

সত্যিই সুমির দিন-রাতগুলো কেমন যেন গুমোট লাগছে। ঠিক যেন এনাটমির ডিসেকশন ক্লাসগুলোর মত। ডিসেকশন ক্লাসে সুমির খুব ভয় হত। এই ভয় কাটাতে রনির একটা হাত ধরে রাখতে হত সুমিকে। নিদেনপক্ষে রনির ঘ্রাণ বা নিশ্বাস না পেলে এনাটমি ক্লাসগুলো ভয়ে আর করা হতো না সুমির।

সেই কবে থেকেই তো রনির কাছে নিজেকে সঁপে দিয়েছে সে! সেই ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাসের ঘটনা। প্রফেসর ডাঃ মজিদ স্যার লেকচার নিচ্ছিলেন। পুরো ক্লাস বুদ হয়ে সে লেকচার শুনছে। স্যার ক্লাস শেষ করে বললেন,
আজ তোমাদের একটা বেসিক প্রশ্ন করবো। আশাকরি সবাই পারবে।

পুরো ক্লাস স্যারের প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করছে।
স্যার বললেন, বলো তো “ওথ অফ হিপোক্রিটাস” কি?
কে বলতে পারবে?
কিন্তু ক্লাসে পিনপতন নিরবতা।
স্যার আবার বললেন, কেও পারবে না!
স্যার খুব হতাশ হলেন।
পুরো ক্লাস লজ্জায় চুপ হয়ে আছে। মেডিকেল স্টুডেন্টদের এই “ওথ অফ হিপোক্রিটাস” না জানাটা সত্যিই লজ্জার। সবাই লজ্জায় কুঁকড়ে আছে।

এ সময় পেছন থেকে কে যেন দাঁড়িয়ে তাদেরকে লজ্জা থেকে বাঁচালো।

ছেলেটা আত্নবিশ্বাসী কন্ঠে বলে, হিপোক্রিটাস ওথ হলো–
“অতঃপর আমি শপথ গ্রহণ করছি যে, জেনেশুনে এবং ধর্মত রোগীর ক্ষতি হয় এমন কোনো ওষুধ দেব না। শত্রু-মিত্রভেদে সব রোগীকে সমান মনপ্রাণ দিয়ে চিকিৎসা করব এবং তার মানসিক দুশ্চিন্তা লঘু করার জন্য সব সময় ভরসা দেব”

মুহুর্মুহু করতালিতে মুখরিত হল ক্লাস রুম। সবাই যেন হাফ ছেড়ে বেঁচেগেল।
মজিদ স্যার বললেন, সবাই ওর সাথে একত্রে বল।
আমরা সবাই ছেলেটার সাথে কন্ঠ মেলালাম
“অতঃপর আমি শপথ গ্রহণ করছি যে……….”

সে’দিনের সেই ছেলেটা ছিল রনি। সে’দিন থেকেই তো সুমির রাজ্যে একমাত্র রাজকুমার রনি।
এই তো সেদিনের ঘটনা। মাঝখানে যেন শুধু কয়েকটি বছর কেটেগেছে। চোখ বন্ধ করলে এখনো সুমির কানে বাজে রনির সে আত্নবিশ্বাসী কন্ঠ। ‘হিপোক্রিটাস ওথ হলো……’।
সুমির সব কিছুই মনে আছে। কিছুই ভুলেনে সে।

আসলে সুমি অনেক কিছুই ভুলতে পারে না। ভুলতে পারে না ডাঃ মজিদ স্যারের কথা। কদিন আগেই মজিদ স্যার করোনা আক্রান্ত হলেন। করোনায় চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিজে জীবন দিলেন স্যার। মানবসেবায় আজীবন নিয়োজিত এই মানুষের জন্য মন কেঁদে উঠে সুমির। অথচ তার ছাত্র হয়ে রনি আজ…?

ছি ছি ছি!

সুমি আর কিছুই ভাবতে পারে না।
তবে মাঝেমাঝে রনির কথাই ঠিক মনে হয় সুমির কাছে। সব ছেড়ে ছুঁড়ে ঘরে বসে নিরাপদ থাকতে ইচ্ছে করে সুমির। নিজের সন্তানের সুরক্ষার জন্য, রনির সুরক্ষার জন্য, পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য এ ভাবনা কি দোষের?

কিন্তু না, তা কী করে সম্ভব?
সুমি যেন নিজেকেই প্রশ্ন করে। আবার সে প্রশ্নের উত্তর নিজেই খুঁজে নেয়। একজন ডাক্তার হয়ে এমন সময় যদি দেশের সেবা না করতে পারে তাহলে কিসের ডাক্তার সে?

কিন্তু রনি?

রনি তাহলে এভাবে ভাবছে না কেন?

রনি নিজে ডাক্তার। সে নিজে বড় একটা হাসপাতালে কর্মরত আছে। তার কি দায় নেই দেশের প্রতি?

সুমি যেন বেহিসেবি হিসেবের কোন জটিল অংক মেলাতে থাকে। কিন্তু পারেনা। জটিল গানিতিক মারপ্যেচে সহজ সমীকরণগুলো দুর্বোধ্য মনে হয় তার।

এসব ভাবতে ভাবতে অনেক রাত হয়ে গেল।
রাতে রাগ কমলো না রনির। সুমির উপর রাগ দেখিয়ে মেয়েকে নিয়ে আলাদা বিছানায় ঘুমিয়ে গেল সে।

এটা সুমির জন্য রনির একটা প্রিয় শাস্তি। যখন কোন কিছু নিয়ে রাগ হয় তখনি সুমিকে এই শাস্তিতে ঘায়েল করতে চায় রনি। সুমিও প্রতিবার হার মানে রনির কাছে। আসবে না, আসবে না করেও রনির কাছে চলে আসে। আসলে সুমি হার মানে ওর ভালোবাসার কাছে। এ পরাজয়ে বিন্দুমাত্র গ্লানীবোধ করেনা সুমি।

কিন্তু আজ!

আজ সুমির মন আনেক বিষন্ন। সুমি আজ প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কী যেন এক প্রচন্ডতায় মনকে সে শান্ত করে। না, আজ সে যাবেনা বাপ-মেয়ের কাছে! নিজেকে কেন যেন অপাংতেয় মনে হয় সুমির।

বারান্দায় মাধবীলতার নিবিড় আশ্রয়ে চোখ বুজে আসে সুমির।
ঠিক তখনি যেন স্বপ্নটা দেখতে পায় সুমি। প্রফেসর ডাঃ মজিদ স্যার লেকচার নিচ্ছেন।
স্যার বললেন, বলোতো “ওথ অফ হিপোক্রিটাস” কি?
আশ্চর্য! সুমি কিছুতেই মনে করতে পারছে না। পুরো ক্লাস যেন তাচ্ছিল্যভরে তাকিয়ে আছে সুমির দিকে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে সুমির।
তখন প্রফেসর ডাঃ মজিদ অন্য একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, বলোতো “ওথ অফ হিপোক্রিটাস” কি?
কিন্তু সে ছেলেটাও বলতে পারলো না। এভাবে আরো কয়েকজনকে বলতে বললেন, কিন্তু কেও বলতে পারলো না।
এসময় পেছন থেকে কে যেন বললো

” হিপোক্রিটাস ওথ হলো…”
সুমি আড়চোখে পিছন ফিরে তাকায়। কিন্তু ছেলেটার মুখ দেখতে পাচ্ছে না সে। শুধু কন্ঠ শুনতে পাচ্ছে। কি ভরাট পুরুষলী কন্ঠ। পুরো ক্লাসরুম যেন গমগম করে উঠলো।
একসময় ক্লাস শেষ হলো। ক্লাস থেকে সবাই বের হয়ে যাচ্ছে। শুধু সুমি যাচ্ছে ছেলেটার পিছুপিছু।

হঠাৎ ছেলেটা পিছু ফিরে তাকায়।
তখন সুমি চিনে ফেলে ছেলেটাকে।
এ যে রনি!
ফাস্ট ইয়ারের রনি। ফিনফিনে গোঁফ, ভাংগা চোয়াল, লম্বা চুল। পরনের কালো টিশার্টে লেপ্টে আছে চে’গুয়েভারা। কাঁধের উপর অনাদরে পরে আছে সাদা ময়লা এপ্রোন।
সুমি এগিয়ে এসে রনির হাত ধরে ফেলে।
সুমি বলে, রনি! তুমি তো ভেতরে-বাহিরে এমনটাই ছিলে। এমনটাই থাকতে পারো না সারাজীবন?
রনি হাসে।
সুমি ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে।
রনি তখন সুমির হাত ধরে ফেলে বলে, আমি তো তেমনি আছি সুমি!
না, তুমি অনেক বদলে গেছ।
না, সুমি। আমি বদলাই নি। এই দেখ। তোমার জন্য কী এনেছি!

সুমি তাকিয়ে দখে, রনির হাতে অনেকগুলো মাধবীলতা। রনি যেন বাগানসুদ্ধ মাধবিলতা তুলে এনেছে। রনি ফুলগুলো সুমির দিকে এগিয়ে দিল।
রনি বললো, দেখলে, আমি একটুও বদলাইনি! এই নাও তোমার প্রিয় ফুল।

সুমি দু’হাত বাড়িয়ে ফুলগুলো হাতে তুলে নিল।

ঠিক তখনি সুমির ঘুম ভেঙে গেল। বারান্দার রেলিংএ ঠেস দিয়ে বসে আছে সে। বারান্দার মাধবীলতাগুলো সুমির কপালের কাছে চুমু খাচ্ছে।

স্বপ্নে রনির দেয়া ফুলের সাথে এ ফুলগুলোর পার্থক্য করতে পারে না সুমি। সেই ফুল!
সেই ঘ্রাণ!
শুধু রনি পাশে নেই!
সুমিকে ফেলে পাশের রুমে সে ঘুমাচ্ছে।

ঠিক তখনি সুমি সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললো। না, সে চাকরি ছাড়বে না। সে মানুষকে সেবা দিবে। কেন পিছপা হবে সে? যে প্রতিজ্ঞা করে সে এ পেশায় এসেছে সেই প্রতিজ্ঞা সে কোনদিন ভাঙবে না।

পরদিন খুব সকালে সুমি একটা ব্যাগ গুছিয়ে নেয়। দরকারি জিনিসপত্র আর কয়েকসেট পোষাক নিয়ে বের হয় সে। সোজা চলে যায় হাসপাতালে। সকাল আটটায় তার ডিউটি শুরু।

সারাদিন নিজের ওয়ার্ডে কাজ করে সুমি। রেস্ট নেবার ফুসরত পায় না কোন। মাস্ক, গগজ, আর পিপিই পরিহিত সুমি এপ্রিলের এই গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার।

কাজ করতে করতে সুমি ভাবে আজ কাজ শেষে সে কোথায় যাবে সে?

বাসায় যাবে?

নাকি হাসপাতালের হোস্টেলে! ভাবতে ভাবতেই সুমির চোখে জল জমে।

হাতের কাজ শেষ করে বারান্দার করিডোরে একটু দাঁড়ায় সুমি। এসময় একটা ট্রলি নিয়ে কে যেন দ্রুত এসে দাঁড়ায় ওটির সামনে।

লোকটা পাগলের মত চেঁচামেচি করছে।
পিছন ফিরে তাকায় সুমি।
সুমি এক দেখাতেই চিনতে পারে লোকটাকে।
আরে এ তো রনি!
রনি পাগলের মত চিৎকার করছে কেন?

রনি বলে” আমার আম্মাকে বাঁচান। আমার আম্মাকে বাঁচান।”

রনি বললো, আমি একজন ডাক্তার। বাথরুমে পড়ে আমার আম্মা মাথায় আঘাত পেয়েছে। প্লিজ দ্রুত অপারেশন করে ব্লিডিং থামাতে হবে।

সার্জারী বিভাগে দৌড়ে এল রনি। এটা সুমির ওয়ার্ড। সুমি দেখল তার শ্বাশুড়ি শুয়ে আছে স্ট্রেচারে। মাথা ফেটে রক্তে একাকার। সুমির বুক ফেটে গেল শ্বাশুড়িকে দেখে। শ্বাশুড়িকে নিয়ে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে চলে গেল সুমি।

মাস্ক, গগলস, আর পিপিই পড়া সুমিকে চিনতে পারে না রনি।
ওটির সামনে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামছে রনি।

রনি প্রথমে গিয়েছিল ওর প্রাইভেট হাসপাতালে। ম্যানেজারকে ফোন দিয়েছিল। ম্যানেজার বললো, হাসপাতাল তো অনেক দিন হলো বন্ধ। ওটি চালু করতে করতে অনেক সময় লাগবে। এছাড়া নার্স, ওয়ার্ড বয় সবাই ছুটিতে। রনি আর এক মুহুর্ত দেরি করে না। চলে আসে এই সরকারি হাসপাতালে।

ঘন্টা খানেক পর অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে আসে সুমি। দেখে রনি নত হয়ে মেঝেতে বসে আছে।
সুমি বলে, ডক্টর রনি, আপনার আম্মা আউট অব ডেঞ্জার। তবে সাতটি স্টীচ লেগেছে।
রনি ভাঙা গলায় বললো, ধন্যবাদ আপনাকে।
সুমি বললো, আপনার কিন্তু রিস্ক থেকেই যাচ্ছে রনি সাহেব। মানে এভাবে মাস্ক, গ্লাভস ছাড়া আপনি বের হয়ে এসেছেন। যে কোন সময় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারেন আপনি।

অপ্রস্তুত হয়ে রনি বললো, আসলে খুব দ্রুত চলে এসেছি। সবকিছুই কেমন যেন খুব দ্রুত ঘটে গেল। আমার হাসপাতাল বন্ধ। অথচ আমার আম্মা…।

বলতে বলতে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে রনি।

কান্না থামিয়ে রনি আবার বলে,
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ ডক্টর……..

জি, আমি ডক্টর সুমি। সুমি তার মাস্ক আর গগলস খুলে ফেলল।
খুব ধাক্কা খেল রনি। চমকে উঠে বললো, সুমি? তুমি ?

হুম আমি। এই ওয়ার্ডে যে আমি কাজ করি সেটাও তুমি ভুলে গেছ?

সুমির কথায় লজ্জিত হয় রনি। তাইতো! এ বিপদে সুমির কথা একবারো মনে হয়নি তার! অথচ সুমিই কিনা সবার আগে এগিয়ে এল। রনির ভাবনায় ছেদ পড়ে সুমির কথায়।

রনি বলে, হুম, এটাতো তোমার ওয়ার্ড। আম্মার অসুখে আসলে কিছুই মনে করতে পারি নি আমি। খুব আপসেট হয়ে গিয়েছিলাম।

রনির কথায় সুমি মৃদু হাসে। বলে, তোমার মা ভাগ্যবান রনি। তার ছেলে ডাক্তার। তাই ভালো চিকিৎসা পেয়েছে। কিন্তু যাদের কেও নেই তাদের কথা কখনো ভেবেছো রনি?

সুমির প্রশ্নে কোন জবাব খুঁজে পায় না রনি। রনিকে পাত্তা না দিয়ে আবার মাস্ক আর গগজ পড়ে ওয়ার্ডে ঢুকতে উদ্যত হল সুমি।

রনি পথ আগলে দাঁড়াল, আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিও সুমি।

চোখের গগলস এডজাস্ট করে রনিকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল সুমি। রনিকে ক্ষমা করে দিল কিনা বোঝা গেল না।
সুমি চলে গেল।

বারান্দার করিডোরে পড়ে রইলো রনি।
হঠাৎ ওটির দেয়ালে সাটানো একটা ব্যানারে চোখ আটকে গেল রনির।
ঝাঁপসা চোখে ব্যানারে চোখ বুলিয়ে নেয় রনি। পরিচিত শব্দগুলো কেমন কেমন অপরিচিত মনে হয় দীর্ঘ দিনের অনভ্যস্থতায়। কিম্বা দীর্ঘ দিনের অযত্ন অবহেলায়।

সেখানে লেখা
‘দ্যা ওথ অফ হিপোক্রিটাস’
‘অতঃপর আমি শপথ গ্রহণ করছি….. জন্য সব সময় ভরসা দেব’।

রনির নিজের উপর খুব ঘৃনা হচ্ছে।
আত্নগ্লানীতে কুঁকড়ে যেতে থাকে নিজের মধ্যে। এভাবে মিনিট পাঁচেক চলে যায়।
চোয়ালবদ্ধ সিদ্ধান্তে আবার ঘুরে দাঁড়ায় রনি।
হঠাৎ বৃষ্টিস্নাত রোদের মত রনির চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকে।
রনির এ অশ্রু লজ্জার।
এ অশ্রু প্রতিজ্ঞা-ভাঙ্গা প্রতিজ্ঞার।

——————
উৎসর্গঃ দেশের এ ক্রান্তিলগ্নে চিকিৎসা সেবায় নিয়োজিত সকল বীর ভাই-বোনদের।
রাজীব উল আহসান
রচনাকাল ২৫. ৪.২০