২০২৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফলে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ২০০৮ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুম B.O.A.T ভোটে প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল ফুটবল ইতিহাসে ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুমগুলোর মধ্যে কোনটিকে সমর্থকেরা সর্বকালের সেরা মনে করেন, তা নির্ধারণ করা। তবে ফলাফল ঘোষণার পর আলোচনায় এসেছে ভোট দেওয়ার পদ্ধতি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৫ হাজার ৯ জনেরও বেশি ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৪ জন ১০ থেকে ২৬ বার, ৩০০ জন ৫ থেকে ৯ বার এবং ৪ হাজার ৬৬৫ জন ২ থেকে ৪ বার ভোট দিয়েছেন। প্রতিটি ভোটের মূল্য ছিল ১ ইউরো।
B.O.A.T-এর পূর্ণরূপ হলো ‘Ballon d’Or Of All Time’। ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বিশেষ উদ্যোগ চালু করা হয়। এর মাধ্যমে ফুটবলপ্রেমীদের সামনে একটি ব্যতিক্রমী প্রশ্ন রাখা হয়—ব্যালন ডি’অর জয়ী তারকাদের কোন মৌসুমটি ইতিহাসের সেরা? এখানে কোনো খেলোয়াড়ের পুরো ক্যারিয়ারকে এককভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি; বরং তাঁর ব্যালন ডি’অর জেতা নির্দিষ্ট একটি মৌসুমকে বিবেচনা করা হয়েছে। অন্তত দুবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, এমন ১০ জন কিংবদন্তি ফুটবলারের বিভিন্ন পুরস্কারজয়ী মৌসুম ভোটের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। ফলে এটি ছিল অতীতের সেরা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স নিয়ে সমর্থকদের মতামত জানার একটি বিশেষ আয়োজন।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, B.O.A.T প্রচলিত ব্যালন ডি’অরের মতো আলাদা কোনো আনুষ্ঠানিক ট্রফি নয়। ব্যালন ডি’অরের মূল পুরস্কার সাধারণত নির্ধারিত বিচারক ও সাংবাদিকদের ভোটের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, B.O.A.T-এর ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে সমর্থকদের অনলাইন ভোটের মাধ্যমে। অর্থাৎ, এর মূল লক্ষ্য ছিল ফুটবলপ্রেমীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা এবং বিভিন্ন যুগের সেরা মৌসুম নিয়ে তাঁদের পছন্দ তুলে ধরা। এই স্বীকৃতি জেতার ফলে রোনালদোর ব্যালন ডি’অরের সংখ্যা বাড়েনি; বরং তাঁর ২০০৮ সালের পারফরম্যান্স এই বিশেষ জনমতভিত্তিক প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে।
এই ভোটে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুম প্রথম হওয়ার পেছনে তাঁর অসাধারণ পারফরম্যান্স বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন তিনি ইংলিশ ক্লাব ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে খেলতেন। ২০০৭-০৮ মৌসুমে ক্লাবটির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৪২টি গোল করেন পর্তুগিজ তারকা। তাঁর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড প্রিমিয়ার লিগ ও উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জেতে। পাশাপাশি, প্রিমিয়ার লিগে ৩১ গোল করে তিনি ইউরোপীয় গোল্ডেন শুও অর্জন করেন। এসব সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো ব্যালন ডি’অর জেতেন রোনালদো। পরবর্তী সময়ে তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় মৌসুম হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
B.O.A.T ভোটে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন লিওনেল মেসির ২০১২ সালের মৌসুম। ওই বছরে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৯১টি গোল করে ফুটবল ইতিহাসে অনন্য রেকর্ড গড়েছিলেন আর্জেন্টাইন তারকা। তবু সমর্থকদের ভোটে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুমের পেছনে থাকতে হয়েছে তাঁকে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে রোনালদোর ২০১৭ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী মৌসুম। চতুর্থ স্থানে মেসির ২০২৩ সালের মৌসুম এবং পঞ্চম স্থানে রোনালদোর ২০১৬ সালের মৌসুম রয়েছে। প্রথম পাঁচটি অবস্থানের মধ্যে রোনালদোর তিনটি এবং মেসির দুটি মৌসুম জায়গা করে নিয়েছে। এই ফলাফল দুই তারকার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নতুন করে আলোচনায় এনেছে।
তবে ভোট দেওয়ার পদ্ধতিই এখন এই উদ্যোগের অন্যতম আলোচিত বিষয়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি ভোট দিতে ১ ইউরো খরচ হয়েছে এবং একজন ব্যক্তি একাধিকবার ভোট দিতে পেরেছেন। ৪ হাজার ৬৬৫ জন দুই থেকে চারবার ভোট দিয়েছেন, ৩০০ জন পাঁচ থেকে নয়বার এবং ৪৪ জন ১০ থেকে ২৬ বার পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন। এই হিসাব থেকে বোঝা যায়, একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ ব্যবহার করেছেন। তবে এই সংখ্যাগুলো শুধু একাধিকবার ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের হিসাব; এগুলো মোট ভোটারসংখ্যা বা রোনালদোর পক্ষে পড়া মোট ভোটের সংখ্যা নয়। তাই এই পরিসংখ্যান দিয়ে একা কোনো প্রার্থীর মোট ভোট বা বিজয়ের ব্যবধান নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, রোনালদোর B.O.A.T জয়কে তাঁর ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক মৌসুমের প্রতি সমর্থকদের স্বীকৃতি হিসেবে দেখা যায়। একই সঙ্গে, অর্থের বিনিময়ে একাধিকবার ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকায় এই ফলাফলকে সর্বকালের সেরা ফুটবল মৌসুমের চূড়ান্ত বা নিরপেক্ষ রায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এই উদ্যোগে সমর্থকদের পছন্দই ছিল মূল নির্ধারক; খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সের তুলনামূলক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে স্বাধীন কোনো বিচারক প্যানেল বিজয়ী নির্বাচন করেনি। ফলে রোনালদোর ২০০৮ সালের মৌসুমের এই জয় তাঁর ক্যারিয়ারের আরেকটি আলোচিত স্বীকৃতি হলেও, মেসির ২০১২ সালের রেকর্ড কিংবা অন্য কিংবদন্তিদের কীর্তিকে এতে খাটো করা যায় না। বরং ফুটবল ইতিহাসের সেরা মৌসুম নিয়ে সমর্থকদের পছন্দ, আবেগ ও বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে B.O.A.T ভোট।