চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক তৎপরতাকে আন্তর্জাতিক আইন ও গণতান্ত্রিক দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন যুক্তরাজ্যে তাইপেই প্রতিনিধি কার্যালয়ের প্রধান ভিনসেন্ট চিন-হসিয়াং ইয়াও। সমুদ্রে বেইজিংয়ের কথিত ‘গ্রে-জোন’ কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় যুক্তরাজ্যসহ সমমনা দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার (১ নভেম্বর) দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত এক নিবন্ধে ইয়াও বলেন, সমুদ্রে কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর এ ধরনের তৎপরতা আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে দুর্বল করছে। সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়েও এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং কৌশলগত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এর উদাহরণ হিসেবে ইয়াও রাশিয়ার গবেষণা জাহাজ ‘ইয়ান্তার’-এর কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গত বছর জাহাজটি দুইবার ব্রিটিশ জলসীমায় প্রবেশ করে। এ সময় জাহাজটির নাবিকেরা পানির নিচের যোগাযোগ ক্যাবলের আশপাশে অবস্থান নেন এবং ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর পাইলটদের লক্ষ্য করে লেজার রশ্মি নিক্ষেপ করেন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে বাল্টিক সাগরে একটি চীনা জাহাজের নোঙর টেনে নেওয়ার ঘটনায় একাধিক ফাইবার-অপটিক ক্যাবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। ইয়াওর মতে, এসব ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
তাইওয়ানকে ঘিরে চীনের সামরিক তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন ইয়াও। তিনি দাবি করেন, গত ১১ অক্টোবর তাইওয়ানের জাতীয় দিবসের পরদিনই বেইজিং সামরিক মহড়ার ঘোষণা দেয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গোলাবর্ষণ শুরু হয়। তাঁর মতে, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাইওয়ানের গণতান্ত্রিক স্বশাসনের প্রতি চীনের বিরোধিতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।
ইয়াওর অভিযোগ, আগাম সতর্কতা ছাড়া সামরিক মহড়া আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক ও বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারে। ২০২৫ সালে তাসমান সাগরে চীনা নৌবাহিনীর আগাম সতর্কতা ছাড়াই গোলাবর্ষণের মহড়ার ঘটনাও তিনি উল্লেখ করেন। পরে এক বিমানচালকের দেওয়া তথ্যের মাধ্যমে অস্ট্রেলিয়া বিষয়টি জানতে পারে বলে নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তাইওয়ানের পূর্বদিকে চীনের সামরিক অবস্থান জোরদার এবং বাণিজ্যিক জাহাজে তল্লাশির সক্ষমতা তৈরির মাধ্যমে দ্বীপটিকে বাইরের বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। তাইওয়ানকে ঘিরে সংঘাত হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও প্রযুক্তি সরবরাহব্যবস্থায় পড়তে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
ব্লুমবার্গের একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে ইয়াও বলেন, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ হলে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষতি হতে পারে। একই সঙ্গে তাইওয়ানের সেমিকন্ডাক্টর সরবরাহ ব্যাহত হলে বিশ্বের শিল্প ও প্রযুক্তি খাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা জোরদার এবং মুক্ত নৌ-চলাচল ও শান্তিপূর্ণভাবে বিরোধ নিষ্পত্তির নীতি রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাইপেই প্রতিনিধি কার্যালয়ের প্রধান।
তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ।