শহিদুল ইসলাম:
ঢাকার সাভারের আশুলিয়া থানাধীন ৪ নম্বর ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদে চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে পরিষদের সচিব মো. আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে। সরকারি তোয়াক্কা না করে জন্মনিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্স বাবদ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে তিনি প্রকাশ্যে অনৈতিক লেনদেন চালাচ্ছেন বলে ভুক্তভোগীদের দাবি। সম্প্রতি তার অনিয়ম ও কথিত ‘গোপন বৈঠক’ সংক্রান্ত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় পুরো এলাকায় চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদকে নিজের ব্যক্তিগত ‘দুর্নীতির আস্তানা’ বানিয়ে ফেলেছেন সচিব আফজাল হোসেন। ভুক্তভোগীদের সেবা দেওয়ার নামে নির্ধারিত সরকারি ফি-এর বহুগুণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। সরকারি রাজস্বের হিসাব ফাঁকি দিয়ে লাখ লাখ টাকা নিজের পকেটে ভরছেন এই কর্মকর্তা।
জন্মনিবন্ধন ও ট্রেড লাইসেন্সে বাধ্যতামূলক ‘ঘুষ ফি’
অনিয়মের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ট্রেড লাইসেন্স ও জন্মনিবন্ধন শাখা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, কোনো ফাইল ঘুষের টাকা ছাড়া নড়ে না।
জন্মনিবন্ধন: নবজাতক থেকে শুরু করে সকল বয়সের জন্মনিবন্ধন কার্ড সংশোধনে বা নতুন করতে গেলে নির্ধারিত সরকারি ফি-এর বাইরে ১,০০০ থেকে ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত দিতে হচ্ছে। টাকা না দিলে ভুল তথ্য দেখানো বা মাসের পর মাস ঘুরিয়ে হয়রানি করার ঘটনা নিত্যদিনের।
ট্রেড লাইসেন্স: স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু ও নবায়নের জন্য সচিব আফজাল এবং তার তৈরি নিজস্ব গ্যাং প্রকাশ্যে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করে। চাহিদা অনুযায়ী অতিরিক্ত টাকা না দিলে লাইসেন্স আটকে রেখে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করা হয়।
গোপন বৈঠক ও দালাল সিন্ডিকেট
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, পরিষদ প্রাঙ্গণে ও অফিসের বাইরে নিজস্ব নিয়োজিত দালালদের নিয়ে নিয়মিত গোপন বৈঠক পরিচালনা করেন সচিব আফজাল। ইউপির সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তিনি গড়ে তুলেছেন একটি শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট, যাদের মাধ্যমে পরিষদে আসা সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে সরাসরি টাকা তোলা হয়। দালালদের মাধ্যমে ঘুষের টাকা হাতবদল হওয়ায় প্রশাসনিক চাক্ষুষ প্রমাণ এড়ানোর চেষ্টা করা হলেও গোপন বৈঠকে অর্থ ভাগের দৃশ্য প্রকাশ পাওয়ায় তার মূল রূপ উন্মোচিত হয়।
সম্পদের পাহাড়: বিলাসবহুল গাড়ি ও বহুতল ভবন
ইউপি সচিব হিসেবে সীমিত বেতনের চাকরি করলেও আফজাল হোসেনের অর্জিত সম্পত্তি দেখে হতবাক এলাকাবাসী। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ইয়ারপুর ইউপিতে বহাল থেকে বেপরোয়া দুর্নীতি চালিয়ে তিনি বিপুল ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন।
রাজধানীতে বহুতল ভবন ও একাধিক ফ্ল্যাট।
নামে-বেনামে একাধিক মূল্যবান জমির প্লট ও নিজস্ব ইটভাটা।
ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়ি (যার ব্যবহৃত নম্বর: ঢাকা মেট্রো-প-১৩-৬১১৮)।
অভিযোগের বিষয়ে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব মো. আফজাল হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
দুদ্দক ও সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
ইউনিয়ন পরিষদের মতো তৃণমূল সেবা কেন্দ্রে সচিব আফজালের এমন ‘মাফিয়া রাজত্ব’ ও প্রকাশ্যে ঘুষ বাণিজ্যে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সুশীল সমাজ ও ভুক্তভোগীরা। অসাধু এ সচিবের ক্ষমতার উৎস কোথায়—তা নিয়ে উঠছে নানা প্রশ্ন।
এলাকাবাসীর জোর দাবি, অবিলম্বে মো. আফজাল হোসেনকে ইয়ারপুর ইউপি থেকে প্রত্যাহার করে তার বিগত বছরের রাজস্ব আয়-ব্যয়ের ওপর নিরপেক্ষ ও বিশেষ সরকারি অডিট পরিচালনা করতে হবে। একই সাথে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান চালিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।